

উপযুক্ত আইনের অভাবে ভারতে ডিপফেকের দাপট। ছবি - Google
জেনারেটিভ AI ও ডিপফেকের মাধ্যমে মানুষের মুখ, কণ্ঠ ও ব্যক্তিত্বের অপব্যবহার রুখতে ভারতীয় আদালত সংবিধান ও বিদ্যমান আইনের ভিত্তিতে সেলিব্রিটিদের পক্ষে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করছে। তবে পূর্ণাঙ্গ একক আইনের ঘাটতি থাকায়, কেন্দ্র সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইটি নীতিমালায় কঠোর সংশোধনী এনেছে—যেখানে ডিপফেকের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়ার পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মগুলির জন্য ৩ ঘণ্টার মধ্যে ভুয়ো কনটেন্ট অপসারণ ও উৎস শনাক্তকরণ (ট্রেসেবিলিটি) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (GenAI) মানুষের পরিচয়, কণ্ঠস্বর এবং মুখের আদল নকল করার প্রক্রিয়াকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা আগে চিন্তা করাই যেত না। প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ডিপফেক কেবল অনুকরণেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, এমন সব বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও বা বক্তব্য ছড়িয়ে দিচ্ছে—যার সঙ্গে বাস্তবের ব্যক্তির দূরতম সম্পর্কও নেই। ডিজিটালের যুগে মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ছে লাখ লাখ মানুষের কাছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের ‘ব্যক্তিত্বের অধিকার’ (Personality Rights) এবং ব্যক্তিমর্যাদার ওপর। সুনির্দিষ্ট একক আইনের অনুপস্থিতিতে এই সংকট সামাল দিতে একদিকে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে আদালত, অন্যদিকে কেন্দ্র সরকার নিয়ে এসেছে কড়া বিধিনিষেধ।
সাম্প্রতিক সময়ে বলিউডের একাধিক তারকার ব্যক্তিত্বের অধিকার নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘটনা এই উদ্বেগকে সামনে এনেছে:
অরিজিৎ সিং বনাম কোডিবল ভেঞ্চার্স এলএলপি: মুম্বই হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া এআই দিয়ে কোনো শিল্পীর কণ্ঠস্বর, গায়কী কিংবা স্বকীয় ভঙ্গি নকল করা তাঁদের অধিকার হরণের শামিল।
অনিল কাপুর বনাম সিম্পলি লাইফ ইন্ডিয়া: অনুমতিহীন বিকৃত এআই ছবি এবং ভুয়ো ভিডিও তৈরির বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্ট অভিনেতার পক্ষে রায় দিয়ে মর্যাদা ও গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিত করে।
জ্যাকি শ্রফ ও প্রীতি জিন্টা মামলা: জ্যাকি শ্রফের ক্ষেত্রে বিকৃত ভিডিও ও তাঁর নামে চালিত এআই চ্যাটবটের ব্যবহার রোখা হয়েছিল। অন্যদিকে প্রীতি জিন্টার মামলায় স্পষ্ট হয় যে, ইন্টারনেটে ডিপফেক কনটেন্ট বারবার ছড়িয়ে পড়ার কারণে কেবল ক্ষতিপূরণ দিয়ে এই অপূরণীয় ক্ষতি মেটানো সম্ভব নয়।
আদালতগুলি এই ক্ষতি রুখতে একতরফা অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করে কনটেন্ট ছড়ানো আটকেছে ঠিকই, কিন্তু স্থায়ী সুরক্ষার ক্ষেত্রে এখনও একটি ফাঁক থেকে যাচ্ছে।
ভারতে এখনও ‘ব্যক্তিত্বের অধিকার’ সুরক্ষার জন্য কোনো একক, সুসংহত আইন নেই। ফলে আদালতকে নির্ভর করতে হচ্ছে সংবিধানের ১৯(১)(এ) ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের (বাকস্বাধীনতা, গোপনীয়তা ও জীবনের অধিকার) ওপর। এছাড়া কপিরাইট আইন (১৯৫৭), ট্রেডমার্ক আইন (১৯৯৯) এবং পুরোনো টর্ট আইনের বিভিন্ন ব্যাখ্যার সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সমস্যা হল—বর্তমান বিচারব্যবস্থায় সুরক্ষা মিলছে মূলত ঘটনা ঘটার পরে (retrospectively)। তাছাড়া বেশিরভাগ মামলাই তারকাদের আর্থিক স্বার্থের কথা মাথায় রেখে লড়া হচ্ছে। কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিকের ছবি বিকৃত হলে তিনি কীভাবে এই দীর্ঘ আইনি লড়াই লড়বেন, কিংবা কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর পরিচয় বিকৃত হওয়া আটকানোর পথ কী—সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট নির্দেশিকার অভাব রয়েছে।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণের মধ্যেই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক (MeitY) 'তথ্যপ্রযুক্তি (ইন্টারমিডিয়ারি নির্দেশিকা এবং ডিজিটাল মিডিয়া আচরণবিধি) নিয়মাবলী, ২০২১'-এ এক ঐতিহাসিক সংশোধনী এনেছে। এবার আর অভিযোগের অপেক্ষায় বসে থাকা নয়, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলিকে সক্রিয়ভাবে ডিপফেক রুখতে বাধ্য করা হয়েছে।
১. ডিপফেকের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা: আইনে প্রথমবারের মতো সিন্থেটিক মিডিয়া এবং ডিপফেকের স্পষ্ট সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
২. দ্রুত কনটেন্ট প্রত্যাহার (৩ ঘণ্টার সময়সীমা): আগে কোনো আপত্তিকর কনটেন্ট সরানোর জন্য ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় পেত সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলি। নতুন নিয়মে সেই সময়সীমা কমিয়ে মাত্র ৩ ঘণ্টা করা হয়েছে।
৩. প্রযুক্তিগত তথ্য ও সোর্স চিহ্নিতকরণ: এআই দ্বারা তৈরি যে কোনও ছবির ক্ষেত্রে ওয়াটারমার্ক বা দৃশ্যমান লেবেল এবং অডিওর ক্ষেত্রে ডিসক্লেইমার থাকা বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে মেটাডাটার মাধ্যমে সেই কৃত্রিম কনটেন্টের উৎস চিহ্নিত করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৪. প্ল্যাটফর্মগুলির দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি: অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া ও নিজস্ব অ্যালগরিদমের মাধ্যমে আগেভাগেই এমন কনটেন্ট শনাক্ত করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইটি নিয়মের এই পরিবর্তন প্ল্যাটফর্মগুলিকে নজরদারির আওতায় আনতে পারলেও আসল সমাধান লুকিয়ে রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ব্যক্তিত্ব সুরক্ষা আইন’-এর মধ্যে। প্রযুক্তির বিকাশকে স্বাগত জানিয়েও সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব—সবার সম্মান ও গোপনীয়তা অক্ষুণ্ণ রাখাই এখন ডিজিটাল ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
