

বাংলা রাগসংগীতের বাস্তবতা। Image: AI
বাংলায় রাগসংগীতের চর্চা কি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে? বিষ্ণুপুর ঘরানার ইতিহাস, রেওয়াজের সংকট থেকে আইটিসি এসআরএ ও নতুন প্রজন্মের শ্রোতা—বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ।
শীতের কলকাতার সেই চিরচেনা ছবিটা মনে পড়ে? দেশপ্রিয় পার্ক কিংবা ডোভার লেনের কনকনে ঠান্ডায় শাল জড়িয়ে রাত জাগা। মঞ্চে উস্তাদ বা পণ্ডিতজির তানপুরা বাঁধতে বাঁধতেই ঘড়ির কাঁটা আড়াইটে ছুঁয়েছে, আর দর্শকাশনে হাজার হাজার মানুষ পিনপতন নিস্তব্ধতায় অপেক্ষা করছেন—কখন ধৈবতের ওপর মীড় ফেলে ধরবেন ভৈরবী।
সেই আবেশ কি আজও আগের মতোই জীবন্ত? নাকি এখনকার কনফারেন্সগুলো শুধুই সোশ্যাল মিডিয়ায় চেক-ইন দেওয়ার ‘কালচারাল ফ্লেক্স’?
প্রশ্নটা একটু অপ্রিয়, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার জো নেই। উত্তরপ্রদেশ, গোয়ালিয়র কিংবা আগ্রার মাটি থেকে জন্ম নিলেও গত দেড়শো বছরে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে বড় কদরদান ছিল এই বাংলা। নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ যখন মেটিয়াবুরুজে এলেন, লখনউয়ের দরবার ভাঙল ঠিকই, কিন্তু সেই সুরের ধারা এসে আশ্রয় পেয়েছিল কলকাতার বাবু আর জমিদারদের জলসাঘরে। বিষ্ণুপুর ঘরানার ধ্রুপদ থেকে শুরু করে উস্তাদ বড় গোলাম আলি খান, রবিশঙ্কর, বিলায়েত খান কিংবা বিদুষী গিরিজা দেবী—কলকাতার সিলমোহর ছাড়া দেশে কোনো শিল্পীর জাত চিনত না দুনিয়া।
সেই বাংলায় বসে আজ যদি প্রশ্ন ওঠে—রাগসংগীতের চর্চা কি কমে যাচ্ছে? তবে উত্তরটা এক কথায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে দেওয়া যাবে না।

বাংলার নিজস্ব শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাস কিন্তু ধার করা নয়। রাঢ় বাংলার মল্লভূমে জন্ম নিয়েছিল বিষ্ণুপুর ঘরানা। পণ্ডিত রামশঙ্কর ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে যদুভট্ট—বাংলা নিজের মাটির গন্ধে ধ্রুপদকে আপন করে নিয়েছিল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই যদুভট্টের কাছে শাস্ত্রীয় সুরের তালিম নিয়েছিলেন, যাঁর ছায়ায় গড়ে উঠেছে রবীন্দ্রসংগীতের বিরাট এক অংশ।
পরবর্তীকালে কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, শোভাবাজার রাজবাড়ি কিংবা পাথুরিয়াঘাটার ভূপেন্দ্রকৃষ্ণ ঘোষের বাড়ি হয়ে উঠেছিল রাগসংগীতের আখড়া। কানাইলাল অ্যান্ড কোম্পানির সেতার কিংবা দ্বারকিন-এর হারমোনিয়ামের কারিগরিতে বাংলা তখন বাদ্যযন্ত্র নির্মাণেও দেশের রাজধানী।
অথচ আজ? সেই সুরের জমিদারি কি স্রেফ জাদুঘরের প্রদর্শনী হয়ে দাঁড়িয়েছে?

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে রিয়্যালিটি চেকটা খুব স্পষ্ট। রাগসংগীত কোনো ইনস্ট্যান্ট নুডলস নয় যে দু’মিনিটে তৈরি হয়ে যাবে। এটা বহু বছরের নির্জন সাধনা, যাকে বলা হয় ‘রেওয়াজ’।

তবে ছবিটা কি কেবলই অন্ধকারের? হতাশাবাদীরা বলতেই পারেন রাগসংগীত আইসিইউ-তে চলে গেছে। কিন্তু টালিগঞ্জের ‘আইটিসি সংগীত রিসার্চ একাডেমি’ (SRA)-র চত্বরে পা রাখলে সেই ধারণা ধাক্কা খাবে।
গুরু জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ থেকে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, বিদুষী কৌশিকী চক্রবর্তী—বাংলা কিন্তু দেশে তৈরি হওয়া রাগসংগীতের ধারাকে পুরো শুকাতে দেয়নি। আজও দেশের যেকোনো বড় মাপের শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে কলকাতার শিল্পীদের নাম শীর্ষেই থাকে।
তফাতটা অন্য জায়গায়: ১. শ্রোতার রূপবদল: এখনকার তরুণ শ্রোতারা হয়তো খেয়ালের প্রতিটি সূক্ষ্ম তান বা বাদী-সম্বাদী বিচার করতে পারে না, কিন্তু তারা ফিউশন, সেমি-ক্লাসিক্যাল কিংবা ব্যান্ডের ভেতর ক্লাসিক্যালের ছোঁয়া খুঁজছে। ২. ডিজিটাল আর্কাইভ ও অ্যাক্সেস: আগে যে বিরল বন্দিশ শোনার জন্য বছরের পর বছর ঘুরে বেড়াতে হতো, আজ স্পটিফাই বা ইউটিউবে এক ক্লিকেই উস্তাদ আমির খানের মেঘ বা পণ্ডিত ভীমসেন যোশীর তোড়ি হাতের মুঠোয়। ফলে পরিধি বেড়েছে, গভীরতা হয়তো কিছুটা পাতলা হয়েছে।
বাংলায় রাগসংগীত হারিয়ে যায়নি, বরং তার কুলীন রূপটা বদলে গিয়ে সাধারণের সঙ্গে যুঝছে।
যে শাস্ত্রীয় সংগীত একদা সামন্ততান্ত্রিক বড়লোকি বিলাসিতার ড্রয়িংরুমে বন্দি ছিল, আজ তা আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রযুক্তির ঘাত-প্রতিঘাতে নিজেকে টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে। সমস্যাটা প্রতিভার নয়; সমস্যাটা বাস্তুতন্ত্রের। স্কুলের স্তরে শাস্ত্রীয় সংগীতের কোনো কান তৈরির পাঠ নেই, জলসাঘরগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, আর সরকারি উদ্যোগও মূলত বার্ষিক অনুদান আর গুটিকয়েক মেলার চক্করে আটকে।
সুর চিরন্তন। যতক্ষণ ভোরের আলো ফুটবে, ততক্ষণ কোনো না কোনো জানলা দিয়ে ভৈরোর সুর উঠবেই। কিন্তু সেই সুরকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম জিইয়ে রাখার দায়িত্ব যে মাটির ছিল, সেই মাটি তার নিজের সংস্কৃতিকে কতটা আগলে রাখতে পারছে—আসল কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কিন্তু স্বয়ং এই বাংলাই।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।
