

ছবি - AI
১৭ই আগস্ট, ২০২৬
বাংলার ইতিহাসের পাতা উল্টালে বেশ কিছু চেনা নাম চোখে পড়ে। পাল, সেন কিংবা মুর্শিদাবাদের নবাবদের কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। ঠিক-ভুল, মুখে মুখে প্রচারিত ধারণা বা আজকের 'হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি'-এর প্রচার মিলিয়ে এদের সম্বন্ধে কিছু না কিছু প্রত্যেকের মাথার মধ্যে গেঁথে আছে। কিন্তু রাঢ় বাংলার রুক্ষ, লাল মাটির বুকে একটা রাজবংশ যে টানা ১১ শতাব্দী রাজত্ব করেছিল (গোটা অখণ্ড ভারতের নিরিখেই এই নজির প্রতি বিরল) সেই খবর ক'জন রাখেন?
মল্লভূম রাজবংশ। এটা স্রেফ একটা রাজত্ব ছিল না। যেন এক আস্ত উপাখ্যান। বাইরের দুনিয়ায় যখন একের পর এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটছে, জঙ্গলমহলের ভূমিপুত্র এই শাসকরা তখন নিজেদের মতো করে ইতিহাস লিখছেন। কার্যত স্বাধীনভাবেই ১১ শতক নিজেদের মতো করে শাসন করেছেন।
মল্লভূম এই উপমহাদেশের সেই বিরল রাজবংশ যাদের নিজস্ব ক্যালেন্ডার ছিল! এই নজির দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য বা কনিষ্কর ছিল।
মল্লভূম রাজবংশের নিজস্ব ক্যালেন্ডার মল্লাব্দ নামে পরিচিত ছিল। সাধারণত ইতিহাসে দেখা যায়, প্রবল পরাক্রমশালী সম্রাটরা নিজেদের নামে অব্দের প্রচলন করতেন। বিক্রমাদিত্য বা কণিষ্কের নিজেদের মতো করে অব্দ প্রচলনের কথা সকলেই বইতেই পড়েছেন। কিন্তু আঞ্চলিক রাজা হয়েও নিজস্ব অব্দ চালু করার সাহস দেখিয়েছিলেন মল্ল'রা।
৬৯৫ খ্রিস্টাব্দ। সিংহাসনে বসলেন আদি মল্ল (রঘুনাথ)। আর ঠিক সেই বছর থেকেই শুরু হল মল্লাব্দ।
বিষ্ণুপুরের সমস্ত রাজকীয় নথিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ এমনকি রোজকার সাধারণ হিসেবনিকেশও চলত এই মল্লাব্দ মেনেই। এটা শুধু দিনক্ষণ গোনার একটা ক্যালেন্ডার ছিল না। এটা ছিল দিল্লির মুঘল কিম্বা বাংলার নবাবদের চোখে চোখ রেখে নিজেদের চূড়ান্ত স্বাধীন সত্ত্বা আর স্বকীয়তা বজায় রাখার একটা জোরালো বার্তা। চারিদিকে যখন সাম্রাজ্য ভাঙাগড়ার খেলা চলছে, তখন মল্ল রাজারা নিজেদের ভূখণ্ডে একটা সমান্তরাল সময়কাল তৈরি করে নিয়েছিলেন। উল্লেখ মল্লভূম রাজবংশ বাইরে থেকে এসে জুড়ে বসেনি। এরা ওই মাটিরই ভূমিপুত্র ছিলেন। স্থানীয় আদিবাসী পরিবার থেকেই এই রাজবংশের পথচলা শুরু। পরবর্তীতে এরা নিজেদের ক্ষত্রিয় বলে দাবি করেন।
মল্লভূম রাজবংশের এত তেজ, এত স্বাভিমানের শিকড় লুকিয়ে ছিল জঙ্গলমহলের গভীরে। ঝাড়গ্রামের মল্ল রাজারা আসলে রাজস্থানের চৌহান রাজপুত ছিলেন। তাদের সঙ্গে এই রাজবংশের কোনঐ সম্পর্ক ছিল না।এঁরা ছিলেন মাটির কাছের মানুষ।
লোকশ্রুতি আর ঐতিহাসিকদের মতে, আদি মল্লের উত্থান হয়েছিল স্থানীয় বাগদি বা অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের হাত ধরেই। সেই আদিবাসী জীবনের রুক্ষতা আর বন্যতার ছাপ তাঁদের শাসনব্যবস্থায় দীর্ঘকাল রয়ে গিয়েছিল। রাজকীয় আভিজাত্য থাকলেও, সিংহাসনে বসার সময় রাজাকে লোকায়ত প্রথা মেনেই রাজতিলক পরানো হত। এমনকী মল্ল রাজাদের আদি উপাস্য দেব-দেবীরাও ছিলেন মূলত অরণ্যের। প্রকৃতির পুজো, পশু বলি আর আদিবাসী লোকায়ত আচারের একটা অদ্ভুত মিশেল দেখা যেত তাঁদের দৈনন্দিন রাজকীয় রীতিতে। জঙ্গলমহলের আদিবাসীরা মল্ল রাজাদের শুধু শাসক নয়, নিজেদের লোক বলেই মনে করত। আর এই নিবিড় জনসমর্থনই ছিল মুঘলদের বিরুদ্ধে মল্লদের আসল ঢাল।
পরবর্তীতে মল্লভূম রাজবংশ শ্রীচৈতন্যের ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন। এর আগে তাঁরা শাক্ত ছিলেন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
