

প্রতীকী ছবি - AI
১৯শে আগস্ট, ২০২৬
সময়টা উনিশ শতকের কলকাতা। সন্ধে নামলেই বাবুদের বৈঠকখানায় বসছে গানের আসর, উড়ছে টাকা। চুরুট ধরাচ্ছে টাকা দিয়ে! আর অন্দরমহল থেকে ভেসে আসছে গাওয়া ঘি, গরম মশলা আর হিংয়ের মন-মাতানো গন্ধ।
সে এক অদ্ভুত তোলপাড় ফেলা সময়। একদিকে ইংরেজদের হাত ধরে শহরের অবস্থাপন্ন বাঙালি বাড়িগুলোয় কাটলেট আর চপ জাঁকিয়ে বসছে, অন্যদিকে বাড়ির ভেতরের রক্ষণশীলতায় মোড়া হেঁশেলে নীরবে ঘটে চলেছে আরেক বিপ্লব। তবে এই বিপ্লবের কারিগর কোনও বাঙালি ছিলেন না। প্রতিবেশী রাজ্য উড়িশা থেকে আসা একদল মানুষ অন্দরমহলের রন্ধনশৈলীর এই বিপ্লবের মূল কারিগর ছিলেন। যারা পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন উড়িয়া বামুন ঠাকুর নামে।
বাঙালির রান্নার খোলনলচে বদলে দেওয়ার এই ইতিহাস কেবল কয়েকটা রেসিপির ভোলবদল দিয়ে বিচার করলে চলবে না। এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে আর্থসামাজিক পরিবর্তন, পরিযায়ী জীবনের লড়াই আর দুই ভিন্ন সংস্কৃতির এক অপূর্ব ফিউশনের কাহিনী।
আঠারো শতকের শেষভাগ আর উনিশ শতকের গোড়ার দিক থেকে কাজের খোঁজে দলে দলে মানুষ উড়িশা থেকে তৎকালীন ভারতের অর্থনীতির কেন্দ্রস্থল বাংলায় আসতে শুরু করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী আর দারিদ্র্য তাদের বাধ্য করেছিল ভিটেমাটি ছাড়তে। এই পরিযায়ীদের একটি বড় অংশ ছিলেন উড়িয়া ব্রাহ্মণ।
এদিকে ওই সময়ে কলকাতায় ফুলেফেঁপে উঠছে এক নতুন শ্রেণি। বাঙালি বনেদি বাড়িগুলোর পেল্লায় হেঁশেল সামলানোর জন্য তখন দরকার ছিল ভরসা যোগ্য লোক।
কিন্তু যাকে তাকে তো আর হেঁশেলে ঢোকানো যায় না। বিশেষ করে বাড়ির অন্দরমহলে থাকা রক্ষণশীল বয়োজ্যেষ্ঠ বা বিধবাদের জন্য চাই এমন কেউ, যার হাতের ছোঁয়া জল বা অন্ন গ্রহণে জাত যাওয়ার ভয় নেই। সেই সময়ের এই তথাকথিত বাবু পরিবারগুলোর মানসিকতা এমনই ছিল। উড়িয়া ব্রাহ্মণরা এই শূন্যস্থানটাই দারুণভাবে পূরণ করলেন। তাঁরা গরিব হতে পারেন, কিন্তু জাতে উঁচু। ব্যস, বাবুদের বাড়ির হেঁশেলের চাবিকাঠি পাকাপাকিভাবে চলে গেল উড়িয়া ঠাকুরদের হাতে।
উড়িয়া ঠাকুরেরা সঙ্গে করে এনেছিলেন পুরীর জগন্নাথ দেবের মন্দিরের রান্না বা মহাপ্রসাদের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য। আর সেটাই হয়ে দাঁড়াল বাংলার নিরামিষ রান্নার তুরুপের তাস।
তৎকালীন সময়ে বিধবাদের খাবারে পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ডাল সবই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। এই নিয়মের ঘেরাটোপে থেকেও কী করে খাবারকে সুস্বাদু করা যায়? উড়িয়া ঠাকুরেরা বাঙালিকে প্রথম শেখালেন হিং, জিরে, আদা আর পাঁচফোড়নের জাদুকরী ব্যবহার। ছানার ডালনা, ধোঁকার ডালনা বা মোচার ঘণ্টর মতো পদে তাঁরা যে স্বাদ নিয়ে এলেন, তা আগে বাঙালির জানা ছিল না। এর ফলে নিরামিষ খাবারও হয়ে উঠল অমৃত সমান। রোজ একঘেয়ে খাবার খাওয়ার অরুচি সহজেই ঘচে গেল। উড়িয়া রাঁধুনীরা আবার খুব কড়া বা উগ্র মশলার বদলে জোর দিতেন মশলার ব্যালেন্সের উপর।
সবচেয়ে বড় ফিউশনটা ঘটল ডাল আর সবজির মিলনে। পুরির জগন্নাথ দেবের ভোগের বিখ্যাত 'ডালমা'-র প্রচ্ছন্ন প্রভাব এসে পড়ল বাংলার হেঁশেলে। মুগ বা ছোলার ডালের সঙ্গে নানা মরশুমি সবজির পুষ্টিকর অথচ রাজকীয় স্বাদ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেল। এমনকি নিরামিষ রান্নায় হালকা মিষ্টি দিয়ে গোটা সাতটাই আরও দুর্দান্ত করে তুললেন তাঁরা, যা আজও ঘটি বাড়ির রান্নার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
নিরামিষ রান্নার পাশাপাশি আমিষ রান্নাতেও জাদু দেখান উড়িয়া ঠাকুররা। বাবুদের পাতে রোজকার মাছের ঝোল হোক বা রবিবারের পাঁঠার মাংস, সবকিছুতেই উড়িয়া ঠাকুরেরা নিজেদের কেরামতি দেখান।
মোগলাই বা নবাবি খানার মতো তীব্র মশলার ব্যবহার তাঁদের ছিল না। বরং ধীর আঁচে, নিজস্ব কায়দায় কষিয়ে তাঁরা এক অদ্ভুত ঘরোয়া অথচ আভিজাত্যে ভরা স্বাদ তৈরি করতেন। তাঁদের হাতে তৈরি কচি পাঁঠার ঝোল বা রুই মাছের কালিয়া হয়ে উঠল বাবুদের স্ট্যাটাস সিম্বল।
"আমাদের বাড়ির বামুন ঠাকুর খাস পুরীর লোক", এমন কথা বুক ফুলিয়ে বলাটা তখন বনেদিয়ানার অন্যতম ধরন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্থানীয় মাছ-মাংসের সঙ্গে উড়িশার রন্ধনশৈলীর এই যে নিঃশব্দ ফিউশন, তা বাঙালির রসনাকে এক লহমায় অনেকটাই অন্যরকম করে তোলে। যার ধারাবাহিকতা আজও বাঙালির রান্নাঘরে বয়ে চলেছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
