

নেপালের বিখ্যাত কুমারী পুজো। ছবি - Google
কাঠমান্ডুর দরবার স্কয়ারের ইতিহাসখ্যাত কুমারী প্রথা নেপালের হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের অভূতপূর্ব সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক। লোককথা অনুযায়ী, রাজা জয়প্রকাশ মল্লের ভুল ও দেবী তলেজু ভবানীর স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে এই প্রথার সূচনা হয়। দেবীর নির্দেশে গৌতম বুদ্ধের পিতৃপুরুষ অর্থাৎ শাক্য বংশের এক শান্ত ও বত্রিশ লক্ষণযুক্ত শিশুকন্যাকে জীবন্ত দেবী হিসেবে নির্বাচন করা হয়। কঠিন 'কালরাত্রি' পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত এই কুমারীকে নেপালের রাজা থেকে শুরু করে বর্তমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত সকলেই পরম পূজনীয় মনে করেন। রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও শতাব্দীর প্রাচীন এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্য আজও নেপালে সমান মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে।
কাঠমান্ডুর দরবার স্কোয়ারের প্রাচীন কুমারী ঘরের সামনে প্রতিদিন অগণিত মানুষের ভিড় জমে। সবার চোখ থাকে কাঠের কারুকার্য করা ব্যালকনির দিকে। আর সেইসঙ্গে প্রতীক্ষা করতে থাকে লাল পোশাকে সজ্জিতা এবং কপালে তৃতীয় নয়ন অঙ্কিত এক ছোট্ট বালিকাকে দেখার। তিনি হলেন নেপালের জীবন্ত দেবী কুমারী।
রাজা থেকে শুরু করে সাধারণ প্রজা কিংবা বর্তমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত সবার কাছেই এই কুমারী পরম পূজনীয়। কিন্তু এই কুমারী প্রথার গভীরে লুকিয়ে রয়েছে এক চমকপ্রদ সমন্বয় ও সম্প্রীতির ইতিহাস। যে হিন্দু দেবী তলেজু ভবানীর (দেবী দুর্গার একটি রূপ) অবতার হিসেবে এই শিশুকন্যাকে পুজো করা হয় তিনি কোনও হিন্দু পরিবারের সন্তান নন। তিনি আসেন আদ্যোপান্ত একটি বৌদ্ধ পরিবার থেকে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, স্বয়ং গৌতম বুদ্ধের পিতৃবংশের এক শিশুকন্যাকেই হিন্দু দেবীর অবতার হিসেবে পুজো করা হয় নেপালে।
নেপালে জীবন্ত কুমারী পুজোর সূত্রপাত ঘটেছিল মল্ল রাজবংশের শাসনামলে। অষ্টাদশ শতাব্দীর কাঠমান্ডুর শেষ মল্ল রাজা জয়প্রকাশ মল্লের সঙ্গে এই প্রথার উৎপত্তির ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। প্রচলিত লোককথা ও ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, মল্ল রাজাদের ইষ্টদেবী তলেজু ভবানী অত্যন্ত সুন্দরী এক নারীর রূপ ধরে প্রতি রাতে রাজপ্রাসাদে আসতেন। রাজা জয়প্রকাশ মল্লের সঙ্গে তিনি নাকি গোপনে ত্রিপাশা খেলতেন। দেবীর কড়া নির্দেশ ছিল, তাঁদের এই সাক্ষাতের কথা যেন তৃতীয় কেউ কখনও জানতে না পারে। কিন্তু একদিন রানি সন্দেহবশত লুকিয়ে তাঁদের দেখে ফেলেন বলে মুখে মুখে প্রচলিত আছে। অন্য একটি লোকশ্রুতি বলে, পাশা খেলার সময় একদিন রাজা নিজেই দেবীর প্রতি কামনার দৃষ্টিতে তাকান। শর্ত ভঙ্গ হওয়ায় দেবী ক্রুদ্ধ হন এবং চিরতরে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে চলে যান।
রাজা নিজের চরম ভুল বুঝতে পেরে দেবীর কাছে অনবরত ক্ষমা চাইতে থাকেন। অবশেষে দেবী তলেজু রাজাকে স্বপ্নে দেখা দেন। তিনি জানান, মানুষের রূপে আর কখনও আসবেন না। তবে রাজা যদি নেপালের বৌদ্ধ শাক্য বংশের কোনও শুদ্ধ কুমারী কন্যাকে নির্বাচন করে পুজো করেন, তবেই দেবী সেই বালিকার শরীরে ভর করে রাজ্যকে রক্ষা করবেন। দেবীর এই স্বপ্নাদেশ মেনেই রাজা কুমারী ঘর নির্মাণ করেন এবং প্রথাটির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এই শাক্য বংশ আসলে কারা এবং কেনই বা তাদের বেছে নেওয়া হল। নেপালের নেওয়ার সম্প্রদায়ের শাক্যরা হলেন কাঠমান্ডু উপত্যকার অত্যন্ত প্রাচীন এক বৌদ্ধ গোষ্ঠী। ঐতিহাসিকদের মতে এরা হলেন গৌতম বুদ্ধের পিতৃবংশ অর্থাৎ কপিলবস্তুর শাক্য রাজবংশের সরাসরি বংশধর।
প্রাচীনকালে কোশলরাজের পুত্র বিরূঢ়ক যখন কপিলবস্তু আক্রমণ করে শাক্যদের প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, তখন প্রাণে বাঁচতে তাদের একটি অংশ হিমালয়ের দুর্গম কাঠমান্ডু উপত্যকায় পালিয়ে আসে। সেখানে তারা নিজেদের আসল রাজকীয় পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখে। উপত্যকার মূল আদিবাসীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে তারা ধাতু ও রত্ন খোদাইয়ের পেশা বেছে নেয়। কালক্রমে তারাই নেওয়ার সমাজের রত্নকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। কাঠমান্ডু বা পাটান শহরের মন্দিরগুলোতে যে চমৎকার সব ধাতব ভাস্কর্য দেখা যায়, তা এই শাক্য কারিগরদেরই সৃষ্টি। সেই বৌদ্ধ শাক্য বংশের শিশুকন্যাকেই হিন্দু মল্ল রাজারা জীবন্ত দেবী হিসেবে বেছে নেন। পরবর্তীতে শাহ রাজবংশের আমলেও একই প্রথা চালু থাকে এবং ২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর প্রজাতান্ত্রিক নেপালেও একই নিয়ম চালু আছে।
এক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে শাক্য বংশের যে কোনও বালিকাই কিন্তু কুমারী হতে পারে না। এর নির্বাচন প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর এবং প্রাচীন তান্ত্রিক নিয়ম মেনে করা হয়। কুমারী পদপ্রার্থীকে অবশ্যই বত্রিশটি নিখুঁত শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে। হরিণের মতো ঊরু বা সিংহের মতো বুক কিংবা রাজহাঁসের মতো কণ্ঠস্বর হল সেই ৩২ লক্ষণের অন্যতম।
এরপর আসে সবচেয়ে কঠিন পর্ব- কালরাত্রির পরীক্ষা। নবরাত্রির মহাষ্টমীর গভীর রাতে বালিকাকে এমন এক পরিবেশে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে সদ্য বলি দেওয়া মহিষ ও ছাগলের ১০৮টি কাটা মুণ্ডু রাখা থাকে। চারদিকে রক্ত ছড়ানো থাকে এবং বীভৎস মুখোশ পরা মানুষেরা নাচগান করে। বিশ্বাস করা হয়, এই ভয়ঙ্কর পরিবেশে যে বালিকা বিন্দুমাত্র ভয় পাবে না বা কাঁদবে না সেই হবে প্রকৃত কুমারী।
তবে আড়াই বা তিন বছরের একটি শিশুর পক্ষে বাস্তবে এই পরীক্ষাটি উত্তীর্ণ হওয়া এক প্রকার অসম্ভব, যদি না কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটে। তবে নেওয়ার সম্প্রদায়ের শিশুরা ছোটবেলা থেকেই দশেরা বা দাঁশাই উৎসবের অঙ্গ হিসেবে পশু বলি দেখতে অভ্যস্ত। সবচেয়ে বড় কথা হল গভীর রাতের এই পরীক্ষার সময় ওই বয়সের শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। পরিচিত পুরোহিতদের কোলে আধো ঘুমন্ত অবস্থায় পার হওয়ার কারণে তার ভয় পাওয়ার কোনও সুযোগই থাকে না। পুরোহিতরা মূলত শিশুটির স্বভাবগত প্রশান্তি দেখেন। যে শিশুটি এমনিতে শান্ত এবং অচেনা পরিবেশে অযথা কান্নাকাটি করে না তাকেই দেবীর শান্ত রূপের উপযুক্ত বলে ধরে নেওয়া হয়।
২০০৮ সালে নেপালে শাহ রাজবংশের পতন ঘটে এবং ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু শতাব্দী প্রাচীন এই প্রথার শিকড় নেপালি সমাজে এতটাই গভীরে ছড়িয়ে আছে যে কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতায় এলেও কুমারী পুজোয় একটুও ছেদ পড়েনি।
রাজতন্ত্রের যুগে নিয়ম ছিল নির্বাচিত কুমারীর জন্মকুণ্ডলীর সঙ্গে তৎকালীন রাজার কুণ্ডলীর সম্পূর্ণ মিল থাকতে হবে। গণতান্ত্রিক নেপালে সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাজার সেই স্থানটি নিয়েছেন দেশের রাষ্ট্রপতি। তাই এখন কুমারী নির্বাচনের সময় প্রার্থীর কুণ্ডলী তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতির কুণ্ডলীর সঙ্গেই মিলিয়ে দেখা বাধ্যতামূলক। নেপালের বর্তমান রাষ্ট্রপতিরাও প্রাচীন রাজাদের মতোই রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য কুমারীর সামনে মাথা নত করে আশীর্বাদ গ্রহণ করেন। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই প্রাচীন হিন্দু ও বৌদ্ধ প্রথাটি এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে আজও স্বমহিমায় টিকে আছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
