

বইপাড়ার হালচাল। ছবি - Google
অনলাইনে কম দামে বই কেনার সুযোগ এবং ই-বুকের যতই দাপট আসুক না কেন সামনাসামনি হাতে বই নিয়ে পড়ার আবেদন ও অনুভূতি আলাদা। সবাই কখনওই ডিজিটাল বইয়ে আকৃষ্ট হবে না। ফলে কাগজে ছাপার কালির গন্ধের প্রতি আকর্ষণ থেকেই যাবে। কিন্তু ক্রমশ সেই পরিসরও সঙ্কুচিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে আছে আরও নানান সমস্যা। এত কিছু লড়াই লড়ে বাঁচতে পারবে তো কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া?
কলকাতার কলেজ স্ট্রিট শুধু একটি রাস্তা নয়। এটি বাঙালির আবেগ আর নস্টালজিয়ার এক জীবন্ত দলিল। একসময় বইয়ের গন্ধ আর নতুন মলাটের আকর্ষণে এখানে মানুষের ঢল নামত। কিন্তু আজ সময় বদলেছে। স্মার্টফোনের এক ক্লিকেই এখন বই চলে আসে বাড়ির দরজায়। অনলাইনের বিশাল ছাড় আর ই-বুকের যুগে দাঁড়িয়ে এশিয়ার বৃহত্তম এই পুরোনো ও নতুন বইয়ের বাজার আজ এক কঠিন বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। এই লড়াই টিকে থাকার। পাশাপাশি ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক প্রযুক্তির অসম লড়াইও বটে।
১৮১৭ সালে আজ যেখানে কলেজ স্ট্রিট সেখানে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। এই হিন্দু কলেজ'ই পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সি কলেজ হয়ে এখন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর ১৮৫৭ সালে এখানেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। ফলে ওই এলাকাটা বলতে গেলে বাংলার প্রধান শিক্ষা হাব হয়ে ওঠে। এক জায়গায় সেই সময়ের নিরিখে এতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকার কারণে তৎকালীন লটারি কমিটি (ব্রিটিশদের রাস্তার নামকরণ নির্ধারণী ব্যবস্থা) এই রাস্তার নাম রাখে কলেজ স্ট্রিট। ধীরে ধীরে এই রাস্তার এদিক ওদিক সহ এক থেকে দুই কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে আরও বহু কলেজ স্থাপিত হয়েছে। ফলে দিনে দিনে বই পাড়ার আরও জমজমাট হয়েছে।
পরবর্তীতে এখানে গড়ে ওঠে অ্যালবার্ট হল। এটাই ১৯৪২ সালে কফি হাউস নামে পরিচিত হয়। নেতাজি থেকে শুরু করে সত্যজিৎ রায়, অমর্ত্য সেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বদের আড্ডার সাক্ষী এই জায়গা।
এদিকে, বিংশ শতকের প্রথম দিক থেকেই বাংলা প্রকাশনা সংস্থাগুলোও এই কলেজ স্ট্রিটেই ঘাঁটি গাড়তে শুরু করে। তার আগে প্রকাশনা সংস্থাগুলোর মূল আস্তানা ছিল বটতলায়। তবে জায়গাটা শিক্ষার হাবে পরিণত হওয়ায় সেখানে সারা বছর বইয়ের চাহিদা থাকার বিষয়টি অনুমান করতে পেরেই তারা এখানে সরে আসতে শুরু করে। এইভাবেই একের পিঠে আরেক ঘটনার যুগোপদ পথ চলার হাত ধরে জন্ম নেয় এশিয়ার বৃহত্তম বই বাজার বা বাঙালির প্রাণের বইপাড়া।
আজকের দিনে কলেজ স্ট্রিট এক অভূতপূর্ব সঙ্কটের মুখে। অ্যামাজন বা ফ্লিপকার্টের মতো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো সারা বছরই বইয়ের উপর আকর্ষণীয় ছাড় দেয়। তারা এটা দিতে পারে কারণ এগুলি বিশাল আকারের কর্পোরেট পুঁজির অধীনে চলে। সেইসঙ্গে এইসব প্ল্যাটফর্মে হোম ডেলিভারি এবং সহজে বই ফেরতের সুবিধার থাকায় অনেকেই এখন আর ভিড় ঠেলে কলেজ স্ট্রিটে আসতে চান না। এর পাশাপাশি রয়েছে ই-বুক এবং অডিওবুকের দাপট। নতুন প্রজন্মের অনেকেই পিডিএফ পড়তে অভ্যস্ত। বেআইনি পিডিএফ আদানপ্রদান বইপাড়ার ব্যবসার অন্যতম বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ২০২৫ সালের দুর্গাপুজোর সময় হওয়া নজিরবিহীন বৃষ্টিপাত ও জল জমার ফলে এখানকার বিক্রেতারা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন। ছোট ছোট প্রকাশনা সংস্থাগুলিরও লক্ষাধিক টাকার বই নষ্ট হয়ে যায়। জল ও উইপোকা বইপাড়ার দীর্ঘদিনের শত্রু হলেও, সাম্প্রতিক এই বন্যা বিক্রেতাদের আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে।
কলেজ স্ট্রিটে মূলত তিন ধরনের বিক্রেতা দেখা যায়। এদের প্রত্যেকের সঙ্কট এবং টিকে থাকার লড়াই আলাদা আলাদা।
প্রথম ভাগে রয়েছে বড় বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলোর নিজস্ব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শোরুম। এরা কিছুটা হলেও পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে। নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে এরা অনলাইনে বই বিক্রি করছে। তাই ডিজিটাল আগ্রাসন এদের খুব একটা কাবু করতে পারেনি। বড় সংস্থা হওয়ায় এদের কাছে এই রূপান্তরের জন্য পর্যাপ্ত পুঁজি ও সম্পদ ছিল বা আছে।
দ্বিতীয় ভাগে আছেন সেইসব পুরোনো বই বিক্রেতারা যাঁদের কাছে আউট অফ প্রিন্ট বা দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংগ্রহ পাওয়া যায়। দেশ বিদেশের গবেষকরা আজও এঁদের উপর নির্ভরশীল। বাজার নির্দিষ্ট হওয়ায় এরাও কোনওমতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। যেহেতু দুষ্প্রাপ্য বই নিয়ে কারবার। তাই যতই ডিজিটালের দাপট থাকুক না কেন এর চাহিদা চট করে যাওয়ার নয়।
তবে সবচেয়ে বিপদে পড়েছেন তৃতীয় অংশের বিক্রেতারা। ফুটপাতের গুমটি দোকানগুলোই কলেজ স্ট্রিটের আসল প্রাণ। বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি এই ছোট দোকানগুলোতে মূলত পাঠ্যবই এবং সেকেন্ড হ্যান্ড বই বিক্রি হয়। এদের পুঁজি খুব কম। অনলাইনের বিশাল ছাড়ের সাথে পাল্লা দেওয়া এদের পক্ষে কার্যত অসম্ভব। বন্যার জলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি এদেরই হয়েছে। বই বিক্রি কমে যাওয়ায় এই ছোট বই ব্যবসায়ীদের সংসারে নেমে এসেছে চরম আর্থসামাজিক চাপ। আয় কমতে থাকায় অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন এবং ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়ার কথা ভাবছেন।
এতসব চ্যালেঞ্জের মাঝেও বইপাড়া কিন্তু হার মানেনি। কলেজ স্ট্রিটের বই পাড়ার একটা বড় বৈশিষ্ট্য হল এখানে দরদাম করে বই কেনা যায় এবং পুরনো বই জমা দিয়ে তার বিনিময়ে টাকা পাওয়া যায় ও সেই টাকা দিয়ে আবার নতুন বই কেনার সুযোগ থাকে। এই বিনিময় প্রথা আর কোনও বই বাজারে আছে কিনা সন্দেহ। পুরোনো ক্লাসের বই অর্ধেক দামে ফেরত দিয়ে নতুন ক্লাসের বই কিনে নেওয়ার যে সুযোগ এখানে মেলে তা অনলাইনে কখনওই পাওয়া যায় না। বাংলার সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তির। ফলে এই জায়গায় একটা অ্যাডভান্টেজ পাচ্ছেন এখানকার বই বিক্রেতারা।
এছাড়াও অনেক ঐতিহ্যবাহী বই বিক্রেতাই এখন প্রযুক্তির সাথে হাত মিলিয়েছেন। তারা হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সরাসরি অর্ডার নিচ্ছেন। ক্রেতা চাইলে সেখানে বইয়ের প্রচ্ছদ, সূচিপত্র পাঠিয়ে দেখিয়েও দিচ্ছেন। এরপর ক্রেতারা অনলাইনে টাকা দিলে কুরিয়ারের মাধ্যমে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বই পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি এইভাবে বিদেশেও বই যাচ্ছে। অর্থাৎ ডিজিটাল দুনিয়ার অস্ত্র দিয়েই ডিজিটাল দুনিয়ার সাথে লড়ছেন তাঁরা।
বইপাড়ার এই সঙ্কটের মধ্যে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে যা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের মে ও জুন মাস নাগাদ ফুটপাতের বেশ কিছু বই বিক্রেতাকে নোটিস দেওয়া শুরু হলে চরম উচ্ছেদ আতঙ্ক তৈরি হয়। এরপর জুলাই মাসে সরকার কলেজ স্ট্রিটের জন্য একটি নতুন মাস্টারপ্ল্যান ঘোষণা করে। এই পরিকল্পনায় ফুটপাতের গুমটিগুলোকে সুসজ্জিত ও আধুনিক স্টলে স্থানান্তরিত করার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া এই এলাকাটিকে নো ভেহিকেল জোন বা যানজটমুক্ত এলাকায় পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখানে হেরিটেজ ট্রাম, পড়ার জন্য বেঞ্চ এবং ফ্রি ওয়াইফাই থাকবে। উদ্দেশ্য হল- ক্রেতাদের সুন্দর অভিজ্ঞতা উপহার দেওয়া।
সরকারের এই পদক্ষেপ আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও এর নেতিবাচক দিক নিয়ে বিক্রেতারা মারাত্মক চিন্তিত। উন্নয়নের নামে সরকার যে রূপরেখা দিয়েছে তাতে শতাব্দীপ্রাচীন এই বাজারের স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট হওয়ার ভয় রয়েছে। আধুনিক স্টলগুলোর ভাড়া বা রক্ষণাবেক্ষণের খরচ ছোট বিক্রেতারা টানতে পারবেন কি না তা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। তাছাড়া রাস্তা সম্পূর্ণ যানজটমুক্ত করা হলে বইয়ের গাড়ি লোডিং ও আনলোডিংয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপক লজিস্টিক সমস্যা দেখা দেবে। এমনকি একেবারেই গাড়ি এই রাস্তায় প্রবেশ করতে না দিলে তা ক্রেতাদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা। কারণ অনেকটা বেশি পথ হেঁটে আসতে হওয়ার ভয়ে ক্রেতাদের একাংশ বই পাড়া থেকে আরও বেশি মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন।
কলেজ স্ট্রিট শুধু বইয়ের বাজার নয়। বাংলার আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার এক নিখুঁত দর্পণ। বাংলার সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা আজও কম দামে বই পাওয়ার আশায় কলেজ স্ট্রিটে ছুটে আসে। এই বাজার যদি হারিয়ে যায় তবে বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটা দিক কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়বে।
তাই বইপাড়াকে এবং তার আধার কলেজ স্ট্রিটকে হারতে দিলে চলবে না। তাকে জিতিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব বাঙালির, বাঙালি পাঠকের, বাংলার সংস্কৃতিপ্রেমী মননশীল ও পড়ুয়া মানুষজনের।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
