

কাল্পনিক ছবি - AI
১৮ই আগস্ট, ২০২৬
অষ্টম শতকের বাংলা। মাৎস্যন্যায়ের প্রায় শতবর্ষ ব্যাপী চরম নৈরাজ্য আর অন্ধকার কাটিয়ে বাংলার সিংহাসনে 'নির্বাচিত' হন গোপাল। এর মধ্য দিয়েই সূচনা হয় পাল বংশের। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে পাল রাজাদের কথা উঠলেই চোখে ভেসে ওঠে পাহাড়পুর বা বিক্রমশীলা মহাবিহারের মতো অনবদ্য সব বৌদ্ধ কীর্তির ছবি। পাল রাজারা ধর্মবিশ্বাসে ছিলেন আদ্যোপান্ত বৌদ্ধ, ‘পরম সৌগত’। কিন্তু অবাক করা বিষয় হল, এই আদ্যোপান্ত বৌদ্ধ রাজাদের রাজত্বে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদটি, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীত্বের রাশ যাঁদের হাতে ছিল, তাঁরা কিন্তু কেউ বৌদ্ধ ছিলেন না! দীর্ঘ প্রায় চার শতকের পাল বংশের শাসনামলে বরাবরের জন্য এই উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রমী ধারাবাহিকতা বজায় থেকেছে।
পাল বংশের শাসনকালে প্রধানমন্ত্রীর পদটি বরাবরের জন্য বরাদ্দ ছিল একটি নির্দিষ্ট হিন্দু বংশের সদস্যদের জন্য। অর্থাৎ বংশানুক্রমিক ছিল পাল রাজাদের প্রধানমন্ত্রী পদ। নির্দিষ্ট করে বললে, কট্টর এক হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের সদস্যরা পাল রাজাদের প্রধানমন্ত্রীর মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিল।
পাল রাজাদের প্রধানমন্ত্রীর পদ দখলে রাখা হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারটি ‘গর্গ বংশ’ নামে পরিচিত। টানা কয়েক প্রজন্ম ধরে পাল সাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন এই বংশের পণ্ডিত ও কূটনীতিবিদরা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন ধর্মের নামে বিশ্বজুড়ে এত বিভাজন, তখন আজ থেকে প্রায় বারোশো বছর আগে ধর্মকে সরিয়ে রেখে যোগ্যতা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার যে নিদর্শন পাল রাজা এবং গর্গ বংশীয় মন্ত্রীরা দেখিয়েছিলেন, তা গোটা বিশ্বের ইতিহাসেই এক বিরল ব্যতিক্রম।
পাল রাজবংশের বিস্তৃতি আর সমৃদ্ধির পেছনে রাজাদের তলোয়ার যতটা না গর্জিয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশি কাজ করেছে এই গর্গ বংশীয় ব্রাহ্মণদের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক। দিনাজপুরের ‘বাদল স্তম্ভলিপি’ বা গরুড় স্তম্ভ থেকে এই পরিবারের এক অসাধারণ ইতিহাস জানা যায়। রাজা ধর্মপালের শাসনকালে এই বংশের প্রথম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি গর্গ প্রধানমন্ত্রী পদে বসেন। অর্থাৎ পাল সাম্রাজ্যের একেবারে গোড়ার দিকের ঘটনা।
এরপর বংশানুক্রমিকভাবে একে একে দর্ভপাণি, সোমেশ্বর, কেদার মিশ্র এবং গুরব মিশ্রের মতো এই হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা পাল সাম্রাজ্যের হাল ধরেন। এই পরিবারের সদস্যদের যেমন রাজভক্তি ছিল অতুলনীয় তেমনই তাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দক্ষতা ছিল অপরিসীম। শুধু কূটনীতি নয়, রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে সামরিক রণকৌশল তৈরি, সবকিছুতেই তাঁরা ছিলেন অদ্বিতীয়।
হিন্দু প্রধানমন্ত্রী আর বৌদ্ধ রাজার সম্পর্কটা ঠিক কেমন ছিল? এককথায়, অবিশ্বাস্য রকম ভালো। সংঘাত তো দূর অস্ত, তাঁদের মধ্যে ছিল চূড়ান্ত পারস্পরিক সম্মান। বাদল লিপি থেকে জানা যায়, রাজা দেবপাল তাঁর প্রধানমন্ত্রী দর্ভপাণিকে এতটা সম্মান করতেন যে, মন্ত্রীর পরামর্শ শোনার জন্য তিনি নিজে গিয়ে তাঁর দোরগোড়ায় অপেক্ষা করতেন। এমনকী, দর্ভপাণি যতক্ষণ না নিজে থেকে এসে রাজার সঙ্গে কথা বলতেন, দেবপাল তাঁর রাজকীয় অহঙ্কার সরিয়ে রেখে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
দর্ভপাণির নীতি আর প্রজ্ঞার ওপর দেবপালের এই অন্ধ বিশ্বাস মোটেও বৃথা যায়নি। দর্ভপাণির কূটনীতির জোরেই দেবপাল বিন্ধ্য পর্বত থেকে হিমালয় অবধি বিশাল এক সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পেরেছিলেন। এরপর এলেন কেদার মিশ্র। কেদার মিশ্রের রণকৌশলেই দেবপাল উৎকল (বর্তমান ওড়িশা), হূণ এবং দ্রাবিড়দের দর্প চূর্ণ করে পাল সাম্রাজ্যের সীমানা আরও বাড়িয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা নারায়ণপালের সময় গুরব মিশ্রও ঠিক একই দক্ষতায় সাম্রাজ্য রক্ষা করেছিলেন।
এই অসাধারণ যুগলবন্দি সম্ভব হয়েছিল ধর্মে বৌদ্ধ হলেও পাল রাজাদের উদার মানসিকতার জন্য। মধ্যযুগের পৃথিবীতে যখন বিজয়ী রাজারা নিজেদের ধর্ম অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে ব্যস্ত, তখন বাংলার এই বৌদ্ধ রাজারা হেঁটছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে।
পাল রাজারা বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে ব্যক্তিগত ধর্মাচরণের কোনও সম্পর্ক নেই। তাই একজন বৌদ্ধ সম্রাট অবলীলায় রাষ্ট্রের কোষাগার আর সেনাবাহিনীর রাশ তুলে দেন একজন যোগ্য হিন্দু ব্রাহ্মণের হাতে। আবার সেই হিন্দু মন্ত্রীও নিজের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসকে সরিয়ে রেখে সর্বস্ব দিয়ে বৌদ্ধ রাজার সাম্রাজ্যকে রক্ষা করছেন।
এই সময়ে একদিকে যেমন রাজকোষের টাকায় তৈরি হয়েছিল সুবিশাল সব বৌদ্ধ বিহার, ঠিক তেমনই পাল রাজারা হিন্দু মন্দির তৈরি এবং ব্রাহ্মণদের জন্য অকাতরে নিষ্কর জমিও দান করেছিলেন। নারায়ণপালের ভাগলপুর তাম্রশাসনে নিজেই শিবমন্দির তৈরি করে জমি দানের যে উল্লেখ রয়েছে, তা এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
