সোশ্যাল মিডিয়ার তুলনা ছেড়ে আসল আনন্দ উপভোগের মন্ত্র! ছবি:AI
সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘পারফেক্ট’ হতে চান? এটা পড়ুন!
সোশ্যাল মিডিয়ার ‘পারফেক্ট পুজো’ কি মিথ্যে? তুলনার ফাঁদ কাটানোর উপায়
সোশ্যাল মিডিয়ায় সবার পুজো পারফেক্ট দেখে হীনম্মন্যতায় ভুগছেন? উৎসবের সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্রেস, ফোমো (FOMO) ও কৃত্রিম তুলনা থেকে মুক্তির বাস্তব মনস্তাত্ত্বিক উপায়।
অষ্টমীর বিকেলে বা নবমীর রাতে নিজের ঘরে বসে একবার ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে স্ক্রোল করলেন। চোখের পলকে ভেসে উঠল একের পর এক ছবি—নিখুঁত আলোয় সাজানো শাড়ি, রেস্তোরাঁর দামি পানীয়, রোশনাইয়ে মোড়া মণ্ডপ আর পার্টনারের সাথে খিলখিলে হাসির রিলস। ক্যাপশনে লেখা ‘পুজো ডায়েরিজ’ কিংবা ‘পিওর ব্লিস’। আর ঠিক তখনই আপনার চোখ গেল নিজের দিকে—হয়তো সারাদিনের ক্লান্তি, ট্রাফিকের বিরক্তি, কিংবা বন্ধুদের সাথে প্ল্যান ভেস্তে যাওয়ায় আপনি বাড়িতে স্রেফ নাইটস্যুট পরে ফ্যানের তলায় বসে আছেন। সঙ্গী নেই, কিংবা অনেক দূরত্বে প্রিয়জন। হতে পারে এ বছর আপনার ঘরে ফেরা হয়নি। সবাই কত আনন্দ করছে, ভাল ভাল ছবি দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়! স্ক্রোল করতে করতে আপনার ভেতর থেকে উঁকি দিল বিষাদ—"সবার পুজো এত দারুণ কাটছে, শুধু আমারটাই এমন পানসে?"
মনস্তত্ত্বের ভাষায় একেই বলা হয় কমপ্যারিজন ট্র্যাপ (Comparison Trap) বা সোশ্যাল মিডিয়া-প্ররোচিত ফোমো (FOMO - Fear of Missing Out)। কিন্তু এই মেকি গ্ল্যামারের পেছনে কতটা সত্যি থাকে? কীভাবে বেরোবেন এই বিষাক্ত তুলনা থেকে? জানেন এটা কত বড় ফাঁদ? বুঝে নিই চলুন।
১. ‘হাইলাইট রিল’ বনাম আসল জীবনের বাস্তবতা: ফিল্টারের পেছনের সত্য
সোশ্যাল মিডিয়া কোনো মানুষের জীবনের প্রামাণ্য দলিল নয়; ওটা হলো ব্যক্তিগত জনসংযোগের (PR) একটা নিখুঁত মঞ্চ।
- ফ্রেমের পেছনের যুদ্ধ: যে যুগলকে মণ্ডপের রাজকীয় আলোর নিচে দাঁড়িয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে হাসিমুখে পোজ দিতে দেখছেন, সেই ছবিটি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করার ঠিক পাঁচ মিনিট আগের দৃশ্যটা কেউ দেখায় না। ট্যাক্সি না পাওয়া নিয়ে চরম খিটিমিটি, গরমে গায়ের মেকআপ গলে যাওয়া নিয়ে বিরক্তি, কিংবা ছবিটা মনের মতো না ওঠায় পরস্পরের প্রতি বিষোদ্গার—এগুলো ফ্রেমের বাইরেই থেকে যায়।
- দশটা ব্যর্থতার পর একটা ‘পারফেক্ট’ টেক: একটা নিখুঁত ছবির পেছনে থাকে পঞ্চাশটা বাতিল হওয়া কোণ, রোদের আলোয় চোখ কুঁচকে যাওয়া শট আর হাজারটা ক্যামেরা কারেকশন। তার ওপর রয়েছে কালার গ্রেডিং, স্কিন স্মুথনিং আর কনট্রাস্টের খেলা। মানুষ তার জীবনের সেরা দুই সেকেন্ডের একটা অংশকে এডিট করে পোস্ট করছে, আর আপনি আপনার চব্বিশ ঘণ্টার অগোছালো, রক্তমাংসের রিয়েলিটির সাথে তার তুলনা করে নিজের ওপর রাগ করছেন।
- আনন্দ প্রকাশের বাধ্যবাধকতা: আজকের সোশ্যাল মিডিয়ায় উৎসব মানে নিজেকে সুখী প্রমাণ করার এক মরিয়া প্রতিযোগিতা। আনন্দ পাওয়াটা সেখানে বড় কথা নয়, আনন্দটা কতজন মানুষকে দেখানো গেল—সেটাই যেন মুখ্য। ফলে ভেতরের ক্লান্তি বা নিঃসঙ্গতাকে চাপাচাপি করে হলেও একটা চওড়া হাসির ছবি পোস্ট করতেই হবে—এই সামাজিক চাপেই অর্ধেক মানুষ হাঁপিয়ে উঠছে।
২. পুজো উদযাপনের কোনও ‘স্ট্যান্ডার্ড সিলেবাস’ নেই
বাজার অর্থনীতি আর সোশ্যাল মিডিয়া মিলেমিশে আমাদের মগজে একটা কৃত্রিম সংজ্ঞা ঢুকিয়ে দিয়েছে যে—পুজো মানেই পাঁচ দিন পাঁচটা নতুন ব্র্যান্ডের পোশাক, দশটা নামী রেস্তোরাঁয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সেলফি, আর ভোর চারটে পর্যন্ত শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ মণ্ডপ চষে ফেলা। এর বাইরে বেরোলেই যেন পুজোটা বৃথা।
- অন্তর্মুখী স্বস্তির কোনো অপরাধবোধ নেই: কে বলেছে পুজো মানেই ভিড়ের ধাক্কা খাওয়া? কারও কাছে পুজো মানে হয়তো বন্ধুদের চ্যাঁচামেচি, কিন্তু অন্য কারও কাছে পুজো মানে ছুটির দিনগুলোতে টানা বারো ঘণ্টা কোনো অ্যালার্ম ছাড়া ঘুমোনো। কেউ যদি ঘরে বসে মা-বাবার সাথে পুরোনো দিনের গল্প করতে করতে গরম লুচি আর আলুর দম খেয়ে তৃপ্তি পায়, তবে সেটাই তার জন্য শ্রেষ্ঠ পুজো।
- ভিড় না দেখার স্বাধীনতা: আপনি যদি কলকাতার নোনা ধরা ট্রাফিক আর ঘেমেনেয়ে একশা হওয়া জনসমুদ্র এড়িয়ে ঘরে বসে এক কাপ চা নিয়ে নিজের পছন্দের কোনো ওয়েব সিরিজ দেখতে ভালোবাসেন, তবে আপনি কোনো অপরাধ করছেন না। নিজের মনের আরামকে বিসর্জন দিয়ে কেবল সোশ্যাল মিডিয়ায় চেক-ইন দেওয়ার জন্য বাইরে বেরোনোর মতো বোকা কাজ আর দ্বিতীয়টি নেই।
৩. মস্তিষ্ক যখন ডোপামিনের ফাঁদে: অ্যালগরিদমের চালবাজি
সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলো কোনো সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান নয়; তাদের মূল ব্যবসা মানুষের মনোযোগ চুরি করা।
- স্ক্রোলিং এবং শূন্যতা: আপনি যখন অলসভাবে স্ক্রোল করতে থাকেন, আপনার অবচেতন মন অবিরত তথ্যের প্রসেসিং করতে থাকে। মস্তিষ্ক যখন একের পর এক রোশনাই, পার্টি আর হুল্লোড়ের ছবি দেখে, তখন সে অবচেতনভাবেই ধরে নেয় যে চারপাশের পরিবেশ অত্যন্ত উদ্দীপনাময়, অথচ সে নিজে সেখানে অনুপস্থিত। এর ফলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা বাড়তে থাকে।
- লাইক ও ভ্যালিডেশনের নেশা: যারা ছবি পোস্ট করছেন, তাঁরাও কিন্তু শান্তিতে নেই। ছবিটা ছাড়ার পর প্রতি দশ মিনিট অন্তর তাঁরা চেক করছেন ক’টা লাইক পড়ল, কে কমেন্ট করল, কার চেয়ে কার ছবির রিঅ্যাকশন বেশি। এই ভার্চুয়াল অনুমোদনের (External Validation) কাঙালপনা উৎসবের আত্মিক আনন্দটাকেই নিংড়ে শেষ করে দেয়।
৪. তুলনার বিষচক্র ভাঙার ৪ দাওয়াই
যদি দেখেন উৎসবের দিনগুলোতে ফোনের নীল স্ক্রিন আপনার মানসিক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে, তবে রাশ টানার দায়িত্বটা আপনার নিজের হাতেই তুলে নিতে হবে:
- ডিজিটাল কার্ফু বা অ্যাপ আনইনস্টল: উৎসবের কয়েকটা দিন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলো ফোন থেকে সাময়িকভাবে মুছে দিন। যদি সেটা খুব কঠিন মনে হয়, তবে অন্তত নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিন এবং দিনে মাত্র আধ ঘণ্টার জন্য একটা নির্দিষ্ট উইন্ডো ঠিক করুন। বারবার অ্যাপ খুলে অন্যের আপডেট নেওয়ার অভ্যাস বন্ধ করলেই অর্ধেক মানসিক চাপ উধাও হয়ে যাবে।
- ‘প্রেজেন্স’ বনাম ‘প্রেজেন্টেশন’: কোনো জায়গায় গেলে সেটাকে ক্যামেরাবন্দি করার চেয়ে আগে নিজের পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করুন। ঢাকের আওয়াজের কম্পন, কাশফুলের গন্ধ, বন্ধুদের সাথে আড্ডার সময় চায়ের ভাঁড়ের তাপ—এগুলো চোখের লেন্স দিয়ে মনের ভেতর ঢুকতে দিন। যতক্ষণ আপনি ছবি তোলার চিন্তায় থাকবেন, ততক্ষণ আপনি মুহূর্তটার ভেতরে বাঁচতে পারবেন না।
- বাস্তব সংযোগ গড়ে তুলুন: যাঁদের সাথে ইনস্টাগ্রামে কৃত্রিম রিলস শেয়ার করছেন, তাঁদের কাউকে একটা সাধারণ ফোন কল করুন। চেনা কোনো বন্ধুর সাথে ফোনে আধ ঘণ্টা প্রাণখোলা কথা বললে যে মানসিক তৃপ্তি মিলবে, তা এক হাজারটা লাইকের চেয়েও বেশি আরামদায়ক। ভার্চুয়াল সম্পর্কের অলীক জগত ছেড়ে মাটির সম্পর্কের দিকে ফিরুন।
- কৃতজ্ঞতাবোধের চর্চা (Gratitude Shift): তুলনা সবসময় আমাদের যা নেই তার দিকে চোখ টানে। এর উল্টো অভ্যাস গড়ে তুলুন। ভাবুন, এই পুজোয় আপনার শরীরটা সুস্থ আছে, একটা নিরাপদ ঘর আছে, খাবার আছে এবং নিজের মতো করে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ আছে। দুনিয়ায় লাখ লাখ মানুষ আছেন যাঁদের কাছে এই সাধারণ বিষয়গুলোও চরম বিলাসিতা। নিজের যা আছে তার প্রতি একটু কৃতজ্ঞ হলে অন্যের অতিরিক্ত প্রদর্শন আর মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
উৎসব আসে জীবনকে একটু হালকা করতে, স্নায়ুগুলোকে একটু বিশ্রাম দিতে; অন্যের জীবনের সাথে নিজের খামতিগুলো মিলিয়ে দেখে মন খারাপ করার জন্য নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিনে সাজিয়ে রাখা সেই অলীক রূপকথার পেছনে না ছুটে, নিজের সাধারণ, চেনা জীবনটার দিকে তাকান। সেই জীবনের ভেতর যে নিজস্ব শান্তিটুকু আছে, তার কোনো ফিল্টারের প্রয়োজন হয় না। উৎসবের আলো মণ্ডপের বাইরেও থাকে—যদি আপনি স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নিজের ভেতরটার আলো জ্বালাতে পারেন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।