২৭শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
নকল ছবি, না আসল? ৩০ সেকেন্ডে তফাৎ বুঝুন!

AI কি সত্যিই ছবি দেখে আসল-নকল চেনে?

নকল ছবি, না আসল? ৩০ সেকেন্ডে তফাৎ বুঝুন!

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

এআই কি সত্যিই ছবি দেখে আসল ও নকল আলাদা করতে পারে? ডিপফেক ধরার বিজ্ঞান

এআই কি সত্যিই ছবি দেখে আসল ও নকল আলাদা করতে পারে? বায়োমেট্রিক, ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইসিস এবং ডিপফেক চেনার বৈজ্ঞানিক চেকলিস্ট নিয়ে বিস্তারিত তথ্য।

মূল বিষয়

সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করতে গিয়ে হঠাৎ এমন একটি ছবি দেখলেন, যা দেখে চমকে উঠলেন। রাজনৈতিক নেতার বিতর্কিত কোনো দৃশ্য, কোনো তারকার অপ্রীতিকর মুহূর্ত কিংবা কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু এক মুহূর্ত পর ভাবলেন, ছবিটা কি আসল? নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি? সন্দেহ হলে দ্বিধা না করে এবার থেকে পরখ করে নিন। ৩০ সেকেন্ডে চিনে নিন খাঁটি ছবি। কী করে? সেই মোক্ষম টিপসই রয়েছে এই আর্টিকেলে। চলুন জেনে নেওয়া যাক।

জানেন কী, মানুষের চোখ যেখানে প্রায়ই বোকা বনে যায়, সেখানেই প্রযুক্তি কাজ করে? এআই কি সত্যিই নিখুঁতভাবে এই নকল ধরতে পারে? উত্তরটা সোজা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে দেওয়া কঠিন। কারণ এটি মূলত চোর-পুলিশের এক অবিরাম প্রযুক্তিগত লড়াই।

ডিপফেক কীভাবে তৈরি হয়: জেনারেটিভ মডেলের জাদু

ডিপফেক বা সিন্থেটিক ছবি তৈরির পেছনে মূল কারিগর হলো বিশেষ কিছু এআই মডেল। এদের মধ্যে অন্যতম হলো GAN (Generative Adversarial Networks) এবং আধুনিক ডিফিউশন মডেল (Diffusion Models)।

একটি জিএএন সিস্টেমে দুটি আলাদা নেটওয়ার্ক পরস্পরের বিরুদ্ধে কাজ করে।

  • জেনারেটর: সে লাখ লাখ আসল ছবি দেখে নতুন একটি নকল ছবি তৈরি করে।
  • ডিসক্রিমিনেটর: সে যাচাই করে ছবিটি আসল নাকি নকল।

জেনারেটরের ভুলগুলো শুধরে দিতে দিতে একটা সময় সে এমন ছবি তৈরি করে, যা ডিসক্রিমিনেটরকে ফাঁকি দিতে পারে। ঠিক এইভাবেই মিডজার্নি (Midjourney) বা ডাল-ই (DALL-E)-র মতো মডেলগুলো আজকের দিনে এত নিখুঁত ছবি তৈরি করতে পারছে।

ডিপফেক ধরার পেছনের বিজ্ঞান: এআই যা খোঁজে

মানুষের মস্তিষ্ক যেখানে ছবির সামগ্রিক আবেগের ওপর নজর দেয়, সেখানে এআই বা ডিটেকশন মডেলগুলো নজর দেয় ছবির ভেতরের সূক্ষ্ম গাণিতিক ও প্রযুক্তিগত প্যাটার্নে। একটি ছবি আসল কি না, তা বুঝতে ডিটেকশন সিস্টেমগুলো মূলত কয়েকটি স্তরে কাজ করে:

১. পিক্সেল এবং আর্টফ্যাক্ট বিশ্লেষণ

জেনারেটিভ মডেলগুলো যখন কোনো ছবি বানায়, তখন পিক্সেলে কিছু সূক্ষ্ম অসামঞ্জস্য থেকে যায়। একে বলা হয় ‘ডিজিটাল আর্টিফ্যাক্ট’।

  • মানুষের চোখে আলো স্বাভাবিক মনে হলেও, আলো ও ছায়ার প্রতিফলন এআই খুব সহজে নিখুঁত করতে পারে না। চোখের মণির ওপর আলোর প্রতিফলন গোল নাকি বিকৃত, তা এআই ডিটেক্টর স্ক্যান করে।
  • কানের লতি, চুলের বিন্যাস, আঙুলের খাঁজ বা দাঁতের গঠনে অনেক সময় অস্বভাবিক ব্লার বা অতিরিক্ত মসৃণতা থাকে। বিশেষ করে মানুষের হাতের আঙুল আঁকতে গিয়ে এআই মডেলগুলো প্রায়ই ত্রুটি রেখে যায়।

২. ফ্রিকোয়েন্সি ডোমেন অ্যানালাইসিস

সাধারণত আমরা যে ছবি দেখি, তা হলো ছবির স্থানিক বা স্পেশিয়াল রূপ। কিন্তু প্রযুক্তির চোখে প্রতিটি ছবির পেছনে থাকে নির্দিষ্ট কিছু গাণিতিক তরঙ্গের বিন্যাস।

  • ডিপফেক ধরার জন্য বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন এফএফটি (Fast Fourier Transform)। এটি ছবির ভেতরের উচ্চ ও নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সির অসঙ্গতিগুলো সামনে এনে দেয়।
  • ক্যামেরা দিয়ে তোলা কোনো ছবির ফ্রিকোয়েন্সি গ্রাফ যে নিয়মে সাজানো থাকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবির গ্রাফ তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা হয়। মানুষের চোখে ধরা না পড়লেও ডিটেকশন অ্যালগরিদমে এই পার্থক্য স্পষ্ট ধরা পড়ে।

৩. বায়োলজিক্যাল বা শারীরবৃত্তীয় অসঙ্গতি

আরও পড়ুন
চা ছেড়ে ‘স্পেশাল্টি কফি’তে মজে কলকাতার নতুন জেনারেশন?
ফাঁকা সিনেমা-হল, ফেসবুকে ‘হাউসফুল’!
সোলো ট্রিপ আর স্বপ্ন নয়! মেয়েদের নিরাপদে ঘোরার সেরা ৫ গন্তব্য

ভিডিও ডিপফেক ধরার ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সূত্র কাজে লাগানো হয়। একে বলা হয় পিপিজি (Photoplethysmography) বিশ্লেষণ।

  • রক্ত সঞ্চালনের কারণে আমাদের মুখের ত্বকের রঙে প্রতি মিলি-সেকেন্ডে অতি সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে। সাধারণ চোখে এটি দেখা অসম্ভব, কিন্তু উন্নত অ্যালগরিদম মুখের রক্তপ্রবাহের এই ওঠানামা মাপতে পারে।
  • কোনো আসল মানুষের ভিডিওতে এই বায়োলজিক্যাল স্পন্দন দেখা যাবে। কিন্তু কৃত্রিম ভিডিওতে মুখের ত্বক নড়াচড়া করলেও সেই রক্ত সঞ্চালনের নিখুঁত ছন্দ থাকে না। ফলে সিস্টেমটি সহজেই বুঝে যায় যে চরিত্রটি বাস্তব নয়।

৪. মেটাডেটা ও ক্রিপ্টোগ্রাফিক সিগনেচার

ছবিটির ডিজিটাল জন্মপত্রিকা পরীক্ষা করাও ডিপফেক ধরার একটি বড় অংশ।

  • ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবির ভেতরে ক্যামেরা মডেল, লেন্স, অ্যাপারচার ও আইএসও-র মতো এক্সিফ (EXIF) ডেটা থাকে।
  • আজকের দিনে বড় বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলো তৈরি করছে সি২পিএ (C2PA) স্ট্যান্ডার্ড বা ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক (যেমন গুগলের সিন্থআইডি)। কোনো ছবি এআই দিয়ে তৈরি হলে ফাইলের ভেতরেই এক অদৃশ্য ডিজিটাল স্বাক্ষর জুড়ে দেওয়া হয়, যা ছবি এডিট করলেও মুছে যায় না।

তবে কি এআই একশো ভাগ সফল?

বাস্তবতা হল, কোনো ডিটেকশন টুলই এখনো শতভাগ নির্ভুল নয়। এর পেছনে কয়েকটি শক্ত কারণ রয়েছে:

  • সোশ্যাল মিডিয়ার কম্প্রেশন: কোনো ছবি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা এক্সে আপলোড করলেই তার আকার ছোট হয়ে যায়। এই কম্প্রেশনের কারণে ছবির ভেতরের সূক্ষ্ম ফ্রিকোয়েন্সি ও পিক্সেল তথ্যগুলো মুছে যায়। ফলে এআই ডিটেক্টরের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
  • এডভারসেরিয়াল অ্যাটাক: ডিপফেক নির্মাতারাও এখন চতুর। তারা ছবির ওপর এমন এক অদৃশ্য ডিজিটাল শব্দ বা ‘নয়েজ’ যোগ করে দেয়, যা মানুষের চোখে বোঝা যায় না, কিন্তু ডিটেকশন সফটওয়্যারকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত করে দেয়।

আপনার জন্য গাইড: ৩০ সেকেন্ডের ডিপফেক চেকলিস্ট

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো সন্দেহজনক ছবি দেখলে বিভ্রান্ত হওয়ার আগে এই সহজ চেকলিস্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করে নিন:

  • ত্বকের গঠন লক্ষ্য করুন: আসল মানুষের চামড়ায় রোমকূপ, মেচেতা, সূক্ষ্ম দাগ বা বলিরেখা থাকবেই। এআইয়ের ছবিতে ত্বক থাকে প্লাস্টিকের পুতুলের মতো অতিরিক্ত মসৃণ।
  • চোখের মণির আলো দেখুন: মুখের দিকে আসা আলোর উৎস একটি হলে দুটো চোখের মণিতে প্রতিফলিত আলোর বিন্দুটি একই কোণে থাকবে। এআই ছবিতে প্রায়ই দুই চোখে ভিন্ন আলোর প্রতিফলন দেখা যায়।
  • ভিডিওর কিনারা খেয়াল করুন: ভিডিও ডিপফেক হলে চরিত্রটির মাথা নাড়াচাড়ার সময় কান, চশমা বা চুলের ধারগুলো বারবার ঘোলাটে হয়ে যায়।
  • হাত এবং কানের গঠন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো মানুষের হাতের আঙুল আর কানের খাঁজ নিখুঁতভাবে আঁকতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি হোঁচট খায়। আঙুলের সংখ্যা বা গঠন অস্বাভাবিক কি না, দেখে নিন।

বিশেষ ইনফোগ্রাফিক রূপরেখা: আসল বনাম নকল চেনার ৫টি উপায়

(ডিজাইনার বা পাঠকদের সুবিধার্থে ইনফোগ্রাফিকের বিস্তারিত কন্টেন্ট স্ট্রাকচার নিচে দেওয়া হল)

যাচাইয়ের ক্ষেত্রআসল ছবি (Real Image)নকল বা এআই ছবি (Deepfake/AI)
১. ত্বকের টেক্সচাররোমকূপ, স্বাভাবিক দাগ, বলিরেখা ও অমসৃণ ভাব থাকে।প্লাস্টিকের মতো অতিরিক্ত মসৃণ ও চকচকে ভাব থাকে।
২. চোখের রিফ্লেকশনদুই চোখের মণিতে একই উৎস থেকে আসা একক আলোর বিন্দু দেখা যায়।দুই চোখে আলোর প্রতিফলন ভিন্ন হতে পারে বা আকার অস্বাভাবিক হয়।
৩. হাত ও আঙুলপাঁচ আঙুলের অনুপাত, নখ ও অস্থিসন্ধি স্বাভাবিক নিয়মে থাকে।আঙুল অতিরিক্ত লম্বা, বাঁকা, কিংবা সংখ্যায় ৫টির কম-বেশি দেখা যায়।
৪. ব্যাকগ্রাউন্ড লজিকপেছনের লেখা, সাইনবোর্ড বা স্থাপত্যের লাইন স্বাভাবিক ও সোজা থাকে।পেছনের লেখা অবোধ্য বা বিকৃত হরফে থাকে, সোজা লাইন বেঁকে যায়।
৫. কানের গঠন ও গয়নাদুই কানের গঠন এবং জোড়া কানের দুলের নকশা হুবহু একই থাকে।কানের লতির গঠন অস্বাভাবিক হয়, দুই কানের দুল আলাদা হতে পারে।

প্রযুক্তি ও মানুষের যৌথ পাহারা

ডিপফেক বা সিন্থেটিক মিডিয়া যত দ্রুততার সাথে নিজেদের নিখুঁত করে তুলছে, তাকে চিহ্নিত করার বিজ্ঞানও সমান্তরাল গতিতে আপডেট হচ্ছে। গবেষকরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নিউরাল নেটওয়ার্ক এবং ফরেনসিক টুল তৈরি করছেন। আজকের ডিপফেক ডিটেকশন মডেলগুলো সাধারণ বা মাঝারি মানের জাল ছবি চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে প্রায় আশি থেকে নব্বই শতাংশ সফল। কিন্তু প্রযুক্তি কখনোই এককভাবে সব সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হতে পারে না।

কারণ একটাই—জেনারেটিভ এআই যে হারে আত্মউন্নয়ন করছে, তাতে ভবিষ্যতে এমন এক সময় আসবে যখন ফ্রিকোয়েন্সি গ্রাফ কিংবা রক্ত সঞ্চালনের সঙ্কেতও তারা পুরোপুরি অনুকরণ করে ফেলবে। তখন নিখুঁত টেকনিক্যাল টুলও হয়তো দ্বিধায় পড়ে যাবে। সেই মুহূর্তে বিভ্রান্তি আর প্রতারণার মাঝে আসল সুরক্ষা দেবে মানুষের নিজস্ব যুক্তিবোধ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা।

ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ভেসে আসা যে কোনও চমকপ্রদ বা বিস্ফোরক ছবি দেখার পর তা অন্ধভাবে সত্যি ধরে নেওয়ার মানসিকতা ছাড়তে হবে। সেই ছবিতে ব্যবহৃত আলোর উৎস, ছায়ার স্বাভাবিকতা, মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি কিংবা পটভূমির অসঙ্গতিগুলো একটু স্থির চোখে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। পাশাপাশি ছবিটি কোন বিশ্বস্ত মাধ্যম থেকে এসেছে, নাকি স্রেফ লাইক-শেয়ারের তাগিদে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে—সেই পরিপ্রেক্ষিত যাচাই করাই আজকের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞান। দিনশেষে অ্যালগরিদম কেবল সঙ্কেতটুকু তুলে ধরতে পারে, কিন্তু তথ্যকে বিশ্বাস করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি মানুষকেই নিতে হয়। তাই নিখুঁত প্রযুক্তির এই বিভ্রান্তিকর যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চেয়ে মানুষের নির্মোহ ও সতর্ক চোখই হয়ে উঠবে সত্যের সবচেয়ে বড় পাহারাদার।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়

সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য