১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
পুজোয় একা? সঙ্গী বুক করুন!

পুজোয় ভাড়ার পার্টনার? ছবি - Google

পুজোয় একা? সঙ্গী বুক করুন!

মূল বিষয়

কলকাতায় পুজোর প্রস্তুতি শুরু হলেই বদলে যায় শহরের ছন্দ। প্যান্ডেল, আলো, নতুন জামাকাপড়, ঠাকুর দেখা, রাত জাগা, সব কিছুর মধ্যেই থাকে ‘সঙ্গে কে আছে’ প্রশ্নটাও। সেই জায়গাতেই এ বার সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখে পড়েছে এক অদ্ভুত অফার: প্রেম নয়, বিয়ের জন্যও নয়, শুধু দুর্গাপুজোর কয়েক ঘণ্টার জন্য ‘পার্টনার’!

পুজোর পার্টনার

ভাইরাল হওয়া একটি পোস্টারে লেখা, ‘‘পুজোতে একা একা বিরক্ত? চিন্তা ছাড়ো! পুজোতে ঘোরার মতো PARTNER বুক করুন!’’ তার নীচে আবার ঘণ্টা নয়, সময় ধরে প্যাকেজ। দু’ঘণ্টার জন্য ৭৯৯ টাকা, চার ঘণ্টার জন্য ১৩৯৯ টাকা এবং আট ঘণ্টার জন্য ২২৯৯ টাকা। পরিষেবার তালিকাতেও রয়েছে প্যান্ডেল হপিং, গল্প-আড্ডা, সেলফি ও ভিডিয়ো, খাওয়া-দাওয়া, রিল বানানো থেকে শুরু করে ‘সুন্দর স্মৃতি’ তৈরির প্রতিশ্রুতি। অর্থাৎ প্রেমিক বা প্রেমিকা নয়—কয়েক ঘণ্টার জন্য যেন ‘পুজোর সঙ্গী’!

ছবিটিতে কোনও সংস্থার স্পষ্ট নাম, রেজিস্টার্ড প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, ওয়েবসাইট বা ঠিকানা নেই। ফলে এই নির্দিষ্ট পোস্টারটি কে তৈরি করেছে, কোথা থেকে পরিষেবাটি দেওয়া হচ্ছে বা সত্যিই কেউ এই প্যাকেজ বুক করছে কি না—তা স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনও মেলেনি। এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পোস্টারটি নিছক সোশ্যাল-মিডিয়া প্রচার, রসিকতা বা ‘এনগেজমেন্ট কনটেন্ট’ হতে পারে; আবার বাস্তব কোনও পরিষেবার বিজ্ঞাপনও হতে পারে। কিন্তু এর ভাষা এবং প্যাকেজের কাঠামো যে একটি বৃহত্তর বদলের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, তার প্রমাণ গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহেই রয়েছে।

কয়েক ঘণ্টার প্রেমিক

২০২৬-এর জুন-জুলাইয়ে ভারতে ‘রেন্ট-এ-বয়ফ্রেন্ড’ বা ঘণ্টাভিত্তিক companionship পরিষেবা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়। দিল্লির এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর অনলাইনে একটি পুরুষ সঙ্গী বুক করে তাঁর সঙ্গে শপিংয়ে যাওয়ার ভিডিয়ো প্রকাশ করার পর বিষয়টি ভাইরাল হয়। সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মটি অবশ্য নিজেকে ‘বয়ফ্রেন্ড ভাড়া’ পরিষেবা না বলে ‘professional social support service’ হিসাবে তুলে ধরে। সেখানে hanging out, movie partner, shopping buddy, clubbing, medical support, travel partner-এর মতো পরিষেবার জন্য ঘণ্টাপিছু নির্দিষ্ট দাম দেওয়া রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, মানুষ কি সত্যিই ‘প্রেম’ কিনছে? নাকি কিনছে কয়েক ঘণ্টার সঙ্গ?

দুটির মধ্যে পার্থক্য যথেষ্ট। কাউকে সিনেমা দেখতে সঙ্গে নেওয়া, পুজোয় প্যান্ডেল ঘোরা, হাসপাতালে যাওয়ার সময় পাশে থাকা কিংবা শপিংয়ের সময় একজন সঙ্গী পাওয়া—এসবকে সরাসরি প্রেমের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। আধুনিক শহুরে জীবনে বন্ধুবান্ধবের সময় না মেলা, অন্য শহরে একা থাকা, কর্মব্যস্ততা বা সামাজিক অস্বস্তির কারণে কেউ টাকা দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের companionship চাইতেই পারেন। জাপানে rental family ও rental romance-এর মতো পরিষেবার দীর্ঘ ইতিহাসও রয়েছে। সেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্বামী, স্ত্রী, বন্ধু বা পরিবারের সদস্যের ভূমিকায় অভিনয় করার পরিষেবাও পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন
বঙ্গের সন্দেহবাতিক রাজা! ভাইদের বন্দি করে সর্বনাশ ডেকে আনেন
এক বিয়েতেই ছারখার ব্রাহ্ম সমাজ!
ভারতে প্রথম জীবাণু অস্ত্রে ভাইকে মেরেছিল বঙ্গেরই এক জমিদার!

ভারতেও এই প্রবণতা এখন গিগ-ইকনমির যুক্তিতে ঢুকছে। আগে মানুষ সময় বিক্রি করতেন টিউশন, ডেলিভারি, ফ্রিল্যান্সিং বা ক্যাব চালানোর মাধ্যমে। এখন ‘সঙ্গ’ও যদি একটি পরিষেবা হয়, তবে তারও দাম নির্ধারিত হবে—এমন যুক্তি সামনে আসছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ভারতের এই ক্ষেত্রটি এখনও খণ্ডিত এবং মূলত সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও companionship platform-নির্ভর। কিছু পরিষেবা প্রদানকারী আবার এটিকে পার্ট-টাইম আয়ের সুযোগ হিসাবেও দেখছেন। আর এখানেই রয়েছে এই গল্পের সামাজিক দিকটি।

একাকিত্ব

ভারতের তরুণদের নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় অনলাইন যোগাযোগ, একাকিত্ব এবং সম্পর্কের ধরন নিয়ে উদ্বেগের ছবি উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের একটি ভারতীয় গবেষণায় ২০০ জনের উপর করা সমীক্ষায় online dating ব্যবহারের মাত্রা, loneliness এবং social connectedness-এর সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়েছে। অন্য একটি গবেষণায় ১৮-২৫ বছর বয়সি ভারতীয় তরুণদের মধ্যে social-media use, loneliness এবং impulsivity-র সম্পর্ক দেখা হয়েছে। অর্থাৎ ‘সঙ্গ চাই’—এই চাহিদাটি নিছক বাজারের বানানো নয়; ডিজিটাল যুগের সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গেও তার যোগ রয়েছে। তবে কোনও একটি গবেষণা থেকে বলা যাবে না যে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করলেই মানুষ একাকী হয়ে পড়ে। বরং সম্পর্কটি জটিল।

আবার এই বাজারের অন্ধকার দিকও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। অগস্টেই হায়দরাবাদ পুলিশ ‘Rent a Boyfriend’ নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো প্রতারণা নিয়ে সতর্ক করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, Instagram, Facebook ও Telegram-এ আকর্ষণীয় ছবি দিয়ে বিভিন্ন প্যাকেজের বিজ্ঞাপন ছড়ানো হচ্ছিল। কোথাও ৪৯৯ টাকায় coffee date, ১২৪৯ টাকায় movie date, ১৪৯৯ টাকায় shopping companion, ১৯৯৯ টাকায় event বা wedding companion এবং ৪৪৯৯ টাকায় ১০ ঘণ্টার প্যাকেজের কথা বলা হয়েছিল। আগ্রহী ব্যক্তিকে প্রথমে কথাবার্তায় বিশ্বাস করানোর পর booking confirmation বা security deposit-এর নামে টাকা নেওয়া এবং তার পরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে AI-generated বা চুরি করা ছবিও ব্যবহার করা হয়েছিল বলে পুলিশি সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ চোখ ধাঁধানো প্যাকেজ, সুন্দর ছবি, ‘limited slots’, ‘special offer’, ‘advance booking’—এই শব্দগুলিই এখন বিপদের সংকেতও হতে পারে। মজার বিষয়, ভাইরাল হওয়া পুজোর পোস্টারটিতেও ‘LIMITED SLOTS’ এবং বুকিংয়ের আহ্বান রয়েছে। তবে এই মিল থেকে পোস্টারটির সঙ্গে হায়দরাবাদের প্রতারণার সরাসরি যোগ রয়েছে, এমন দাবি করার কোনও প্রমাণ নেই। মিলটি শুধু সতর্ক হওয়ার কারণ।

ভারতের I4C-ও অনলাইন পরিচয় ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে অচেনা ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা আর্থিক তথ্য না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ভুয়ো প্রোফাইল, চুরি করা ছবি এবং আবেগের সুযোগ নিয়ে প্রতারণার বিষয়ে সরকারি সতর্কবার্তাও রয়েছে।

তাই এ বারের পুজোয় ‘পার্টনার বুকিং’-এর পোস্টারকে শুধু হাসির বিষয় বলে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক নয়, আবার একে দেখেই ‘প্রেমের বাজার’ বলে ঘোষণা করাও অতিসরলীকরণ। এর মধ্যে একই সঙ্গে রয়েছে নিঃসঙ্গ শহুরে জীবনের বাস্তবতা, গিগ-ইকনমির নতুন সম্ভাবনা, সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট-চালিত ব্যবসা এবং প্রতারণার ঝুঁকি।

দুর্গাপুজো শেষ পর্যন্ত এমন এক উৎসব, যেখানে ‘একসঙ্গে থাকা’টাই হয়তো সবচেয়ে বড় আনন্দ। সেই সঙ্গ যদি বন্ধুত্ব হয়, প্রেম হয়, পরিবারের হয়—তা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সেই সঙ্গেরও প্যাকেজ তৈরি হয়—২ ঘণ্টা, ৪ ঘণ্টা, ৮ ঘণ্টা—তখন প্রশ্নটা শুধু ‘কত টাকা?’-তে আটকে থাকে না। প্রশ্নটা আরও গভীরে গিয়ে দাঁড়ায়, শহর যত ডিজিটাল হচ্ছে, মানুষের সময় যত কমছে, তত কি সঙ্গও ধীরে ধীরে একটি কেনাবেচার পরিষেবায় পরিণত হচ্ছে?

এবং আরও একটি প্রশ্ন, এই পোস্টারটি যদি সত্যিই কোনও ব্যবসার বিজ্ঞাপন হয়, তা হলে পুজোর ভিড়ে ‘সঙ্গী’ খোঁজার এই নতুন বাজার কতটা বাস্তব, কতটা নিরাপদ এবং কতটাই বা বিশ্বাসযোগ্য?

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য