

AI কি সত্যিই ছবি দেখে আসল-নকল চেনে?
এআই কি সত্যিই ছবি দেখে আসল ও নকল আলাদা করতে পারে? বায়োমেট্রিক, ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইসিস এবং ডিপফেক চেনার বৈজ্ঞানিক চেকলিস্ট নিয়ে বিস্তারিত তথ্য।
সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করতে গিয়ে হঠাৎ এমন একটি ছবি দেখলেন, যা দেখে চমকে উঠলেন। রাজনৈতিক নেতার বিতর্কিত কোনো দৃশ্য, কোনো তারকার অপ্রীতিকর মুহূর্ত কিংবা কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু এক মুহূর্ত পর ভাবলেন, ছবিটা কি আসল? নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি? সন্দেহ হলে দ্বিধা না করে এবার থেকে পরখ করে নিন। ৩০ সেকেন্ডে চিনে নিন খাঁটি ছবি। কী করে? সেই মোক্ষম টিপসই রয়েছে এই আর্টিকেলে। চলুন জেনে নেওয়া যাক।
জানেন কী, মানুষের চোখ যেখানে প্রায়ই বোকা বনে যায়, সেখানেই প্রযুক্তি কাজ করে? এআই কি সত্যিই নিখুঁতভাবে এই নকল ধরতে পারে? উত্তরটা সোজা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে দেওয়া কঠিন। কারণ এটি মূলত চোর-পুলিশের এক অবিরাম প্রযুক্তিগত লড়াই।
ডিপফেক বা সিন্থেটিক ছবি তৈরির পেছনে মূল কারিগর হলো বিশেষ কিছু এআই মডেল। এদের মধ্যে অন্যতম হলো GAN (Generative Adversarial Networks) এবং আধুনিক ডিফিউশন মডেল (Diffusion Models)।
একটি জিএএন সিস্টেমে দুটি আলাদা নেটওয়ার্ক পরস্পরের বিরুদ্ধে কাজ করে।
জেনারেটরের ভুলগুলো শুধরে দিতে দিতে একটা সময় সে এমন ছবি তৈরি করে, যা ডিসক্রিমিনেটরকে ফাঁকি দিতে পারে। ঠিক এইভাবেই মিডজার্নি (Midjourney) বা ডাল-ই (DALL-E)-র মতো মডেলগুলো আজকের দিনে এত নিখুঁত ছবি তৈরি করতে পারছে।
মানুষের মস্তিষ্ক যেখানে ছবির সামগ্রিক আবেগের ওপর নজর দেয়, সেখানে এআই বা ডিটেকশন মডেলগুলো নজর দেয় ছবির ভেতরের সূক্ষ্ম গাণিতিক ও প্রযুক্তিগত প্যাটার্নে। একটি ছবি আসল কি না, তা বুঝতে ডিটেকশন সিস্টেমগুলো মূলত কয়েকটি স্তরে কাজ করে:
জেনারেটিভ মডেলগুলো যখন কোনো ছবি বানায়, তখন পিক্সেলে কিছু সূক্ষ্ম অসামঞ্জস্য থেকে যায়। একে বলা হয় ‘ডিজিটাল আর্টিফ্যাক্ট’।
সাধারণত আমরা যে ছবি দেখি, তা হলো ছবির স্থানিক বা স্পেশিয়াল রূপ। কিন্তু প্রযুক্তির চোখে প্রতিটি ছবির পেছনে থাকে নির্দিষ্ট কিছু গাণিতিক তরঙ্গের বিন্যাস।
ভিডিও ডিপফেক ধরার ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সূত্র কাজে লাগানো হয়। একে বলা হয় পিপিজি (Photoplethysmography) বিশ্লেষণ।
ছবিটির ডিজিটাল জন্মপত্রিকা পরীক্ষা করাও ডিপফেক ধরার একটি বড় অংশ।
বাস্তবতা হল, কোনো ডিটেকশন টুলই এখনো শতভাগ নির্ভুল নয়। এর পেছনে কয়েকটি শক্ত কারণ রয়েছে:

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো সন্দেহজনক ছবি দেখলে বিভ্রান্ত হওয়ার আগে এই সহজ চেকলিস্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করে নিন:
(ডিজাইনার বা পাঠকদের সুবিধার্থে ইনফোগ্রাফিকের বিস্তারিত কন্টেন্ট স্ট্রাকচার নিচে দেওয়া হল)
| যাচাইয়ের ক্ষেত্র | আসল ছবি (Real Image) | নকল বা এআই ছবি (Deepfake/AI) |
| ১. ত্বকের টেক্সচার | রোমকূপ, স্বাভাবিক দাগ, বলিরেখা ও অমসৃণ ভাব থাকে। | প্লাস্টিকের মতো অতিরিক্ত মসৃণ ও চকচকে ভাব থাকে। |
| ২. চোখের রিফ্লেকশন | দুই চোখের মণিতে একই উৎস থেকে আসা একক আলোর বিন্দু দেখা যায়। | দুই চোখে আলোর প্রতিফলন ভিন্ন হতে পারে বা আকার অস্বাভাবিক হয়। |
| ৩. হাত ও আঙুল | পাঁচ আঙুলের অনুপাত, নখ ও অস্থিসন্ধি স্বাভাবিক নিয়মে থাকে। | আঙুল অতিরিক্ত লম্বা, বাঁকা, কিংবা সংখ্যায় ৫টির কম-বেশি দেখা যায়। |
| ৪. ব্যাকগ্রাউন্ড লজিক | পেছনের লেখা, সাইনবোর্ড বা স্থাপত্যের লাইন স্বাভাবিক ও সোজা থাকে। | পেছনের লেখা অবোধ্য বা বিকৃত হরফে থাকে, সোজা লাইন বেঁকে যায়। |
| ৫. কানের গঠন ও গয়না | দুই কানের গঠন এবং জোড়া কানের দুলের নকশা হুবহু একই থাকে। | কানের লতির গঠন অস্বাভাবিক হয়, দুই কানের দুল আলাদা হতে পারে। |
ডিপফেক বা সিন্থেটিক মিডিয়া যত দ্রুততার সাথে নিজেদের নিখুঁত করে তুলছে, তাকে চিহ্নিত করার বিজ্ঞানও সমান্তরাল গতিতে আপডেট হচ্ছে। গবেষকরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নিউরাল নেটওয়ার্ক এবং ফরেনসিক টুল তৈরি করছেন। আজকের ডিপফেক ডিটেকশন মডেলগুলো সাধারণ বা মাঝারি মানের জাল ছবি চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে প্রায় আশি থেকে নব্বই শতাংশ সফল। কিন্তু প্রযুক্তি কখনোই এককভাবে সব সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হতে পারে না।
কারণ একটাই—জেনারেটিভ এআই যে হারে আত্মউন্নয়ন করছে, তাতে ভবিষ্যতে এমন এক সময় আসবে যখন ফ্রিকোয়েন্সি গ্রাফ কিংবা রক্ত সঞ্চালনের সঙ্কেতও তারা পুরোপুরি অনুকরণ করে ফেলবে। তখন নিখুঁত টেকনিক্যাল টুলও হয়তো দ্বিধায় পড়ে যাবে। সেই মুহূর্তে বিভ্রান্তি আর প্রতারণার মাঝে আসল সুরক্ষা দেবে মানুষের নিজস্ব যুক্তিবোধ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা।
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ভেসে আসা যে কোনও চমকপ্রদ বা বিস্ফোরক ছবি দেখার পর তা অন্ধভাবে সত্যি ধরে নেওয়ার মানসিকতা ছাড়তে হবে। সেই ছবিতে ব্যবহৃত আলোর উৎস, ছায়ার স্বাভাবিকতা, মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি কিংবা পটভূমির অসঙ্গতিগুলো একটু স্থির চোখে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। পাশাপাশি ছবিটি কোন বিশ্বস্ত মাধ্যম থেকে এসেছে, নাকি স্রেফ লাইক-শেয়ারের তাগিদে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে—সেই পরিপ্রেক্ষিত যাচাই করাই আজকের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞান। দিনশেষে অ্যালগরিদম কেবল সঙ্কেতটুকু তুলে ধরতে পারে, কিন্তু তথ্যকে বিশ্বাস করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি মানুষকেই নিতে হয়। তাই নিখুঁত প্রযুক্তির এই বিভ্রান্তিকর যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চেয়ে মানুষের নির্মোহ ও সতর্ক চোখই হয়ে উঠবে সত্যের সবচেয়ে বড় পাহারাদার।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।
