

চিপ নিয়ে মহাযুদ্ধ। ছবি - AI
সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ সাপ্লাই চেইনে তাইওয়ানের ভূমিকা এতটাই একচ্ছত্র যে, তাইওয়ান প্রণালীতে যেকোনো অস্থিরতা বা ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত মুহূর্তের মধ্যে গোটা বিশ্বের প্রযুক্তি ও অর্থনীতিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
আজকের বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। কিন্তু এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চোখধাঁধানো অগ্রগতির পেছনে আসল চালিকাশক্তি হলো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সেমিকন্ডাক্টর চিপ। আর এই চিপের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় নিতে নিঃশব্দে এক মহাযুদ্ধে নেমেছে বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তিগুলো। প্রশ্ন উঠেছে, ট্রিলিয়ন ডলারের এই চিপ সাম্রাজ্যের লাগাম শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে—আমেরিকা নাকি এশিয়ার? প্রযুক্তি ও ভূ-রাজনীতির এই টানাপোড়েন এখন রুদ্ধশ্বাস এক অধ্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
সহজ কথায় বলতে গেলে, আন্তর্জাতিক চিপের দুনিয়ায় আমেরিকা হল 'স্থপতি' আর এশিয়া হলো মূল 'কারিগর'। এআই বিপ্লবকে সচল রাখা শক্তিশালী জিপিইউ (GPU) চিপগুলোর নকশা তৈরি করে এনভিডিয়া, এএমডি কিংবা ইন্টেলের মতো শীর্ষ মার্কিন টেক জায়ান্টরা। কিন্তু সেই জটিল নকশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার কারখানা বা 'ফ্যাব' এতদিন আমেরিকার মাটিতে ছিল না বললেই চলে।
অত্যাধুনিক ৩ বা ৪-ন্যানোমিটার চিপ তৈরির জন্য গোটা বিশ্বকে কার্যত নির্ভর করতে হয় তাইওয়ানের টিএসএমসি (TSMC)-এর ওপর। পাশাপাশি, এআই প্রসেসরের জন্য অত্যন্ত জরুরি হাই-ব্যান্ডউইথ মেমরি বা এইচবিএম (HBM) চিপ তৈরিতে একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের। ফলে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জন্ম আমেরিকায় হলেও উৎপাদনের জন্য এশিয়ার ওপর নির্ভরতা ছিল এক প্রকার অপরিহার্য।
উৎপাদনের ক্ষেত্রে এশিয়ার ওপর এই অতি-নির্ভরশীলতা ওয়াশিংটনের জন্য দীর্ঘদিনের মাথাব্যথার কারণ। বিশেষ করে তাইওয়ান প্রণালীতে চিনের সামরিক মহড়া ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই ঝুঁকি আরও তীব্র হয়েছে। যেকোনও সংকটে যাতে বিশ্ব চিপ সরবরাহ থমকে না যায়, সেজন্য মার্কিন প্রশাসন কার্যকর করেছে 'চিপস অ্যাক্ট' (CHIPS Act)।
এই আইনের আওতায় বিপুল সরকারি ভর্তুকি দিয়ে টিএসএমসি-কে আমেরিকার মাটিতেই কারখানা গড়তে রাজি করানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই আমেরিকার অ্যারিজোনার মরুভূমিতে টিএসএমসি-এর প্রথম প্ল্যান্টে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ৪-ন্যানোমিটার চিপ তৈরি শুরু হয়ে গেছে, যা অ্যাপল ও এনভিডিয়ার মতো কোম্পানিগুলো ব্যবহার করছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক উন্নত চিপের অন্তত ৩০ শতাংশ নিজেদের মাটিতে উৎপাদনের লক্ষ্য স্থির করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আমেরিকা কেবল নিজেদের মাটিতে উৎপাদন বাড়িয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, চিনের চিপ তৈরির সক্ষমতাকে থামাতে একাধিক রফতানি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল (ASML)-এর মতো অত্যাধুনিক চরম অতিবেগুনি (EUV) লিথোগ্রাফি মেশিন যাতে চিন হাতে না পায়, তার জন্য চলছে কড়া আন্তর্জাতিক নজরদারি।
তবে বেইজিংও হাত গুটিয়ে বসে নেই। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে দেশীয় চিপ শিল্পকে স্বাবলম্বী করে তুলতে তারা ১৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি তহবিল বরাদ্দ করেছে। হুয়াওয়ের মতো সংস্থাগুলো দেশীয় প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বিকল্প পথ খুঁজছে। একই সঙ্গে চিপ তৈরিতে অপরিহার্য খনিজ ও কাঁচামাল—যেমন গ্যালিয়াম, জার্মেনিয়াম, টাংস্টেন ও রেয়ার আর্থ মিনারেলসের রফতানিতে কড়া নিয়ন্ত্রণ জারি করে আমেরিকাকে সমান তালে চাপে রাখছে চিন।
এই ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ে কেউই সহজে জমি ছাড়তে রাজি নয়। স্বল্প মেয়াদে এশিয়ার জটিল উৎপাদন প্রক্রিয়া ও দক্ষ প্রকৌশলীদের বিকল্প তৈরি করা অসম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকা যদি নিজের মাটিতে চিপ উৎপাদন সফলভাবে বজায় রাখতে পারে এবং উন্নত সফটওয়্যার ও ডিজাইনিংয়ে নিজেদের নেতৃত্ব ধরে রাখে, তবে এআই বিপ্লবের সিংহভাগ লভ্যাংশ তাদের ঘরেই উঠবে। গোটা বিশ্ব এখন এক নতুন প্রযুক্তিগত স্নায়ুযুদ্ধের সাক্ষী, যেখানে সিলিকনের একটি ছোট চিপ বদলে দিচ্ছে আগামীর ক্ষমতার ভারসাম্য।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
