

অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম থেকে মানসিক ক্লান্তি বাড়ে। ছবি - Google
সারাদিন কম্পিউটার ও মোবাইলের সামনে কাজ করলে চোখের ক্লান্তির পাশাপাশি মানসিক চাপও বাড়তে পারে। একটানা স্ক্রিনে না থেকে নিয়মিত ছোট বিরতি, ২০-২০-২০ নিয়ম, হাঁটাচলা, মিটিংয়ের মাঝে ফাঁক এবং কাজের বাইরে নির্দিষ্ট ডিজিটাল বিরতি জরুরি। দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা বা মনোযোগের ঘাটতি থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সকালটা শুরু হয় ল্যাপটপ খুলে। তারপর একের পর এক ই-মেল, মিটিং, মেসেজ, রিপোর্ট, ভিডিও কল। দুপুরের খাবারটাও কখনও কখনও স্ক্রিনের সামনেই। অফিসের কাজ শেষ হওয়ার পরেও মোবাইলের পর্দা থেকে রেহাই নেই। খবর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যক্তিগত মেসেজ-দিনের শেষে মনে হয়, চোখ ক্লান্ত, মাথা ভার, অথচ কাজ যেন শেষই হচ্ছে না।
ডিজিটাল নির্ভরতার এই জীবনযাত্রায় মানসিক ক্লান্তি এখন বহু পেশাদারের নিত্যসঙ্গী। দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার সঙ্গে শারীরিক অস্বস্তির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার সম্পর্কও নিয়ে গবেষণা হয়েছে। সাম্প্রতিক একটি মেটা-অ্যানালিসিসে কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় বসে থাকার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে। তবে গবেষকেরা এটিকে সরাসরি কারণ-ফল হিসেবে দেখানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার কথাও জানিয়েছেন।
তাহলে উপায়? সমাধান কিন্তু সারাদিন কাজ ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং কাজের ধরন এবং কাজের মাঝের বিরতির অভ্যাসটুকু বদলানো।
একটানা কয়েক ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকার বদলে কাজের মধ্যে ছোট বিরতি রাখুন। প্রতি 20 মিনিট অন্তর অন্তত কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ স্ক্রিন থেকে সরিয়ে দূরের কোনও বস্তুর দিকে তাকানোর অভ্যাস চোখের ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। NIOSH-ও নিয়মিত স্ক্রিন-বিরতি এবং 20-20-20 পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছে।
শুধু চোখের বিশ্রাম নয়। সম্ভব হলে ঘণ্টায় অন্তত এক বার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। একটু হাঁটুন, জল খান, শরীরটা টানটান করে নিন। অফিসে কম্পিউটার ব্যবহারের সময় বিরতির কথা মনে করিয়ে দেওয়ার সফটওয়্যার নিয়েও গবেষণা হয়েছে। একটি সাম্প্রতিক মেটা-অ্যানালিসিসে দেখা গিয়েছে, এমন বিরতির রিমাইন্ডার কর্মীদের বসে থাকার সময় কিছুটা কমাতে এবং দৈনিক হাঁটার পরিমাণ বাড়াতে পারে।
অনলাইন মিটিং শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর একটি ভিডিও কল, এই অভ্যাস মানসিক ক্লান্তি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে নিজের ছবি স্ক্রিনে দেখা, একসঙ্গে অন্য কাজ করা, নোটিফিকেশন সামলানো এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার চাপ তৈরি করে তথাকথিত ‘Zoom fatigue’।
তাই সম্ভব হলে পরপর মিটিং না রেখে মাঝখানে কয়েক মিনিটের বিরতি রাখুন। সেই সময়ে আবার ফোনের স্ক্রিনে চোখ না রেখে উঠে দাঁড়ানো বা একটু হাঁটা বেশি উপকারী। WHO-র কর্মক্ষেত্রের নির্দেশিকাতেও ভার্চুয়াল মিটিংয়ের মাঝে বিরতি রেখে স্ক্রিন থেকে দূরে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ই-মেল লিখতে লিখতে মেসেজের উত্তর, তার মধ্যেই ফোনের নোটিফিকেশন, আবার মিটিং, আধুনিক অফিসে ‘মাল্টিটাস্কিং’ যেন দক্ষতার প্রতীক। কিন্তু বাস্তবে এক কাজ থেকে অন্য কাজে বার বার মন সরানো মানসিক ক্লান্তি বাড়াতে পারে।
তাই গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন। একসঙ্গে একটি কাজ শেষ করার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে লেখা, হিসাব, গবেষণা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মনোযোগ-নির্ভর কাজের সময় ফোনটি কিছুটা দূরে রাখলে মস্তিষ্কের উপর চাপ কমতে পারে।
দীর্ঘ সময় বসে থাকা কমানোর জন্য শুধু জিমে এক ঘণ্টা সময় দিলেই সারাদিনের নিষ্ক্রিয়তার প্রভাব পুরোপুরি মুছে যায়, এমন ধারণা ঠিক নয়। অফিসের মধ্যেই বসে থাকার সময় ভাঙা গুরুত্বপূর্ণ।
একটি systematic review ও meta-analysis-এ বিভিন্ন ধরনের কর্মক্ষেত্রের হস্তক্ষেপ মিলিয়ে দেখা যায়, অফিসে বসে থাকার সময় গড়ে প্রায় 38 মিনিট পর্যন্ত কমানো সম্ভব হয়েছিল। তবে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রতিটি পদ্ধতির ফল এক রকম নয় অর্থাৎ ‘বিরতি নিলেই মানসিক চাপ চলে যাবে’, এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক হবে না।
স্ক্রিন-নির্ভর পেশার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, অফিসের সময় শেষ হলেও কাজের পর্দা বন্ধ হয় না। তাই দিনের শেষে একটি নির্দিষ্ট ‘ডিজিটাল কাট-অফ’ তৈরি করুন। জরুরি কাজ না থাকলে অফিসের ই-মেল বা কাজের মেসেজ নির্দিষ্ট সময়ের পরে না দেখার অভ্যাস করুন। বাড়ি ফিরে কিছুটা সময় ফোন ও ল্যাপটপ থেকে দূরে থাকুন। সেই সময় হাঁটা, বই পড়া, গান শোনা, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা কিংবা নিজের পছন্দের কোনও কাজে মন দেওয়া যেতে পারে।
হাঁটা, যোগব্যায়াম, অ্যারোবিক বা strength training, যে ধরনের শারীরিক কাজ আপনার পক্ষে নিয়মিত করা সম্ভব, সেটিই বেছে নেওয়া ভালো। WHO কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কাজের সক্ষমতা বাড়াতে leisure-time physical activity-এর সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছে। মানসিক চাপ সামলানোর দক্ষতা তৈরিতে mindfulness বা cognitive behavioural approaches-ও বিবেচনা করা যেতে পারে।
অর্থাৎ অফিস থেকে বেরিয়ে জিমে যাওয়ার সামর্থ্য না থাকলেও শুরুটা হতে পারে সহজ ভাবে, কিছুটা হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার, ডেস্ক ছেড়ে দাঁড়ানো কিংবা কয়েক মিনিট stretching দিয়ে।
প্রযুক্তি ছাড়া আধুনিক পেশাজীবনের কথা ভাবাই কঠিন। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত স্ক্রিন পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত, স্ক্রিন যেন কাজের হাতিয়ার থাকে, কাজ যেন স্ক্রিনের বন্দি না হয়ে যায়।
প্রতি কিছুক্ষণ অন্তর চোখকে বিশ্রাম দেওয়া, নিয়মিত চেয়ার ছেড়ে ওঠা, মিটিংয়ের মাঝে বিরতি রাখা, একসঙ্গে এক কাজ করা এবং কাজের শেষে নিজেকে সত্যিই কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার অভ্যাস, ছোট পরিবর্তন হলেও দীর্ঘ দিনে তার গুরুত্ব অনেক।
আর যদি দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, মন খারাপ, ঘুমের সমস্যা, কাজে মনোযোগের বড় সমস্যা বা দৈনন্দিন কাজ সামলাতে অসুবিধা চলতে থাকে, শুধু ‘ব্রেক’ নেওয়ার উপর নির্ভর না করে মানসিক স্বাস্থ্য-পেশাদারের সাহায্য নেওয়াই যুক্তিযুক্ত। WHO-ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ ও emotional distress মোকাবিলায় প্রমাণভিত্তিক psychosocial support-এর গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
দিনের শেষে তাই প্রশ্নটা শুধু “কত ঘণ্টা স্ক্রিন দেখলাম?” নয়। বরং আরও জরুরি প্রশ্ন, "স্ক্রিনের মাঝে নিজেকে কতটা সময় দিলাম?"
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
