SIR bengal
২০শে এপ্রিল, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধনে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতির যে তত্ত্ব নির্বাচন কমিশন হাজির করেছে, তা বর্তমানে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য এক চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে এই জটিলতায় পড়ে ভোটাধিকার হারিয়েছেন প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ। প্রশাসনের এই যান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত একটি সাংবিধানিক সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে কমিশনের এক অদ্ভুত নিয়ম। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম নেই এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নতুন করে নথিপত্র যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু ডিজিটাল সফটওয়্যারের মাধ্যমে এই যাচাই প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে দেখা দেয় বিপত্তি। আমাদের দেশে বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বা স্বল্পশিক্ষিত মানুষের নথিপত্রে নামের বানানের সামঞ্জস্য থাকা প্রায় অসম্ভব। কোথাও ‘মকবুল শেখ’ হয়ে গেছেন ‘শেখ মকবুল’, আবার কোথাও ‘অনিল মুখোপাধ্যায়’ নথিতে ‘অনিল মুখার্জি’ হিসেবে চিহ্নিত। কোনো মহিলার বিয়ের আগের পদবি বর্তমান নথির সাথে না মেলায় তাকেও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সফটওয়্যারের কাছে কোনো সাংস্কৃতিক বিচারবুদ্ধি না থাকায় সামান্য বানানের হেরফেরকে ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ হিসেবে চিহ্নিত করে লক্ষ লক্ষ নাম খারিজ করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হলেও সময়ের অভাবে তারা যথাযথ বিচার করতে পারেননি। ৬ ও ৯ এপ্রিলের মধ্যে তালিকা চূড়ান্ত করার চাপে বহু আবেদনকারীর নথি কেন বাতিল হল, তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যারা চূড়ান্ত তালিকায় নেই তারা ভোট দিতে পারবেন না। যদিও ট্রাইব্যুনালে আপিলের সুযোগ রাখা হয়েছে, কিন্তু ২৭ লক্ষ আবেদনের নিষ্পত্তি করতে যে সময় লাগবে, তাতে বর্তমান নির্বাচনে ওই ভোটারদের অংশগ্রহণ অসম্ভব।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। নাম বাদ যাওয়া মানে কেবল ভোট দিতে না পারা নয়, বরং নিজের নাগরিকত্ব হারানোর আতঙ্ক। সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলোতে এই আতঙ্ক চরমে পৌঁছেছে। নথিপত্র জমা দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু কিংবা মানসিক যন্ত্রণায় আত্মহত্যার খবরও পাওয়া গেছে। তদুপরি, এই প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু ও মহিলা ভোটারদের বাদ পড়ার হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একটি যান্ত্রিক ত্রুটি এবং তড়িঘড়ি নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের কয়েক মিলিয়ন বৈধ নাগরিককে নিজের দেশেই পরবাসী করে তুলল কি না, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।