১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
ব্যায়াম করেও কমছে না ডায়াবিটিস?

ব্যায়াম করেও কেন কমে না ডায়াবিটিস? ছবি - Google

ব্যায়াম করেও কমছে না ডায়াবিটিস?

calender icon 2 ৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মূল বিষয়

ব্যায়াম মানেই রক্তে শর্করা কমবে, ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এত দিন এমনটাই শুনে এসেছেন অনেকে। কিন্তু জিমে গিয়ে ঘাম ঝরানোর পর, বিশেষ করে হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভাল ট্রেনিং বা ভারী ওজন তোলার পরে গ্লুকোমিটারে যদি দেখা যায় রক্তে শর্করার মাত্রা উল্টে বেড়ে গিয়েছে, তা হলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সব সময় এই বৃদ্ধি ব্যায়ামের ক্ষতির ইঙ্গিত নয়। বরং শরীরের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়াতেই এমনটা হতে পারে।

সাধারণভাবে ব্যায়ামের সময় পেশি শক্তির জন্য রক্তে থাকা গ্লুকোজ ব্যবহার করে। ফলে রক্তে শর্করা কমার কথা। একই সঙ্গে নিয়মিত শরীরচর্চা ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতেও সাহায্য করে। কিন্তু ব্যায়ামের ধরন ও তীব্রতা বাড়লে শরীরের প্রতিক্রিয়াও বদলে যায়। বিশেষ করে অত্যন্ত জোরে ব্যায়াম করলে শরীর সেটিকে এক ধরনের শারীরিক চাপ বা ‘ফিজিয়োলজিক্যাল স্ট্রেস’ হিসেবে নিতে পারে।

ডায়েটিশিয়ানরা কী বলছেন?

ডায়েটিশিয়ান ও সার্টিফায়েড ডায়াবিটিস এডুকেটর অর্চনা বাত্রার ব্যাখ্যা, ব্যায়ামের সময় শরীরে অ্যাড্রিনালিন, নরঅ্যাড্রিনালিন এবং কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোন বাড়ে। এই হরমোনগুলি যকৃতকে সঞ্চিত গ্লুকোজ রক্তে ছাড়ার সংকেত দেয়। উদ্দেশ্য একটাই—কাজ করতে থাকা পেশিগুলির জন্য দ্রুত শক্তির জোগান তৈরি করা। কিন্তু যকৃত থেকে যে গতিতে গ্লুকোজ বেরোচ্ছে, পেশি যদি সেই গতিতে তা ব্যবহার করতে না পারে, তা হলে ব্যায়ামের সময় বা ঠিক পরেই রক্তে শর্করা সাময়িক ভাবে বেড়ে যেতে পারে।

ডায়াবিটিস ও স্থূলতা বিশেষজ্ঞ রাজীব কোভিলের মতে, একই প্রক্রিয়ায় অ্যাড্রিনালিন, নরঅ্যাড্রিনালিন, কর্টিসল এবং গ্লুকাগনের মাত্রা বাড়তে পারে। এগুলি যকৃতকে সঞ্চিত গ্লুকোজ ভেঙে রক্তে ছাড়তে এবং নতুন করে গ্লুকোজ তৈরিতে উৎসাহিত করে। ফলে পেশি যে পরিমাণ গ্লুকোজ ব্যবহার করছে, তার তুলনায় যকৃত থেকে বেশি গ্লুকোজ রক্তে এলে সাময়িক ‘স্পাইক’ দেখা যায়। ডায়াবিটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে ইনসুলিনের পরিমাণ বা কার্যকারিতা এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ সামলানোর জন্য যথেষ্ট না হলে এই ওঠানামা আরও স্পষ্ট হতে পারে।

কোন ব্যায়ামে রক্তে শর্করার সাময়িক বৃদ্ধি ঘটে?

তবে সব ব্যায়ামে এমনটা হয় না। HIIT, স্প্রিন্ট, ভারী রেজ়িস্ট্যান্স ট্রেনিং এবং অত্যন্ত কঠিন বা প্রতিযোগিতামূলক ব্যায়ামে রক্তে শর্করা সাময়িক বাড়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। অন্য দিকে দ্রুত হাঁটা, মাঝারি গতিতে সাইক্লিং বা সাঁতারের মতো মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামে পেশি সাধারণত রক্তে থাকা গ্লুকোজ বেশি ব্যবহার করে। ফলে এ ধরনের শরীরচর্চার পরে রক্তে শর্করা কমার সম্ভাবনাই বেশি।

তবে শুধু ব্যায়ামের তীব্রতাই নয়, ওয়ার্কআউটের আগে কী খেয়েছেন, তখন রক্তে শর্করার মাত্রা কত ছিল, শরীরে জলের ঘাটতি রয়েছে কি না এবং মানসিক চাপ কতটা, এসবও গ্লুকোজের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

আরও পড়ুন
টাইপ-১ ডায়াবিটিস কেন হয়?
স্তন ক্যানসার: ঋণের জালে সর্বস্বান্ত বাংলার নারীরা
ট্রাইকোটিলোম্যানিয়া কি মানসিক অসুখ?

তা হলে ব্যায়ামের পর কতটা বৃদ্ধি স্বাভাবিক? বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, খুব জোরে ব্যায়ামের পর অল্প সময়ের জন্য রক্তে শর্করা বাড়া শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। শরীর যখন ধীরে ধীরে বিশ্রামের অবস্থায় ফিরবে এবং স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমবে, তখন গ্লুকোজও সাধারণত নিজের স্বাভাবিক মাত্রার দিকে ফিরতে শুরু করে। তাই শুধু ব্যায়ামের ঠিক পরের একটি রিডিং দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে কয়েক ঘণ্টার প্রবণতা দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই ক্ষেত্রে অবহেলা করবেন না

কিন্তু যদি প্রতিবার ব্যায়ামের পরই রক্তে শর্করা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যায়, দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে, অথবা অত্যধিক তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, বমি বমি ভাব, পেটে অস্বস্তি, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তা হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।

বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন টাইপ-১ ডায়াবিটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে। রক্তে শর্করা অত্যন্ত বেশি থাকলে, বিশেষ করে ২৫০ mg/dL-এর উপরে গেলে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিটোন পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে। রক্তে শর্করার সঙ্গে কিটোন বেড়ে গেলে কঠিন ব্যায়াম পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে এবং ডায়াবিটিক কিটোঅ্যাসিডোসিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আর যদি প্রতিদিনের ওয়ার্কআউটের পর একই রকম স্পাইক দেখা যায়? ব্যায়াম বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। বরং কয়েক দিন ধরে আগে ও পরে রক্তে শর্করার মাত্রা লিখে রাখুন। সঙ্গে নোট করুন কী ধরনের ব্যায়াম করেছেন, কতক্ষণ করেছেন, কতটা জোরে করেছেন এবং ব্যায়ামের আগে কখন ও কী খেয়েছেন। যাঁরা কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটর ব্যবহার করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে কোন ধরনের ব্যায়ামের পর স্পাইক বেশি হচ্ছে, সেই ধারাটিও তুলনামূলক সহজে বোঝা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, HIIT বা ভারী ওজন তোলার পরে স্পাইক হলে ওয়ার্কআউটের শেষে ১০–২০ মিনিট মাঝারি মাত্রার হাঁটা বা অ্যারোবিক ব্যায়াম কিছু ক্ষেত্রে পেশিকে রক্তে থাকা গ্লুকোজ ব্যবহার করতে সাহায্য করতে পারে। পর্যাপ্ত জল খাওয়াও জরুরি।

যারা ইনসুলিন ব্যবহার করেন

তবে ইনসুলিন ব্যবহার করেন এমন ব্যক্তিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। ব্যায়ামের পর রক্তে শর্করা বেড়েছে দেখে নিজের সিদ্ধান্তে সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত ইনসুলিন নেওয়া ঠিক নয়। কারণ ব্যায়ামের পরে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা বাড়তে পারে। ফলে তাৎক্ষণিক ভাবে বেশি ইনসুলিন নিলে পরে রক্তে শর্করা বিপজ্জনক ভাবে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

অর্থাৎ, কঠিন ব্যায়ামের পর গ্লুকোমিটারে সাময়িক ঊর্ধ্বগতি দেখেই ভাবার কারণ নেই যে ব্যায়াম শরীরের ক্ষতি করছে। আসল বিষয় হল—শর্করা কতটা বাড়ছে, কতক্ষণ বেশি থাকছে, পরে কত দ্রুত নামছে এবং একই ধরনের ব্যায়ামে বার বার একই ঘটনা ঘটছে কি না। নিয়মিত বা অস্বাভাবিক স্পাইক হলে চিকিৎসক কিংবা ডায়াবিটিস এডুকেটরের সঙ্গে আলোচনা করেই ব্যায়াম, খাবার এবং ওষুধের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা নিরাপদ।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
সৌমালী চক্রবর্তী
সৌমালী চক্রবর্তী

2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য