

কলকাতার ট্রাম শুধুই নস্টালজিয়া? ছবি - Google
ট্রাম যেমন কলকাতার ঐতিহ্য, তেমনই বাঙালির নস্টালজিয়ার অংশও বটে। কিন্তু শুধু ঐতিহ্য রক্ষা বা নস্টালজিয়ার স্বার্থে নয়। পরিবেশের কারণেই ট্রামকে বাঁচিয়ে রাখাটা জরুরি। কিন্তু আমাদের এখানে দৃষ্টিভঙ্গি জনিত সমস্যার কারণে যে ট্রাম গণ-পরিবহনের এক শক্তিশালী খুঁটি হতে পারত, তাকে উল্টে অতীতের গর্ভে চিরতরে হারিয়ে দেওয়ার পাকাপাকি ব্যবস্থা কার্যত করে ফেলা হয়েছে।
কলকাতার ব্যস্ত রাস্তার ঢং ঢং শব্দটা একসময় শহরের অবিচ্ছেদ্য হৃদস্পন্দন ছিল। তবে সেই ঢং ঢং আজ আধুনিক যানবাহনের কানফাটানো হর্নের দাপটে প্রায় চাপা পড়ে গিয়েছে। কলকাতা শহরের ১৫০ বছরের পুরনো সেই ঐতিহ্যবাহী ট্রাম বর্তমানে এক কঠিন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
আধুনিক নাগরিক জীবনের গতির চাহিদা মেটাতে এবং সেইসঙ্গে যানজট থেকে মুক্তির মরিয়া চেষ্টার কার্যত বলি হয়েছে কলকাতার ট্রাম। কিন্তু পরিবেশ, স্মৃতি আর ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তাকে জাগিয়ে তোলার দাবিও যথেষ্ট জোরালো। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আধুনিক কলকাতার রাস্তায় ট্রামের কি আদৌ কোনও জায়গা আছে? নাকি এটি কেবলই জাদুঘরে রাখার মতো এক অতীত স্মৃতি হতে চলেছে?
এই সময়টা যে গতির যুগ, তা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। মানুষের হাতে সময় কম এবং সবাই ছুটছে। কলকাতা শহরের মোট আয়তনের মাত্র ৬ শতাংশ হল রাস্তা। অন্যান্য মেট্রো শহরের তুলনায় এই যা নিতান্তই নগণ্য। অন্যান্য মেট্রোপলিটন সিটিগুলোয় এই রাস্তার পরিমাণ সেখানকার মোট আয়তনের ১২-২০% শতাংশ পর্যন্ত হয়।
এদিকে এই স্বল্প রাস্তায় প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা। ট্রাফিক পুলিশ ও নগরোন্নয়ন দফতরের মতে, এই বিপুল যানবাহনের চাপে রাস্তার মাঝখান দিয়ে যাওয়া ধীরগতির ট্রাম একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রামের মন্থর গতি পেছনের দ্রুতগামী গাড়িগুলোকে আটকে দেয়। ফলে সিগন্যালে অপেক্ষার সময় বাড়ে।
তাছাড়া ট্রামের রুট নির্দিষ্ট। বাস বা অটোর মতো রাস্তা আটকে গেলে পাশ কাটিয়ে গলি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কোনও উপায় নেই ট্রামের। এই যানজটের গেরো কাটাতে গত কয়েক বছরে শহরের অধিকাংশ ট্রামলাইন পিচ ঢেলে বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে একের পর এক জনপ্রিয় রুট। এ যেন ট্রামের শেষকৃত্য সম্পন্নের পর্ব চলছে!
গতির যুগ মানেই যে ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য বা মসৃণ ফ্লাইওভার ধরে সাঁ সাঁ করে ছুটে চলা, এই ভুল ধারণা থেকে উন্নত বিশ্ব অনেক আগেই বেরিয়ে এসেছে। ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ার আধুনিক শহরগুলো অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে, শহরের হৃৎপিণ্ড সচল রাখতে হলে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের কোনও বিকল্প নেই। আর ঠিক এই জায়গাতেই কলকাতার সঙ্গে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও নগর পরিকল্পনার বিস্তর ফারাক দেখা দিয়েছে।
কলকাতা যখন ট্রাম তুলে দিচ্ছে, তখন প্যারিস, বার্লিন বা মেলবোর্নের মতো শহরগুলো বিপুল খরচ করে নতুন করে লাইট রেল ট্রানজিট (LRT) বা আধুনিক ট্রাম ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনছে। পরিসংখ্যান বলছে ইউরোপের প্রায় দুশোর বেশি শহরে এখন সফলভাবে ট্রাম চলছে। কিন্তু ২১ শতকের গতির দুনিয়ায় দাঁড়িয়ে তারা এটা কীভাবে সম্ভব করল?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে সঠিক এবং সময়োপযোগী নগর পরিকল্পনায়। বিদেশের শহরগুলোতে আধুনিক ট্রামের জন্য রাস্তার একটি নির্দিষ্ট অংশ সংরক্ষিত থাকে। একে ডেডিকেটেড লেন বলা হয়। ফলে ট্রামকে বাস বা ব্যক্তিগত গাড়ির যানজটে আটকে পড়তে হয় না। ট্রামের কারণে অন্য গাড়িও চলাচলে বাধাপ্রাপ্ত হয় না। এদিকে আমাদের কলকাতায় ট্রামলাইন রাস্তার ঠিক মাঝখান দিয়ে গিয়েছে এবং ওই একই রাস্তা সব গাড়িই ব্যবহার করে। ফলে কোনও একটি গাড়ি বা ট্রাম রাস্তার মধ্যে বিকল হলে পুরো ব্যবস্থাটি থমকে যায়। তাছাড়া এখানকার মান্ধাতার আমলের মন্থর গতির ট্রামের কারণে স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য গাড়ির গতি কমে যায়।
বিদেশের এখনকার ট্রামগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেগুলি ওজনে অত্যন্ত হালকা এবং দ্রুতগামী। সেখানে ট্রানজিট সিগন্যাল প্রায়োরিটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর ফলে ওই সব দেশে ট্রাম সিগন্যালের কাছাকাছি পৌঁছালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিগন্যালের সবুজ আলো জ্বলে ওঠে। অন্যদিকে কলকাতায় যে ট্রাম চলে বা চলত তার প্রযুক্তি দশকের পর দশক ধরে কার্যত স্থবির হয়ে আছে। সেই পুরনো আমলের ভারী, জরাজীর্ণ ও ধীরগতির কোচ ব্যবহার করা হয়, যা আধুনিক ট্রাফিকের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মোটেও উপযোগী নয়। তা করে তোলার কোনও চেষ্টাও এখানে হয়নি।
আসলে সব দোষ কেবল প্রযুক্তির উপর চাপালে হবে না। বরং এক্ষেত্রে মূল তফাৎটা চিন্তাভাবনার। ইউরোপের শহরগুলোর বর্তমান নগর পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যই হল শহরের প্রাণকেন্দ্রে ব্যক্তিগত গাড়ির প্রবেশাধিকার ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা। তারা গাড়ির লেন কমিয়ে ট্রাম ও সাইকেলের জন্য জায়গা বাড়াচ্ছে। আর কলকাতায় ঠিক এর উল্টো ছবি চোখে পড়ে। এখানে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির হারকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে কোনও সুস্পষ্ট নীতিই নেই। এখানে মসৃণ যাতায়াতের সুবিধার জন্য পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনকে রাস্তা থেকে সরিয়েই দেওয়া হচ্ছে!
কলকাতার রাস্তার স্বল্পতা একটি বাস্তব সমস্যা ঠিকই। কিন্তু এর সমাধান হিসেবে ট্রামকে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়াটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবকেই প্রকট করে তোলে। একে এক প্রকার অবিমৃষ্যকারিতা বলা চলে।
বিদেশের শহরগুলো প্রমাণ করেছে, ঐতিহ্যকে কেবল জাদুঘরে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তাকে দৈনন্দিন জীবনের উপযোগী করে তোলা যায়। আর কলকাতা এই বিষয়ে সবচেয়ে সহজ শর্টকাট বেছে নিয়ে ট্রাম লাইন'ই বুজিয়ে দিচ্ছে।
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবকে ঢাল করে একটি পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাকে অকেজো প্রমাণ করার এই প্রবণতা আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক বিরাট অবিচার। সাংস্কৃতিক দিক থেকেও কলকাতা তার এক অনন্য পরিচিতি হারাচ্ছে। এশিয়ার একমাত্র টিকে থাকা ট্রাম শহরের তকমাটি কলকাতা যেন নিজের হাতেই মুছে ফেলতে চাইছে। যানজট কমানোর নামে আজ যে ব্যক্তিগত গাড়িগুলোকে আমরা জায়গা করে দিচ্ছি, আগামী দিনে সেই গাড়ির ধোঁয়া এবং স্থবিরতাই শহরের সবচেয়ে বড় সঙ্কট হয়ে দাঁড়াবে। সেদিন হয়ত দূষণ রুখতে নতুন করে ট্রাম ফেরানোর কথা ভাবতে হবে। ঠিক যেমনটা আজ লন্ডন বা সিডনি ভাবছে। কিন্তু ততদিনে আমাদের ১৫০ বছরের তৈরি করা অমূল্য পরিকাঠামো চিরতরে হারিয়ে যাবে।
আধুনিকতার অর্থ পুরোনোকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা নয়। নতুনের সঙ্গে তার বাস্তবসম্মত মেলবন্ধন ঘটানোই আসল আধুনিকতা। জরাজীর্ণ কোচের বদলে দ্রুতগামী সিঙ্গল কোচ ট্রাম কলকাতার রাস্তায় সহজেই নামানো যায়। এর পাশাপাশি যানজটপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে সরিয়ে গঙ্গার ধার, খিদিরপুর বা ময়দানের মতো মনোরম পরিবেশে, তুলনায় একটু কম ভিড় এলাকায় ডেডিকেটেড রুটে ট্রাম চালালে তা কলকাতা কেন্দ্রিক পর্যটনের এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
ট্রাম কলকাতার আত্মার সঙ্গে মিশে আছে। গতির প্রতিযোগিতায় সেই আত্মাকে বিসর্জন দিলে কলকাতা তার আন্তর্জাতিক পরিচয় হারাবে। আগামী দিনের তিলোত্তমার রাস্তায় ট্রামের ঘণ্টা বাজবে নাকি তা কেবল পুরোনো সিনেমার পর্দাতেই বন্দি হয়ে থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কিন্তু একটু একটু করে পার হয়ে যাচ্ছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
