৩০শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
পিতার আপসহীন বিচারে ধূলিস্যাৎ এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য

লান সাং সম্রাজ্য ভেঙে গিয়ে তিন টুকরো হয়ে যায়। ছবি - Google

পিতার আপসহীন বিচারে ধূলিস্যাৎ এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

আইনের অন্ধত্ব নাকি সাম্রাজ্যের পতন: লান সাং সাম্রাজ্যের করুণ ইতিহাস

কঠোর আইনের বলি হয়ে কীভাবে ধ্বংস হয়েছিল লাওসের শক্তিশালী লান সাং সাম্রাজ্য? রাজা সুউরিগ্না ভংসা ও তাঁর একমাত্র পুত্রের মৃত্যুদণ্ডের নির্মম ট্র্যাজেডির গল্প জানুন।

মূল বিষয়

আইন যখন অন্ধের মতো কঠোর হয়, তখন তা অপরাধীকে ধ্বংস করার পাশাপাশি সমাজে চরম অস্থিরতাও তৈরি করে। আইনের অন্ধত্বের কারণে একটি আস্ত শক্তিশালী সাম্রাজ্যের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অবাক করা কাহিনী আজ জানবেন আপনারা।

সপ্তদশ শতাব্দীর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস ঠিক এমনই এক ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়েছিল। আইন প্রয়োগের অন্ধত্বের কারণেই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল সপ্তদশ শতাব্দীর লাওসের পরাক্রমশালী লান সাং সাম্রাজ্য।

রাজা সুউরিগ্না ভংসা এবং তাঁর স্বর্ণযুগ

১৬৩৭ সাল। লান সাং সাম্রাজ্যে তখন চরম অস্থিরতা চলছে। এমন এক টালমাটাল পরিস্থিতিতে সিংহাসনে বসেন রাজা সুউরিগ্না ভংসা। তিনি ছিলেন লান সাং সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত খুন লো রাজবংশের যোগ্য উত্তরসূরি। তাঁর সিংহাসনে বসার পর দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে শুরু করে। একটানা ৫৭ বছর তিনি রাজত্ব করেছিলেন। লাওসের ইতিহাসে এই সময়টাকে স্বর্ণযুগ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।

সুউরিগ্না ভংসার শাসনকালে সাম্রাজ্যের সীমানা যেমন বেড়েছিল, তেমনই শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছিল সাধারণ মানুষের জীবনে। তিনি ধর্ম ও আইনের কঠোর অনুশাসনে রাজ্য বাঁধতে চেয়েছিলেন। প্রাচীন ভারতীয় ধর্মশাস্ত্র ও স্থানীয় রীতির উপর ভিত্তি করে তিনি তৈরি করেছিলেন এক অত্যন্ত কড়া আইনব্যবস্থা। এর একটি বিশেষ অধ্যায় ছিল 'কামেমিচ্ছাচারা'। সেখানে নারী নির্যাতন, প্রতারণা এবং পরকীয়ার মতো অপরাধের জন্য চরম শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিল। তাঁর রাজদরবারের বিপুল ঐশ্বর্য এবং আইনের এই কড়াকড়ির কথা ডাচ বণিক গ্যারিট ফন উইস্টহফ এবং ইতালীয় মিশনারি জিওভান্নি মারিয়া লেরিয়ার মতো ইউরোপীয় পর্যটকদের বর্ণনায় পাওয়া গিয়েছে।

যুবরাজ ইন্দ্র ব্রহ্মা'র চরম কেলেঙ্কারি

সুউরিগ্না ভংসা'র শাসনে সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটল খোদ রাজপরিবারের অন্দরমহলে। রাজা সুউরিগ্না ভংসার একমাত্র পুত্র ছিলেন চাও রাতসাভং বা যুবরাজ। কিছু কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাঁর নাম ইন্দ্র ব্রহ্মা হিসাবেও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনিই ছিলেন সিংহাসনের একমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক উত্তরাধিকারী।
এই ইন্দ্র ব্রহ্মা রাজদরবারেরই এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার স্ত্রী'র সাথে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তৎকালীন সমাজ এবং বৌদ্ধ ধর্মের রীতিতে পরকীয়া বা ব্যভিচার ছিল ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। রাজ আইনেও এটা কঠোরতম শাস্তিযোগ্য অপরাধ ছিল। রাজার গুপ্তচরদের চোখে এই ঘটনা ধরা পড়তে বেশি সময় লাগেনি। ফলে রাজা সুউরিগ্না ভংসা খুব দ্রুত ঘটনাটি জানতে পেরে যান।

যুবরাজের মৃত্যুদণ্ড

খবরটি শোনার পর রাজা সুউরিগ্না ভংসা এক প্রবল মানসিক দ্বন্দ্বের মুখে পড়েন। একদিকে নিজের ঔরসজাত একমাত্র সন্তান। অন্যদিকে নিজেরই তৈরি করা কঠোর আইন। আর সেই আইনে রাজ পরিবারের সদস্য ও সাধারণ প্রজা, সকলের জন্যই মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল।

এই পরিস্থিতিতে রাজ পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, অনেক মন্ত্রী এবং অভিজাত ব্যক্তিরা যুবরাজকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য রাজার কাছে বারবার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু রাজা ছিলেন নিজের সিদ্ধান্তে অটল। আইনের চোখে যে সবাই সমান, সেই বার্তা দিতে তিনি নিজের চরম ক্ষতি মেনে নেন। ফলে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে তিনি নিজের ছেলেকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

যুবরাজ ইন্দ্র ব্রহ্মা নিজে থেকে বাঁচার বা বিদ্রোহ করার ন্যূনতম সুযোগও পাননি। রাজা সুউরিগ্না ভংসা সেনাবাহিনী ও বিচারব্যবস্থার উপর এতটাই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ রাখতেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে গিয়ে সৈন্যদের সমর্থন জোগাড় করা যুবরাজের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। তাছাড়া অপরাধের ধরনটি সামাজিকভাবে সেই সময় এতটাই নিন্দনীয় ছিল যে, কেউ যুবরাজের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস দেখায়নি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে যুবরাজ ইন্দ্র ব্রহ্মার শিরশ্ছেদ করে রাজার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ কার্যকর করা হয়।

রাজার মৃত্যুতে উত্তরাধিকারহীন সিংহাসন

১৬৯৪ সালের দিকে রাজা সুউরিগ্না ভংসা মারা যান। মৃত্যুর সময় তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় সঙ্কট ছিল উত্তরাধিকারের অভাব। একমাত্র পুত্রকে আগেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। সেই রাজপুত্রের সন্তানরা অর্থাৎ রাজার দুই নাতি কিৎসরাত এবং ইনথাসন তখন নিতান্তই নাবালক। হলে বৈধ উত্তরাধিকার ঠিক করে যেতে পারেননি প্রবল প্রতাপশালী রাজা সুউরিগ্না ভংসা।

আরও পড়ুন
হিন্দু দেবী রূপে বুদ্ধের বংশের কুমারী! জীবিত দুর্গার কাহিনী
যুবরাজকে বিয়ের জন্য স্টেরিলাইজেশন করতে বাধ্য হয়েছিলেন রত্না!
এক বৌদ্ধ রাষ্ট্রে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে আজ‌ও রাজত্ব করছেন ‘রাম’!

এই চরম শূন্যতার সুযোগ নেন রাজার প্রধানমন্ত্রী তিয়ান থালা। রাজবংশের বাইরের মানুষ হয়েও তিনি জোর করে সিংহাসনে বসেন। ক্ষমতা পোক্ত করার জন্য তিনি সুউরিগ্না ভংসার কন্যা রাজকুমারী সুমঙ্গলাকে জোর করে বিয়ে করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সুমঙ্গলা তখন ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। তিনি এই কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে মেকং নদী ধরে পালিয়ে যান।

লান সাং সাম্রাজ্যের বিভাজন

প্রধানমন্ত্রী তিয়ান থালার সিংহাসনে বসার বিষয়টি রাজপরিবার এবং অভিজাত শ্রেণি মেনে নেয়নি। এদিকে মৃত রাজার নাতিরা প্রাণভয়ে সাম্রাজ্যের উত্তর দিকে পালিয়ে যায়। অন্যান্য রাজপুত্ররাও নিজেদের মতো করে সৈন্য জোগাড় করে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ফলে এক স্থিতিশীল শান্ত রাজ্যে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ।

যে সাম্রাজ্যকে রাজা সুউরিগ্না ভংসা তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন, তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে থাকে। গৃহযুদ্ধের পরিণতিতে ১৭০৭ এবং ১৭১৩ সালে লান সাং সাম্রাজ্য তিন টুকরো হয়ে যায়। জন্ম নেয় লুয়াং প্রাবাং, ভিয়েনতিয়েন এবং চম্পাসাক নামে তিনটি দুর্বল ও স্বাধীন রাজ্যের।

তবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিস্ময় লুকিয়ে ছিল এই তিন রাজ্যের ভবিষ্যৎ শাসকদের পরিচয়ের মধ্যে। যে যুবরাজকে রাজা মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, সেই ইন্দ্র ব্রহ্মার দুই ছেলে এবং রাজকন্যার ছেলেই শেষ পর্যন্ত এই খণ্ডিত রাজ্যগুলোর রাজা হয়েছিলেন।

উত্তরাধিকারীদের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন

উত্তরের লুয়াং প্রাবাং অঞ্চলের রাজা হন কিৎসরাত। তিনি ছিলেন নিহত যুবরাজ ইন্দ্র ব্রহ্মার সন্তান। ১৭০৭ সালে তিনি বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে এই অঞ্চল দখল করে নিজেকে স্বাধীন রাজা ঘোষণা করেন। পিতার মৃত্যুদণ্ডের কারণে যে সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়েছিল, ছেলে সেই সাম্রাজ্যের একটি অংশের স্বাধীন রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

অন্যদিকে মধ্যাঞ্চলে ভিয়েনতিয়েন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন রাজা সেত্থাথিরাত দ্বিতীয়। তিনি মূলত সাই ওং হুয়ে নামে বেশি পরিচিত। তিনি ছিলেন রাজা সুউরিগ্না ভংসার ভাইপো। ভিয়েতনাম থেকে সৈন্য নিয়ে এসে তিনি ক্ষমতা দখলকারী প্রধানমন্ত্রী তিয়ান থালাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন।

সবচেয়ে দক্ষিণের রাজ্য চম্পাসাকের রাজা হন সোই সিসামাউথ বা নোকাসাদ। তিনি ছিলেন রাজকুমারী সুমঙ্গলার সেই সন্তান, যাকে গর্ভে নিয়ে রাজকুমারী নদীপথে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ১৭১৩ সালে স্থানীয় ধর্মগুরুদের সমর্থনে তিনি স্বাধীন চম্পাসাক রাজ্যের প্রথম রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসেন।

ইনথাসনের রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান


লুয়াং প্রাবাংয়ের ইতিহাসে আরেকটি বড় চমক রেখে গিয়েছিলেন কিৎসরাতের ছোট ভাই ইনথাসন।

১৭১৩ সালে কিৎসরাতের মৃত্যুর পর সিংহাসন দখল করে নিয়েছিল তাঁদের খুড়তুতো ভাই ওং খাম। সিংহাসনে বসতে ব্যর্থ হয়ে ইনথাসন রাজধানী ছেড়ে দূরে চলে গিয়ে সৈন্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন। তবে টানা ১০ বছর রাজ্য শাসনের পর ১৭২৩ সালে রাজা ওং খাম এক চরম বোকামি করে বসেন। তিনি দলবল নিয়ে গভীর জঙ্গলে শিকারে যান। শিকারের উত্তেজনায় রাজধানীর সুরক্ষার কথা বেমালুম ভুলে গেলেনগিয়েছিলেন। এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন ইনথাসন। তিনি দ্রুত তাঁর বাহিনী নিয়ে অরক্ষিত রাজধানীতে প্রবেশ করেন। বিনা রক্তপাতে তিনি ফাঁকা সিংহাসন দখল করে নিজেকে রাজা ঘোষণা করেন।

শিকার থেকে ফিরে রাজা ওং খাম দেখেন, তাঁর নিজের রাজ্য বেহাত হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে তিনি প্রতিবেশী রাজ্য চিয়াং মাই-তে পালিয়ে যান। এরপর ইনথাসন দীর্ঘ ২৬ বছর লুয়াং প্রাবাং শাসন করেছিলেন এবং চিনের সাথে শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য