

বল্লাল সেনের বিতর্কিত প্রেম। ছবি - AI
২৭শে আগস্ট, ২০২৬
ইতিহাস বড়ই বিচিত্র, বড়ই নির্মম। যে মানুষটি অখণ্ড বঙ্গের সামাজিক জীবনে প্রথমবারের জন্য বংশ ও জাতপাতের বিশুদ্ধতা রক্ষার নামে কৌলিন্য প্রথার এক দুর্ভেদ্য লোহার প্রাচীর তুলে দিয়েছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনিই কি না ভেঙে চুরমার করে দেন নিজেরই তৈরি করা সেই বিধান!
বঙ্গের কট্টর রক্ষণশীল হিন্দু শাসক সেন বংশের ইতিহাস ঘাঁটলে এমনই বিচিত্র এক স্ববিরোধিতা নজরে পড়তে বাধ্য। এই সেন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রাজা বল্লাল সেন মানেই এক কঠোর শাসক, এমনটাই জনপ্রিয় ইতিহাসে বারবার চিত্রিত হয়ে এসেছে। যিনি বঙ্গের হিন্দু সমাজে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন 'কৌলীন্য প্রথা'। কিন্তু এটাই বোধহয় সব কিছু নয়।
এই কঠোর সমাজসংস্কারকের জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরা। রোমান্টিক অথচ নিষিদ্ধ প্রেমের উপাখ্যানে ভরপুর বল্লাল সেনের জীবন, যা সেন রাজবংশের অন্দরমহলে এক তোলপাড় ফেলা ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছিল। পিতা ও পুত্রের সেই দ্বন্দ্ব তৎকালীন বঙ্গে অন্যতম চর্চিত 'কেলেঙ্কারি' বা স্ক্যান্ডাল। এমনকি আজকের দিনের সিরিয়াস ইতিহাস চর্চাকারীদের কাছেও এটা অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি ঘটনা।
দ্বাদশ শতাব্দীর বাংলা। বৌদ্ধ পাল বংশের দীর্ঘ প্রায় ৪০০ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বঙ্গের ক্ষমতা দখল করে সেনরা। বল্লাল সেন তখন রাজা, ক্ষমতার চূড়ান্ত শিখরে। সমাজকে সুশৃঙ্খল করতে এবং রক্তের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে তিনি বর্ণপ্রথাকে আরও কঠোর করেন। ব্রাহ্মণ, বৈদ্য আর কায়স্থদের মধ্যে তৈরি হয় এক জটিল ও কড়া শ্রেণিবিন্যাস। কে কার বাড়িতে খাবে, কার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করবে সব কিছুর মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায় এই কৌলীন্য। এবং তার প্রচলন হয় খোদ বল্লাল সেনের হাত ধরে।
কিন্তু মানুষের হৃদয় আর কবে রাজকীয় ফরমান মেনে চলেছে!
জনশ্রুতি বলছে, বৃদ্ধ বয়সে এসে রাজা বল্লাল সেন এক তীব্র ও দুর্নিবার প্রেমের বাঁধনে জড়িয়ে পড়েন। পাত্রী কোনও রাজকন্যা বা উচ্চবর্ণের অভিজাত নারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন সমাজের একেবারে নিম্নস্তরের এক নারী, অধিকাংশ বর্ণনায় যাঁকে 'ডোম' বা 'চণ্ডাল' কন্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ হিন্দু ধর্মের একেবারে প্রান্তিক শ্রেণির মহিলা। কোনও কোনও লোককথায় তাঁর নাম পাওয়া যায় 'পদ্মিনী' বলে। বৃদ্ধ রাজা এই নিম্নবর্ণের রমণীর রূপে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তাঁকে সটান প্রাসাদের অন্দরমহলে নিয়ে আসেন। স্ত্রীর মর্যাদাও দেন!
স্বাভাবিকভাবেই সেনদের অন্দরমহলে তখন তীব্র তোলপাড় পড়ে যায়। যে রাজা সারা জীবন জাতিগত ও শ্রেণিগত বিশুদ্ধতার পাঠ দিয়ে এসেছেন, সেই তাঁরই শোবার ঘরে কি না এক অস্পৃশ্য নারী!
এই ঘটনা সেন রাজপ্রাসাদে আক্ষরিক অর্থেই আগুন জ্বালিয়ে দেয়। যুবরাজ লক্ষণ সেন পিতা বল্লাল সেনের এহেনও কাজ মেনে নিতে পারেননি। সেন রাজসভার রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরাও মহারাজের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। এঁরা বল্লাল সেনেরই তৈরি করা কৌলীন্য প্রথার সুবাদে সমাজে একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগী হয়ে উঠেছিলেন।
লক্ষণ সেন পিতার এই কাজকে বংশের কপালে এক চিরস্থায়ী কলঙ্কের দাগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ফলে শুরু হয় চরম পারিবারিক বিবাদ। রাজসভা কার্যত দুটি শিবিরে টুকরো হয়ে যায়। একদিকে বল্লাল সেন ও তাঁর মুষ্টিমেয় অনুগত, অন্যদিকে যুবরাজ লক্ষণ সেন ও কট্টরপন্থী ব্রাহ্মণ ও পন্ডিতদের ক্ষমতাশালী বিশাল দল। রাজকার্য শিকেয় ওঠে।
বৃদ্ধ বয়সে বল্লাল সেনের ব্যক্তিগত জীবনের এই কেচ্ছা যেমন বিস্মিত করে, তেমনই তা ইতিহাসবিদদের ভাবনাচিন্তার অনেক খোরাকও যোগায়। যেন একেবারে নিখুঁত এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি। কিন্তু একজন আধুনিক গবেষক বা সচেতন পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এর ঐতিহাসিক প্রামাণ্যতা ঠিক কতটা?
এখানেই ইতিহাসের এক বিশাল দ্বন্দ্ব এসে হাজির হয়। বল্লাল সেনের এই প্রণয়ঘটিত কেলেঙ্কারি ও পারিবারিক ফাটলের সবচেয়ে বড় উৎস হল আনন্দভট্টের লেখা 'বল্লালচরিত' গ্রন্থটি। কিন্তু সমস্যা বা প্রশ্নের জায়গাটা হল, এই বইয়ের রচনাকাল ১৫১০ খ্রিস্টাব্দ। অর্থাৎ বল্লাল সেনের মৃত্যুর প্রায় সাড়ে তিনশো থেকে চারশো বছর পর।
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, এর কোনও সমসাময়িক প্রমাণ আছে কি? সমসাময়িক কোনও কিছুতে বল্লাল সেনের এই পদক্ষেপের উল্লেখ না থাকলে তাহলে তাঁর মৃত্যুর অত বছর পর কেন সেটা প্রথমবার লেখা হয়েছিল?
ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন, এর পেছনে লুকিয়ে আছে ষোড়শ শতাব্দীর বাংলার এক সূক্ষ্ম সামাজিক রাজনীতি। আনন্দভট্ট এই বইটি লিখেছিলেন নবদ্বীপের রাজা বুদ্ধিমন্ত খানের পৃষ্ঠপোষকতায়। সেই সময়ে বাংলার সমাজে বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে (বিশেষ করে সুবর্ণবণিক ও অন্যান্যদের) সামাজিক মর্যাদা আদায় নিয়ে এক তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছিল।
অনেক গবেষকের মতেই, 'বল্লালচরিত'-এর এই গল্পটি কোনও ধ্রুব সত্য ইতিহাস নয়, বরং এটি ছিল একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত 'স্মিয়ার ক্যাম্পেইন' বা চরিত্র হননের চেষ্টা। সমসাময়িক কালের অর্থাৎ সেন যুগের কোনও তাম্রশাসন (যেমন নৈহাটি তাম্রশাসন) বা লিপিতে এই ঘটনার বিন্দুমাত্র উল্লেখ নেই। সেক্ষেত্রে যদি উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কালিমালিপ্ত করতে এই লেখা হয়ে থাকে, তবে তার উদ্দেশ্য হতে পারে বল্লাল সেনের প্রবর্তিত অতি গোঁড়া কৌলিন্য প্রথার বিরোধিতা করা বা তাকে এক ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়া।
তবে ইতিহাস আর জনশ্রুতি যখন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন তাকে আলাদা করা বেশ কঠিন। সত্যি হোক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, এই আখ্যানের পরিণতি কিন্তু ছিল অত্যন্ত করুণ।
বল্লালচরিত-এ বলা হয়েছে, পুত্র লক্ষণ সেন ও সমাজের একাংশের প্রবল চাপে শেষ পর্যন্ত বল্লাল সেন হার মানেন। তবে প্রেমের কাছে নয়, পরিস্থিতির কাছে। সিংহাসনের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবনকেই হয়ত তিনি সেই মুহূর্তে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। রাজক্ষমতা পুত্র লক্ষণ সেনের হাতে তুলে দিয়ে তিনি স্বেচ্ছায় সিংহাসন ত্যাগ করেন। এরপর প্রাসাদ ছেড়ে তিনি চলে যান বানপ্রস্থে (অনেকের মতে ত্রিবেণী বা প্রয়াগে), জীবনের শেষ দিনগুলো কাটানোর জন্য।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
