২৭শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
হলদেটে পোস্ট কার্ড বন্দি স্মৃতির নস্টালজিয়া

চিঠির হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির প্রতীকী ছবি - AI

হলদেটে পোস্ট কার্ড বন্দি স্মৃতির নস্টালজিয়া

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

ডিজিটাল যুগে কোথায় হারাল চিঠির আবেগ?

ডিজিটাল যুগের চিঠির প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। সেইসঙ্গে নিয়ে গিয়েছে স্মৃতির যাপন ও অপেক্ষার মাধুর্য। আজকের এই দ্রুতগতির এবং মুঠোয় ধরা পৃথিবীর সময়ে হলদে পোস্ট কার্ডে বন্দি অক্ষরের নস্টালজিয়া কাউকে কাউকে স্মৃতিমেদুর করে তোলে।

মূল বিষয়

আজ ৯ অক্টোবর। বিশ্ব ডাক দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে এই দিনটা এলেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে। স্মার্টফোনের নীল টিক আর ইনস্ট্যান্ট মেসেজের যুগে আজ আমরা বড্ড বেশি যান্ত্রিক হয়ে গিয়েছি। অথচ একটা সময় ছিল যখন মানুষের হাসি, কান্না আর মান অভিমানের একমাত্র বাহন ছিল চিঠি। ডাকঘরের পিওনের সাইকেলের ঘণ্টার ক্রিং ক্রিং শব্দের জন্য প্রহর গোনাটা ছিল জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় দাঁড়িয়ে চিঠির সেই হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতির দিকে ফিরে তাকালে স্মৃতির এক অদ্ভুত গন্ধ পাওয়া যায়।

চিঠির জন্মকথা ও বিবর্তনের পথচলা

প্রাচীনকালে পায়রার পায়ে বেঁধে বা ঘোড়সওয়ার দূতের মাধ্যমে খবর পাঠানো হত। রাজা বাদশাহদের যুগ পেরিয়ে চিঠি ধীরে ধীরে আমজনতার হাতের নাগালে পৌঁছায়। ১৮৭৪ সালের ৯ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের বার্নে 'ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন' তৈরি হয়। উদ্দেশ্য ছিল গোটা বিশ্বকে যোগাযোগের একটা নির্দিষ্ট ছাতার তলায় নিয়ে আসা। এরপর এল ডাকগাড়ি এবং ট্রেন। গড়ে উঠল এক অটুট নেটওয়ার্ক। নীল রঙের ইনল্যান্ড লেটার বা হলুদ পোস্টকার্ড হয়ে ওঠে বাঙালির আবেগ প্রকাশের মাধ্যম।

কিন্তু সময় আর থেমে থাকে না। দ্রুত খবর পাঠানোর তাগিদে একসময় এল টেলিগ্রাম। আর ইন্টারনেটের হাত ধরে আসা ইমেল এসে যেন চিঠির খোলসটাই বদলে দেয়। তারপর হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামের মতো ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং অ্যাপ এসে গোটা ছবিটাই বদলে দেয়। এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যোগাযোগের গতি বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু সেই সাথে কমেছে ধৈর্য্য, প্রতীক্ষা। এখন মেসেজগুলো পড়া হয় আর দ্রুত মন থেকে হারিয়ে যায়। পুরনো চিঠির মতো সযত্নে ট্রাঙ্কে বা বইয়ের ভাঁজে তুলে রাখার মধ্য দিয়ে যে আঁকড়ে ধরার রেওয়াজ ছিল, তা আজ আর নেই।

সময়ের সাথে ডাকবিভাগের ভোলবদল

চিঠির আদান প্রদান কমেছে ঠিকই। কিন্তু ডাকবিভাগ বা পোস্ট অফিস হারিয়ে যায়নি। টিকে থাকার তাগিদে তারা নিজেদের খোলনলচে বদলে ফেলেছে। আজকের অনলাইন কেনাকাটার যুগে ডাকঘরের গুরুত্ব কিন্তু অপরিসীম। নামীদামি ই-কমার্স কোম্পানির পার্সেল প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম বড় ভরসা আজও সেই পোস্ট অফিস।

আরও পড়ুন
ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে প্রবাসী ভারতীয়দের রমরমা
ব্রিকসের হাত ধরে বিশ্ব বাণিজ্যে বাড়ছে নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির হাত ধরে পর্যটনের নতুন দিগন্ত

ভারত সহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে পোস্ট অফিস সেভিংস ব্যাঙ্ক বা গ্রামীণ ডাক জীবন বিমা পরিষেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় গড়ে তোলার একটা বিরাট জায়গা জুড়ে রয়েছে। তাছাড়া আধার কার্ড, পাসপোর্ট, ভোটার কার্ড বা ব্যাঙ্কের এটিএম কার্ড আজও সেই চিরচেনা ডাক পিওনের হাত ধরেই আমাদের বাড়িতে আসে। বর্তমান ডাক ব্যবস্থা এখন চিঠির আবেগের বদলে দৈনন্দিন পরিষেবার এক নির্ভরযোগ্য জায়গা হয়ে উঠেছে।

আজও যেখানে স্বমহিমায় বেঁচে আছে চিঠি

ভাবলে অবাক হতে হয় এই তুমুল ডিজিটাল যুগেও বিশ্বের বেশ কিছু দেশে এবং সমাজে চিঠির চল দিব্যি টিকে আছে। এর পেছনের গল্পগুলো কিন্তু বেশ চমকপ্রদ। প্রযুক্তিগত দিক থেকে জাপান বিশ্বের প্রথম সারিতে থাকা দেশ। কিন্তু নতুন বছরে হাতে লেখা পোস্টকার্ড বা 'নেঙ্গাজো' পাঠানোর ঐতিহ্য সেখানে আজও অমলিন। বছরের শুরুতে কোটি কোটি পোস্টকার্ড বিলি করে জাপানের ডাকবিভাগ। বন্ধু বা আত্মীয়দের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জানাতে তারা আজও কাগজের চিঠিতেই ভরসা রাখে।

জার্মানি বা সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে আবার ছবিটা একটু অন্যরকম। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি যোগাযোগের মূল মাধ্যম আজও চিঠি। সাইবার হ্যাকিং বা ডেটা চুরির ভয়ে তারা সংবেদনশীল তথ্যের ক্ষেত্রে ইমেলের বদলে সিল করা কাগজের খামকেই বেশি নিরাপদ মনে করে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, বর্তমান প্রজন্মের একটা বড় অংশের মধ্যে চিঠি লেখার চল নতুন করে শুরু হয়েছে। সারাদিন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক ধরনের ডিজিটাল ক্লান্তি তৈরি হয়। এর থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই 'পোস্টক্রসিং' নামের একটি আন্তর্জাতিক প্রজেক্টে যোগ দিচ্ছেন। এখানে বিশ্বের নানা প্রান্তের অচেনা মানুষেরা নিজেদের মধ্যে পোস্টকার্ড বিনিময় করেন। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা পেন প্যাল বা পত্রমিতালির মাধ্যমে চিঠির এই ভিন্টেজ শিল্পকে নতুন করে বাঁচিয়ে তুলছেন।

আমাদের দেশের কথাই ধরা যাক। হিমাচল প্রদেশের স্পিতি ভ্যালির হিকিম গ্রামে রয়েছে বিশ্বের উচ্চতম পোস্ট অফিস। প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই পোস্ট অফিসই স্থানীয় মানুষদের বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। বরফে ঢাকা পাহাড়ের বুক চিরে রানাররা আজও সেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিঠি আর মানিঅর্ডার পৌঁছে দেন। অনেক পর্যটক শুধু সেখান থেকে প্রিয়জনকে একটা চিঠি পাঠাবেন বলে হিকিমে ছুটে যান।

চিঠি আজ আর নিছক কোনও যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ডিজিটাল দুনিয়ায় আমরা হয়ত মুহূর্তের মধ্যে হাজার মাইল দূরের মানুষের সাথে ভিডিও কলে কথা বলতে পারি। কিন্তু একটা পুরনো বাক্স খুললে হলদে হয়ে যাওয়া চিঠির পাতা যে স্মৃতির সুবাস ফিরিয়ে আনে তা কি কোনও স্ক্রিনে পাওয়া সম্ভব?

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য