

টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিস। প্রতীকী ছবি - The Fourth Axis.
২৪শে আগস্ট, ২০২৬
ডায়াবিটিসের নাম শুনলেই অনেকের প্রথম প্রশ্ন, ‘মিষ্টি বেশি খাওয়ার জন্য হয়েছে?’ টাইপ-১ ডায়াবিটিসের ক্ষেত্রে উত্তরটা কিন্তু তেমন নয়। এখানে মূল সমস্যা খাবারে চিনি নয়, বরং শরীরের নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ভুল আচরণ।
অগ্ন্যাশয়ের বিটা (β) কোষ থেকে তৈরি হয় ইনসুলিন। এই হরমোন রক্তে থাকা গ্লুকোজকে শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছতে সাহায্য করে। টাইপ-১ ডায়াবিটিসে শরীরের immune system ভুল করে ওই বিটা কোষগুলিকেই আক্রমণ করে ধ্বংস করতে থাকে। ফলে ইনসুলিনের উৎপাদন অত্যন্ত কমে যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রায় বন্ধই হয়ে যায়।
ইনসুলিন পর্যাপ্ত না থাকলে রক্তের গ্লুকোজ ঠিকমতো কোষের ভিতরে ঢুকতে পারে না। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। সেখান থেকেই শুরু হয় টাইপ-১ ডায়াবিটিসের সমস্যা।
টাইপ-১ ডায়াবিটিসকে অনেক সময় ‘শিশুদের ডায়াবিটিস’ বলা হয়। কারণ শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এটি তুলনামূলক ভাবে বেশি ধরা পড়ে। কিন্তু এটি যে শুধু ছোটদেরই হবে, এমন নয়। প্রাপ্তবয়স্কদেরও টাইপ-১ ডায়াবিটিস হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে বড় বয়সে রোগটির সূচনা ধীরে ধীরে হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এমন autoimmune diabetes-কে LADA (Latent Autoimmune Diabetes in Adults) বলা হতে পারে।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রোগীর চেহারা দেখেও টাইপ-১ ডায়াবিটিস বোঝা যায় না। রোগীর ওজন কম হতে পারে, স্বাভাবিক হতে পারে, আবার কারও ওজন বেশি হলেও টাইপ-১ ডায়াবিটিস থাকতে পারে।
এখানেই রোগটির সবচেয়ে জটিল জায়গা। টাইপ-১ ডায়াবিটিসের একক কোনও কারণ এখনও নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। সাধারণভাবে মনে করা হয়, জিনগত প্রবণতা, অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া এবং কিছু পরিবেশগত কারণ একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবারে টাইপ-১ ডায়াবিটিসের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিছু নির্দিষ্ট genetic বা HLA susceptibility-এর সঙ্গেও রোগটির সম্পর্ক রয়েছে। অন্য কিছু autoimmune রোগের সঙ্গেও টাইপ-১ ডায়াবিটিসের যোগ থাকতে পারে।
কিছু পরিবেশগত trigger-ও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হয়। তবে কোনও নির্দিষ্ট খাবার বা একটি মাত্র কারণকে দায়ী করে বলা যায় না যে ‘এ কারণেই’ টাইপ-১ ডায়াবিটিস হয়েছে।
টাইপ-১ ডায়াবিটিস অনেক সময় দ্রুত প্রকাশ পেতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলি নজরে পড়লে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রধান লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে: বার বার প্রস্রাব হওয়া, অস্বাভাবিক বেশি পিপাসা পাওয়া, বার বার খিদে পাওয়া, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি, চোখে ঝাপসা দেখা, শিশুদের ক্ষেত্রে আগে না থাকলেও হঠাৎ বিছানায় প্রস্রাব করা শুরু হওয়া৷ বিশেষ করে কোনও শিশুর একই সঙ্গে প্রচণ্ড পিপাসা, বার বার প্রস্রাব এবং দ্রুত ওজন কমার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
প্রথমে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ডায়াবিটিস আছে কি না নির্ণয় করা হয়। প্রচলিত diagnostic criteria অনুযায়ী সাধারণভাবে- Fasting plasma glucose: 126 mg/dL বা তার বেশি, HbA1c: 6.5% বা তার বেশি, 75 গ্রাম OGTT-এর ২ ঘণ্টা পর glucose: 200 mg/dL বা তার বেশি৷ এই মানগুলি ডায়াবিটিস নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। তবে শুধু এই পরীক্ষাগুলি দিয়ে টাইপ-১ ও টাইপ-২-এর মধ্যে পার্থক্য করা যায় না।
সেখানে চিকিৎসক রোগীর বয়স, উপসর্গ, রোগের গতি, শরীরের গঠন এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল বিবেচনা করেন। টাইপ-১ ডায়াবিটিসে diabetes-related autoantibody পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি C-peptide সাধারণত কম থাকার প্রবণতা দেখা যায়, কারণ শরীরের নিজস্ব ইনসুলিন তৈরির ক্ষমতা কমে যায়। তবে কোনও একটি পরীক্ষার ফল দেখেই প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে টাইপ-১ ডায়াবিটিস নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক তথ্য মিলিয়ে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা। বর্তমানে টাইপ-১ ডায়াবিটিসের এমন কোনও সাধারণ চিকিৎসা নেই যাতে অগ্ন্যাশয়ের নষ্ট হয়ে যাওয়া বিটা কোষ স্বাভাবিক ভাবে ফিরে এসে শরীর নিজে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি শুরু করবে। তাই টাইপ-১ ডায়াবিটিসে ইনসুলিন চিকিৎসা অপরিহার্য। অর্থাৎ, ইনসুলিন বন্ধ করে শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ বা ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে।
Basal insulin: দিন-রাত শরীরের প্রয়োজনীয় ‘বেসলাইন’ ইনসুলিনের চাহিদা মেটায়।
Bolus বা meal-time insulin: খাবারের সঙ্গে নেওয়া carbohydrate-এর পরিমাণ অনুযায়ী খাবারের আগে বা আশপাশের সময়ে দেওয়া হয়।
ইনসুলিন দেওয়া যেতে পারে Multiple Daily Injections (MDI)-এর মাধ্যমে অথবা উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে insulin pump ব্যবহার করে।
টাইপ-১ ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে শুধু ইনসুলিন নিলেই দায়িত্ব শেষ নয়। নিয়মিত glucose monitoring অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে Continuous Glucose Monitor (CGM) অনেক রোগীর জন্য উপকারী হতে পারে। CGM শরীরে glucose-এর ওঠানামা প্রায় ধারাবাহিক ভাবে দেখাতে সাহায্য করে। ফলে রক্তে শর্করা বাড়ছে না কমছে, সেই প্রবণতা দ্রুত বোঝা যায়।
তবে CGM বা insulin pump কার জন্য উপযুক্ত, কতটা insulin প্রয়োজন, এসব চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করতে হয়।
টাইপ-১ ডায়াবিটিস মানেই সব ধরনের পছন্দের খাবার চিরতরে বন্ধ, এমন নয়। বরং রোগীকে শেখানো হয় কোন খাবারে কত carbohydrate রয়েছে এবং সেই অনুযায়ী insulin কী ভাবে সামঞ্জস্য করতে হবে। শুধু ‘মিষ্টি খাওয়া বন্ধ’ করলেই টাইপ-১ ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে আসে না। প্রয়োজন সুষম খাবার, carbohydrate সম্পর্কে সচেতনতা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী insulin management।
ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ। তবে শরীরচর্চার সময় glucose কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় exercise-এর আগে ও পরে insulin, খাবার এবং glucose-এর মাত্রা কী ভাবে সামঞ্জস্য করতে হবে, তা রোগীকে শিখতে হয়। অসুস্থ হয়ে পড়লেও বাড়তি সতর্কতা দরকার। জ্বর, সংক্রমণ বা অন্য অসুস্থতার সময় glucose এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ketone পরীক্ষা করা, insulin নিজের মতো করে বন্ধ না করা এবং চিকিৎসকের দেওয়া ‘sick day’ নির্দেশিকা মেনে চলা জরুরি।
ইনসুলিন চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হল hypoglycemia, অর্থাৎ রক্তে glucose অতিরিক্ত কমে যাওয়া। তাই রোগী এবং পরিবারের সদস্যদের হাইপোগ্লাইসেমিয়ার লক্ষণ এবং সেই পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা শেখানো অত্যন্ত জরুরি। অন্য দিকে, শরীরে ইনসুলিনের তীব্র ঘাটতি হলে রক্তে glucose খুব বেড়ে গিয়ে diabetic ketoacidosis (DKA) হতে পারে। অতিরিক্ত পিপাসা, বার বার প্রস্রাব, বমি, পেটব্যথা, দ্রুত বা গভীর শ্বাস, প্রচণ্ড দুর্বলতা কিংবা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাবের মতো লক্ষণ দেখা দিলে এটি জরুরি চিকিৎসার পরিস্থিতি হতে পারে। তাই টাইপ-১ ডায়াবিটিসে ইনসুলিন নিজের মতো করে বন্ধ করা কখনও উচিত নয়।
টাইপ-১ ডায়াবিটিস আজীবন insulin management-এর প্রয়োজন তৈরি করতে পারে ঠিকই, কিন্তু তার অর্থ জীবন থেমে যাওয়া নয়। নিয়মিত glucose monitoring, সঠিক insulin regimen, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও চিকিৎসকের ফলো-আপের মাধ্যমে বহু মানুষ টাইপ-১ ডায়াবিটিস নিয়েই সক্রিয় ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন।
তাই ‘টাইপ-১ মানেই শুধু শিশুর রোগ’, ‘মিষ্টি খেলেই এই রোগ হয়’ কিংবা ‘ইনসুলিন শুরু করলে আর বন্ধ করা যায় না’, এই ধরনের সরল ধারণা থেকে দূরে থাকা জরুরি। আর কোনও শিশু বা প্রাপ্তবয়স্কের যদি হঠাৎ প্রচণ্ড পিপাসা, বার বার প্রস্রাব, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা বা বমির মতো লক্ষণ দেখা দেয়, বিশেষ করে লক্ষণগুলি দ্রুত বাড়লে, নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ ও রক্তের glucose পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতায় জন্ম। উত্তর কলকাতার হোলি চাইল্ড ইনস্টিটিউট, বিডন স্ট্রীট স্কুলে প্রাথমিক পাঠ। এরপর ডাক্তারির পড়াশোনায় প্রবেশ। যাদবপুরে কে. পি. সি মেডিক্যাল কলেজ থেকে MBBS, তারপর পি. জি হাসপাতাল থেকে MD শেষ হতে হতে পেরিয়েছে অনেক গুলো বছর। লেখার ইচ্ছে ছোটবেলা থেকে। ভ্রমণ ভালোবাসেন। পেশা আর লেখা দুটোই উজ্জীবিত রাখে তাঁকে।
