

স্মার্ট কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার। ছবি - AI
অনিয়মিত বৃষ্টি ও তাপপ্রবাহের মতো জলবায়ু বিপর্যয় রুখতে ধান ও আলু চাষিরা এখন আইওটি (IoT) সেন্সর, ড্রোন এবং এআই-ভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছেন। এই স্মার্ট পদ্ধতির সাহায্যে সেচে ৩০-৪০% জল বাঁচানো এবং আলুর ধসা রোগ আগে থেকেই ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে। অতিরিক্ত খরচের বাধা কাটাতে ভাড়ায় যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় প্রান্তিক কৃষকদের কাছেও এখন চাষবাস আরও সুরক্ষিত ও টেকসই হয়ে উঠছে।
খামখেয়ালি বর্ষা, হুটহাট তীব্র দাবদাহ আর অসময়ের বৃষ্টি—জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধাক্কায় ধান ও আলুর মতো প্রধান ফসলের ফলন নিয়ে প্রতি বছরই বুক কাঁপে কৃষকদের। তবে প্রকৃতির এই অনিশ্চয়তার মুখে হাত গুটিয়ে বসে নেই চাষিরা। মাঠের ক্ষতি রুখতে তাঁরা এখন হাত বাড়িয়েছেন আধুনিক প্রযুক্তির দিকে। গবেষণাগার বা পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং ড্রোনের নজরদারি এখন কৃষকদের দৈনন্দিন চাষবাসের প্রধান ভরসা হয়ে উঠছে।
ধান চাষ মানেই চিরাচরিত ধারণায় খেতভর্তি জল ধরে রাখা। কিন্তু বৃষ্টির অনিশ্চয়তা আর ভূগর্ভস্থ জলের সংকটে সেই নিয়ম আর খাটছে না। এর সমাধানে কৃষকরা ব্যবহার করছেন 'অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং' (AWD) পদ্ধতি এবং মাটির জন্য স্বল্পমূল্যের আইওটি সেন্সর। এই যন্ত্রের সাহায্যে মাটির আর্দ্রতার সঠিক মাত্রা সর্বক্ষণ ট্র্যাক করা যায়। বিশিষ্ট বিজ্ঞানপত্রিকা 'ডিসকভার প্ল্যান্টস' (স্প্রিঙ্গার নেচার)-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক ড্রিপ সেচ ও এই স্মার্ট পদ্ধতির মেলবন্ধনে ফলন অক্ষুণ্ণ রেখেই জলের অপচয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি মিথেন গ্যাসের নির্গমন কমাতেও বড় ভূমিকা নিচ্ছে।
তাপমাত্রার হঠাৎ ওঠানামা আর বাতাসের আর্দ্রতায় আলুর খেতে ধসা রোগের (লেট ব্লাইট) উপদ্রব চেনা ছবি। রোগ একবার ছড়িয়ে পড়লে চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যায় বিঘার পর বিঘা ফসল। এই বিপদ এড়াতে চাষিরা এবার আকাশপথে ড্রোন নামাচ্ছেন। মাল্টি-স্পেকট্রাল ক্যামেরাযুক্ত ড্রোন এবং কম্পিউটার-ভিশন প্রযুক্তি আলুর পাতার সামান্যতম দাগ বা রং বদলও দ্রুত ধরে ফেলতে পারে। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর (পিআইবি) তথ্য অনুযায়ী, ‘ন্যাশনাল পেস্ট সার্ভিল্যান্স সিস্টেম’ (এনপিএসএস)-এর মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে সময়মতো রোগ ও পোকার সতর্কবার্তা সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে কৃষকদের হাতে। ফলে ছত্রাকজনিত রোগ মড়কের আকার নেওয়ার আগেই খুব সীমিত ও নির্দিষ্ট জায়গায় কীটনাশক স্প্রে করে ফসল রক্ষা করা যাচ্ছে। এতে রাসায়নিক ব্যবহারের খরচ কমছে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
জেলা পর্যায়ের সাধারণ আবহাওয়ার পূর্বাভাসে অনেক সময় স্থানীয় ছোট এলাকার মেঘভাঙা বৃষ্টি বা আকস্মিক ঝড়বৃষ্টির তথ্য ধরা পড়ে না। এর ফলে হঠাৎ বৃষ্টিতে মাঠের বীজতলা বা কাটা ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। এই সমস্যা কাটাতে স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র এবং ফোনে এসএমএস বার্তার উপর ভরসা রাখছেন চাষিরা। সমীক্ষা বলছে, সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লক্ষ কৃষকের কাছে এসএমএস পরামর্শ পাঠানো হচ্ছে। এর সুবাদে প্রায় ৩১ থেকে ৫২ শতাংশ কৃষক বৃষ্টির পূর্বাভাস পেয়ে জমি তৈরির সময় বদল করছেন কিংবা বীজ বোনার দিনক্ষণ পিছিয়ে দিয়ে ফসলের বড়সড় ক্ষতি এড়াতে পারছেন।
মাঠে ডিজিটাল বিপ্লবের সুফল স্পষ্ট হলেও প্রান্তিক চাষিদের জন্য পথটা এখনও সম্পূর্ণ মসৃণ নয়। ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের (এনসিবিআই) গবেষণা জানাচ্ছে, যন্ত্রপাতির আকাশছোঁয়া দাম, ডিজিটাল জ্ঞানের অভাব এবং ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত চাষের জমি প্রযুক্তি প্রসারের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে আশার আলো দেখাচ্ছে কৃষক উৎপাদক সংস্থা (এফপিও) এবং ভাড়াভিত্তিক প্রযুক্তি সেবা। এককালীন মোটা টাকা খরচ না করে ঘণ্টা বা বিঘা প্রতি ভাড়ায় ড্রোন ও স্মার্ট যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ছোট চাষিরাও ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তির আওতায় আসছেন। চরম আবহাওয়ার সঙ্গে যুঝতে ডিজিটাল প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন ভবিষ্যতে কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাতে অন্যতম বড় হাতিয়ার হতে চলেছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
