২৭শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
পুজোর ‘হ্যাংওভার’ কাটছে না? কাজে ফেরার ৩ টোটকা

পুজোর পর স্লিপ সাইকেল ফেরানোর ৩ দিনের ছক! ছবি:AI

পুজোর ‘হ্যাংওভার’ কাটছে না? কাজে ফেরার ৩ টোটকা

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

উৎসবের হ্যাংওভার বনাম বিদ্রোহের শরীর: পুজোর পর ৩ দিনে কীভাবে রিবুট করবেন বায়োলজিক্যাল ক্লক?

পুজোর পর রাত জাগার অভ্যাসে ঘুমের বারোটা বেজেছে? স্রেফ ৩ দিনে কীভাবে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম ঠিক করবেন? রইল বিজ্ঞানসম্মত বাস্তব রুটিন।

মূল বিষয়

পুজো শেষ। বিজয়ার মিষ্টির মিষ্টিভাব কাটতে না কাটতেই ক্যালেন্ডার মনে করিয়ে দিচ্ছে—আবার সেই ভোরবেলার অ্যালার্ম, বাস কিংবা ভিড় ট্রেনের লড়াই আর ল্যাপটপ স্ক্রিনের সামনে টানা আট ঘণ্টার ডিউটি। কিন্তু সমস্যা হল, ক্যালেন্ডার বদলে গেলেও শরীরটা এখনও আটকে আছে মণ্ডপের রাতজাগা আড্ডায় কিংবা ভোর চারটেয় রেস্তরাঁর লাইনে।

ছুটির দিনগুলোতে রাত তিনটেয় ঘুমিয়ে পরদিন দুপুর বারোটায় চোখ খোলার যে স্বাধীনতা শরীর পেয়েছিল, অফিস খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তার ওপর নেমে এসেছে নির্মম খাঁড়া। ফল? সকাল আটটায় চোখ খুলতেই পারছে না মস্তিষ্ক, অফিসে পৌঁছনোর আগেই তীব্র ব্রেন-ফগ আর অকারণ খিটখিটে মেজাজ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘সোশ্যাল জেট ল্যাগ’ (Social Jetlag)।

দিনকে রাত আর রাতকে দিন করার এই উৎসব-হ্যাংওভার কাটাতে পুরো এক মাস সময় নেওয়ার বিলাসিতা আজকের কর্পোরেট জীবনে নেই। শরীরকে স্রেফ তিনটি দিনে চাবুক না মেরে, নিখুঁত বায়োলজিক্যাল ট্রিক্সে কীভাবে আগের ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনবেন? দেখে নেওয়া যাক তার স্টেপ-বাই-স্টেপ রোডম্যাপ।

১. ‘জোর করে ঘুম’ নয়, ভোরের আলোয় সঙ্কেত দিন

ঘুম ঠিক করার সবচেয়ে বড় ভুল হলো রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে ছটফট করা। মস্তিষ্ক যখন রাত তিনটে পর্যন্ত জেগে থাকায় অভ্যস্ত, তখন রাত দশটায় বিছানায় শুলে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে দু’ঘণ্টা ফেসবুক স্ক্রোল করা ছাড়া আর কিছুই হবে না।

  • ভোরবেলার রোদ (Morning Sunlight Protocol): প্রথম দিন ঘুম থেকে ওঠার সময়টাই হবে আপনার মূল অস্ত্র। রাতে যত দেরিতেই ঘুমিয়ে থাকুন না কেন, সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে জোর করে বিছানা ছাড়ুন।
  • রেটিনায় আলোর ধাক্কা: চোখ খুলেই বারান্দায় বা ছাদে গিয়ে দাঁড়ান। কোনো সানগ্লাস ছাড়া অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট সরাসরি ভোরের সূর্যালোক চোখের রেটিনায় পড়তে দিন। এটি আপনার মস্তিষ্কের ‘সুপ্রাকায়াসমেটিক নিউক্লিয়াস’ (SCN)-কে জানান দেবে—‘দিন শুরু হয়েছে’। ঠিক এখান থেকেই মেলাটোনিন তৈরির উল্টো কাউন্টডাউন শুরু হয়ে যাবে।
  • দুপুরের ঘুম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: শরীর হয়তো দুপুরের পর চোখ বন্ধ করতে চাইবে। কিন্তু ভুল করেও এক মিনিটের জন্য বিছানায় এলিয়ে পড়া যাবে না। ঘুম এলে চোখেমুখে ঠান্ডা জল দিন, একটু হেঁটে আসুন। এই ক্লান্তিটুকু জমিয়ে রাখাই প্রথম দিনের টাস্ক।

২. ক্যাফেইন কারফিউ ও খাওয়ার ঘড়ি রিবুট

আরও পড়ুন
চা ছেড়ে ‘স্পেশাল্টি কফি’তে মজে কলকাতার নতুন জেনারেশন?
দরজায় খাবার, তবু মানুষ কেন ছুটছে রেস্তোরাঁয়?
টানা বসে কাজ করেন? কোন রোগ বাসা বাঁধছে শরীরে!

আমাদের শরীরের বায়োলজিক্যাল ঘড়ি শুধু আলোর ওপর নির্ভর করে না; আমাদের অন্ত্র এবং লিভারের নিজস্ব ‘ফুড ক্লক’ (Peripheral Clocks) রয়েছে। পুজোর সময়ে মাঝরাতে বিরিয়ানি বা রোল খাওয়ার অভ্যাস অন্ত্রকে ভুল সঙ্কেত পাঠায়।

  • দুপুর ২টোর পর ক্যাফেইনে পূর্ণ দাঁড়ি: ঘুম কাটাতে অনেকেই বিকেল পাঁচটায় বা সন্ধে সাতটায় কড়া এক কাপ কফি খেয়ে বসেন। মনে রাখবেন, ক্যাফেইনের হাফ-লাইফ প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। অর্থাৎ সন্ধে ছ’টায় খাওয়া কফির অর্ধেক ক্যাফেইন রাত বারোটাতেও আপনার মস্তিষ্কের অ্যাডিনোসিন রিসেপ্টর ব্লক করে রাখবে। তাই দুপুর ২টোর পর কোনো চা, কফি বা এনার্জি ড্রিঙ্ক ছোঁবেন না।
  • আর্লি ডিনার স্ট্র্যাটেজি: রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে রাতের খাওয়া সেরে ফেলুন। অতিরিক্ত মশলাদার বা ভারী কার্বোহাইড্রেট (যেমন লুচি বা বিরিয়ানি) নয়; পাতে রাখুন হালকা প্রোটিন ও সবজি। ভরপেট খেয়ে শুলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, যা গভীর ঘুমের সবচেয়ে বড় শত্রু।
  • নাইট রুটিনে ‘রেড লাইট’ মোড: রাত ন’টার পর ঘরের সিলিংয়ের চড়া সাদা টিউবলাইট বা এলইডি নিভিয়ে দিন। হালকা হলুদ শেডের জিরো ওয়াটের আলো বা বেডসাইড ল্যাম্প জ্বালান। চোখ যেন অন্ধকারের প্রস্তুতি নিতে পারে।

৩. ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট ও কোল্ড শাওয়ার থেরাপি

সোমবারের সকালে একদম সতেজ হয়ে নামার জন্য তৃতীয় দিনটা হবে নিখুঁত বায়োলজিক্যাল টিউনিংয়ের দিন।

  • শোওয়ার ৬০ মিনিট আগে নো-স্ক্রিন জোন: স্মার্টফোনের নীল আলো (Blue Light) মেলাটোনিন হরমোনের প্রাকৃতিক ক্ষরণ এক লহমায় বন্ধ করে দেয়। ভাবছেন ‘একটু রিলস দেখে ঘুমিয়ে পড়ব’, আর তাতেই মস্তিষ্কের নিউরনগুলো জেগে উঠছে। শোওয়ার এক ঘণ্টা আগে ফোনকে সাইলেন্ট করে অন্য ঘরে বা বিছানা থেকে অন্তত দশ ফুট দূরে রেখে দিন।
  • গরম জলে স্নান (The Warm Bath Trick): শোওয়ার আধ ঘণ্টা আগে হালকা গরম বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার জলে গা ধুয়ে নিন। অনেকেই ভাবেন গরম জলে স্নান করলে শরীর গরম হয়, কিন্তু বিজ্ঞানের নিয়ম হলো—স্নানের ঠিক পরেই ত্বকের রক্তজালিকাগুলো প্রসারিত হয়ে শরীরের কোর টেম্পারেচার (Core Body Temperature) দ্রুত নামিয়ে দেয়। আর শরীরের তাপমাত্রা নামলেই মস্তিষ্কে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গভীর ঘুমের সংকেত যায়।
  • বই ও মৃদু শ্বাস-প্রশ্বাস: বিছানায় গিয়ে আলো নিভিয়ে দিন। কোনো জটিল উপন্যাস বা কাজের ফাইল নয়, সাধারণ কোনো বইয়ের পাতা উল্টোন কিংবা ‘৪-৭-৮ ব্রিদিং’ (৪ সেকেন্ড শ্বাস নেওয়া, ৭ সেকেন্ড আটকে রাখা, ৮ সেকেন্ডে ছাড়া) করুন। শরীর নিস্তেজ হতে শুরু করলেই ঘুমিয়ে পড়ুন।

৩ দিনের বায়োলজিক্যাল রুটিন এক নজরে

দিনমূল লক্ষ্যকী করবেন?কী একেবারেই করবেন না?
ডে ১মস্তিষ্ককে দিন চেনাসকাল ৭টায় উঠে ১৫ মিনিট সরাসরি রোদ লাগানোদুপুরে ভাতঘুমে চোখ বোজা
ডে ২পেটের ঘড়ি ও ক্যাফেইন নিয়ন্ত্রণরাত সাড়ে আটটায় হালকা ডিনার, দিনের শুরুতে সচল থাকাদুপুর ২টোর পর চা বা কফি খাওয়া
ডে ৩মেলাটোনিনের পূর্ণ ক্ষরণশোওয়ার ৬০ মিনিট আগে ফোন বন্ধ, হালকা গরম জলে স্নানবিছানায় ফোন নিয়ে নোটিফিকেশন চেক করা

শরীর কোনো ইলেকট্রনিক সুইচ নয় যে পুজোর হুল্লোড় শেষ হতেই অফ করে আবার ফর্মাল মোডে অন করা যাবে। বিবর্তনের নিয়মে তৈরি এই রক্তমাংসের বায়োলজিক্যাল ঘড়িটাকে সচল করতে দরকার একটু বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া। ওষুধ বা ঘুমের ট্যাবলেটের দিকে হাত না বাড়িয়ে এই তিনটি দিন শরীরকে একটু নিয়ম মেনে চালান—সোমবারের সকালে অ্যালার্ম ঘড়ি বাজার আগেই শরীর আপনাকে তাজা হয়ে ঘুম থেকে তুলে দেবে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়

সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য