

গঙ্গার তলা দিয়ে মেট্রো। ছবি - Google
জলের নিচে সুড়ঙ্গ মানেই জল ঢোকার একটা মানসিক ভয় কাজ করে। কিন্তু ইঞ্জিনিয়াররা জল ঢোকার পথ পাকাপাকিভাবে বন্ধ করতে তিনটে নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। এবং এই ব্যবস্থাগুলির প্রত্যেকটি স্বয়ংক্রিয়। একটা কাজ না করলে ওমনি সঙ্গে সঙ্গে অপরটি কাজ করা শুরু করে দেবে। যেন হলিউডের কোনও সিনেম!
নদীর জলের তলা দিয়ে ট্রেন ছুটবে। এমনটা একসময় বাংলার মানুষের কাছে নেহাতই রূপকথা ছিল। কিন্তু সেই রূপকথাকে আজ বাস্তব করে দিব্যি হাওড়া ময়দান থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রো বা গ্রিন লাইনের ট্রেন ছুটছে। আর তা যাচ্ছে গঙ্গার তলা দিয়ে। সফলভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই পথে যাতায়াত করছেন। কিন্তু বহু যাত্রীর মনে প্রায়শই একটাই প্রশ্ন ঘোরে- নদীর নিচে দিয়ে যাওয়ার সময় যদি সুড়ঙ্গে ফুটো হয়ে যায় তাহলে কী হবে? যদি মাঝপথে ট্রেন বিগড়ে যায় তখন কী হবে?
গঙ্গার মাটির প্রায় ১৩ মিটার নিচ দিয়ে মেট্রোর এই সুড়ঙ্গ গেছে। গঙ্গার তলার মাটি এমনিতে খুব নরম এবং কাদায় ভরা। সেখানে জলের বিপুল চাপ সামলে সুড়ঙ্গ খোঁড়া মোটেও সহজ কাজ ছিল না। নদীর তলার অংশে আছে এই সুড়ঙ্গের ৫২০ মিটার। সেখানে মাটি কেটে সুড়ঙ্গ তৈরির জন্য 'প্রেরণা' এবং 'রচনা' নামের দুটি বিশাল টানেল বোরিং মেশিন ব্যবহার করা হয়েছিল। এই মেশিনগুলো অনেকটা কেঁচোর মতো কাজ করে। সামনের ব্লেড দিয়ে মাটি কাটার সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেছনের দিক থেকে কংক্রিটের দেওয়াল গেঁথে দিতে দিতে যায়। ফলে মাটি কাটা আর দেওয়াল তৈরির কাজ একেবারে একসাথে এগোতে থাকে। এর ফলে নদীর কাদা বা জল সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢোকার কোনও সুযোগই পায়নি।
এই প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছিল বউবাজার এলাকায় কাজ করার সময়। নদীর নিচে কাজ করার চেয়েও পুরনো কলকাতার ঘিঞ্জি এলাকার তলা দিয়ে এই বিশাল টানেল বোরিং মেশিন নিয়ে যাওয়া ছিল সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের। এবং তাতে বড়সড় সমস্যাও এসেছিল।
ডালহৌসি চত্বরে অনেক হেরিটেজ ইমারত ছিল যা সামলে কাজ করতে হয়েছে। তবে আসল বিপদ ঘটে বউবাজারে। এখানে মাটির নিচে থাকা বিশাল জলস্তর বা অ্যাকুইফারে মেশিনের ধাক্কা লাগে। এর ফলে প্রবল বেগে কাদা আর জল সুড়ঙ্গে ঢুকতে শুরু করে। উপরের মাটি বসে গিয়ে এলাকার বহু পুরনো বাড়িতে ফাটল ধরে যায়। এই ঘটনার জন্য প্রজেক্টের কাজ বেশ কয়েক বছর পিছিয়ে গিয়েছিল। পরে দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সাহায্যে বিশেষ রাসায়নিক মিশ্রণ দিয়ে কাদামাটিকে পাথরের মতো শক্ত করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়।
বাংলার অনেকেই এই আন্ডারওয়াটার মেট্রো প্রজেক্টকে ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বলে মনে করেন। কিন্তু দেশের বুকে আরও বেশ কিছু কঠিন প্রজেক্ট হয়েছে। যেমন জম্মু ও কাশ্মীরের চেনাব ব্রিজ বা হিমাচল প্রদেশের অটল টানেল। চেনাব ব্রিজে কার্যত মেঘের উপর দড়ি বেয়ে ঝুলে শ্রমিকদের কাজ করতে হয়েছে ভয়ঙ্কর ঝড়ো হাওয়ার দাপট সামলে। আবার অটল টানেল খোঁড়ার সময় পাহাড়ের ভেতর দিয়ে বরফগলা জলের নদীর খোঁজ মেলে। সেখানে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় লড়াই করতে হয়েছে ইঞ্জিনিয়ারদের।
অটল টানেল বা চেনাব ব্রিজে লড়াইটা ছিল সরাসরি হিমালয়ের রুক্ষ প্রকৃতি এবং ভয়াল উচ্চতার সঙ্গে। অন্যদিকে গঙ্গায় সুড়ঙ্গ তৈরির ক্ষেত্রে লড়াইটা ছিল নদীর জলের চাপ এবং এক পুরোনো শহরের অজানা মাটির চরিত্র নিয়ে। তাই বিপদের ধরন আলাদা হলেও কারিগরি দিক থেকে এই মেট্রো প্রজেক্ট কোনও অংশে পিছিয়ে নেই।
গঙ্গার তলার ৫২০ মিটারের এই সুড়ঙ্গ পথটুকু পার হতে একটি মেট্রোর সময় লাগে মাত্র ৪৫ সেকেন্ড। কিন্তু যদি ঠিক ওই জায়গাতেই ট্রেন দাঁড়িয়ে যায় তবে কী হবে? এই চিন্তাটা এই রুটের নিয়মিত যাত্রীদের পাশাপাশি বাংলার বহু সাধারণ মানুষের মনেই ঘুরেফিরে বেড়ায়। তাই এই সুরঙ্গের মধ্যে যে কোনও বিপর্যয় দেখা দিলে কোন পথে তার মোকাবিলা করা হবে সেই বিস্তারিতটা দেখে নেওয়া যাক।
যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য গঙ্গার তলায় সুড়ঙ্গের ভেতরে মেট্রোর লাইনের ঠিক পাশ ঘেঁষে চওড়া হাঁটার রাস্তা বা এমার্জেন্সি ওয়াকওয়ে তৈরি করা হয়েছে। ফলে কোনও কারণে মেট্রো ওই সুড়ঙ্গের মধ্যে বিকল হয়ে পড়লে বা দাঁড়িয়ে গেলে যাত্রীদের মেট্রোর দরজা খুলে বের করে এনে সোজা ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিরাপদে স্টেশনে পৌঁছে দেওয়া হবে।
এছাড়া আপ-ডাউন দুটি লাইনে যাতায়াতের জন্য দুটো আলাদা সুড়ঙ্গ আছে। অর্থাৎ একটি টানেলের মধ্যে দিয়ে আপ লাইন চলে গিয়েছে। ডাউন লাইন পাশের অপর একটি টানেলের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। এর মানে হল, গঙ্গার তলদেশে অবস্থিত মেট্রোর যে সুড়ঙ্গ আছে, তার একটিই টানেলের মধ্যে দিয়ে মোটেও দুটো লাইন যায়নি। যদিও অন্যান্য ক্ষেত্রে মেট্রোর দুটো লাইন একেবারে পাশাপাশি দেখা যায়।
বিপদ ঘটলে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য গঙ্গার তলদেশে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর অন্তর মেট্রোর দুটি সুড়ঙ্গের মধ্যে সংযোগকারী প্যানেল এবং তার দরজা রাখা হয়েছে। ফলে একটি সুড়ঙ্গে কোনও সমস্যা হলে যাত্রীদের ওইরকম কোনও একটি সংযোগকারী দরজা দিয়ে পাশের নিরাপদ সুড়ঙ্গে নিয়ে যাওয়া হবে।
আবার কোনভাবে সুড়ঙ্গের মধ্যে আগুন লেগে ধোঁয়া জমলে বা বিষাক্ত বাতাসে সুড়ঙ্গ ভরে গেলে তা বের করার জন্য নদীর দুই পাড়ে হাওড়া এবং স্ট্র্যান্ড রোডের কাছে প্রায় ৪৪ মিটার গভীর ভেন্টিলেশন শ্যাফট আছে। বিশাল ফ্যান যুক্ত এই শ্যাফটগুলো সুড়ঙ্গের ভেতরের বিষাক্ত বাতাস নিমেষের মধ্যে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো টেনে বাইরে বের করে দিতে সক্ষম। একইসঙ্গে তারা বাইরের পরিশুদ্ধ মুক্ত বাতাস সুরঙ্গের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারবে।
সুড়ঙ্গে জল ঢুকলে সুরক্ষার তিনটে স্তর
জলের নিচে সুড়ঙ্গ মানেই জল ঢোকার একটা মানসিক ভয় কাজ করে। কিন্তু ইঞ্জিনিয়াররা জল ঢোকার পথ পাকাপাকিভাবে বন্ধ করতে তিনটে নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।
প্রথমত, সুড়ঙ্গের কংক্রিটের দেওয়ালের জোড়ের মুখে হাইড্রোফিলিক গ্যাসকেট নামে বিশেষ এক ধরনের রাবার লাগানো আছে। এক ফোঁটা জলের ছোঁয়া পেলেই এই বিশেষ রাবার ফুলে গিয়ে কংক্রিটের মাঝের সামান্য ফাঁকা জায়গাটুকুও পুরোপুরি সিল করে দেয়। ফলে জল ঢোকার পথ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, এরপরও যদি ফাটল দিয়ে জল ঢোকে তার জন্য সুড়ঙ্গের নিচু জায়গায় স্বয়ংক্রিয় পাম্প বসানো আছে। জল জমতে শুরু করলেই তার সংস্পর্শে এসে নিজে থেকেই এই বিশাল ক্ষমতার পাম্পগুলো চালু হয়ে যাবে এবং সব জল মুহূর্তের মধ্যে টেনে নদীর বাইরে বা শহরের নিকাশি নালায় ফেলে দেবে।
এরপর যদি সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার কথা ভেবে রাখা হয়েছে তৃতীয় স্তর। এর জন্য সুড়ঙ্গের মুখে জলনিরোধক ইস্পাতের দরজা বা ফ্লাডগেট বসানো আছে। কোনও কারণে সুড়ঙ্গের কোন ও অংশ থেকে জল ঢুকতে শুরু করলে এই ব্যবস্থা কার্যকরী হয়ে উঠবে। জলের মাত্রা বিপদসীমা ছাড়ালে এই ভারী দরজাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেমে এসে সুড়ঙ্গের নির্দিষ্ট অংশটুকু পুরোপুরি সিল করে দেবে। এর ফলে নদীর জল কোনভাবেই সুড়ঙ্গ বেয়ে স্টেশনে পৌঁছাতে পারবে না।
সব মিলিয়ে প্রযুক্তি আর মানুষের অদম্য জেদের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন হল গঙ্গার তলার এই মেট্রো। জলের তলা দিয়ে যাওয়ার সময় যাত্রীদের বোঝানোর জন্য টানেলের গায়ে নীল রঙের আলো লাগানো হয়েছে। সেই নীল আলোর জাদুতে ভেসে সম্পূর্ণ নিরাপদে গঙ্গা পার হওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যি অনন্য।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
