৮ই জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

ব্ল্যাক টাউন-হোয়াইট টাউন: যে কলকাতাকে ভাগ করেছিল ব্রিটিশরা

ব্ল্যাক টাউন-হোয়াইট টাউন: যে কলকাতাকে ভাগ করেছিল ব্রিটিশরা

হোয়াইট টাউন-ব্ল্যাক টাউন: ডালহৌসি স্কোয়ার ও শোভাবাজার রাজবাড়ি। ছবি - Google

ব্ল্যাক টাউন-হোয়াইট টাউন: যে কলকাতাকে ভাগ করেছিল ব্রিটিশরা

ক্ষমতা ছিল চৌরঙ্গিতে, প্রাণ ছিল শোভাবাজারে! দুই কলকাতার বিস্মৃত ইতিহাস

আজকের কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে বোঝার উপায় নেই, এই শহর এক সময় আসলে দু’টি আলাদা জগতে বিভক্ত ছিল। একটি ছিল ক্ষমতার, অন্যটি জীবনের। একটি ছিল সাহেবদের ‘হোয়াইট টাউন’, অন্যটি দেশীয়দের ‘ব্ল্যাক টাউন’। একই শহরের বুকে পাশাপাশি থেকেও যেন তারা ছিল দুই ভিন্ন পৃথিবী।

হোয়াইট টাউন

আঠারো শতকের কলকাতা দ্রুত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল। সেই সঙ্গে গড়ে উঠছিল এক অদৃশ্য প্রাচীর। ইউরোপীয় ব্যবসায়ী, সেনা ও প্রশাসনিক কর্তারা নিজেদের জন্য বেছে নিলেন শহরের দক্ষিণ ও মধ্যাংশ। চৌরঙ্গি, এসপ্ল্যানেড, ডালহৌসি স্কোয়ার এবং ফোর্ট উইলিয়াম সংলগ্ন এলাকা হয়ে উঠল তথাকথিত ‘হোয়াইট টাউন’।

সেই কলকাতার ছবি ছিল একেবারেই আলাদা। প্রশস্ত রাস্তা, সারি সারি বৃক্ষ, উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা, ইউরোপীয় ধাঁচের প্রাসাদোপম অট্টালিকা, ক্লাব, চার্চ ও সরকারি দফতর—সব মিলিয়ে যেন ব্রিটেনেরই এক টুকরো উপনিবেশ। এই অঞ্চলই ছিল প্রশাসনিক ক্ষমতা, সম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দু।

ব্ল্যাক টাউন

অন্যদিকে শহরের উত্তরাংশে স্পন্দিত হচ্ছিল এক ভিন্ন কলকাতা। শোভাবাজার, বাগবাজার, চিৎপুর, সুতানুটি, জোড়াসাঁকো কিংবা কুমোরটুলি—এই অঞ্চলগুলিই ছিল ‘ব্ল্যাক টাউন’। এখানে বাস করতেন বাঙালি, মারোয়ারি, আর্মেনীয়, চৈনিক ও অন্যান্য দেশীয় সম্প্রদায়ের মানুষ। সরু গলি, জমজমাট বাজার, পাড়াভিত্তিক জীবনযাত্রা এবং বহুবর্ণ সাংস্কৃতিক আবহে তৈরি হয়েছিল এই কলকাতার নিজস্ব চরিত্র।

আরও পড়ুন

জলাজঙ্গল থেকে রাজধানী: তিলোত্তমার অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প
যে নদী গড়েছিল কলকাতাকে, সেই নদীরই ‘মৃত্যুঘণ্টা’ কি শুনছে মহানগর?
কলকাতার রাস্তা থেকে মুছে যাচ্ছে হাতে টানা রিক্সা, স্মৃতি আর সংকটে জড়ানো শহুরে গল্প

ব্রিটিশদের চোখে ব্ল্যাক টাউন ছিল অপরিকল্পিত, অগোছালো এবং জনাকীর্ণ। বহু ইউরোপীয় পর্যটকের ভ্রমণকাহিনিতে এই অঞ্চলকে ‘নেটিভ কোয়ার্টার’ বা দেশীয়দের এলাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সেই তথাকথিত ‘অগোছালো’ এলাকাতেই জন্ম নিচ্ছিল বাংলার নবজাগরণের বীজ।

শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গোৎসব, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, বাগবাজারের নাট্যচর্চা, চিৎপুরের ছাপাখানা, কুমোরটুলির শিল্পসাধনা—সবকিছু মিলিয়ে ব্ল্যাক টাউনই হয়ে উঠেছিল কলকাতার সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। এখান থেকেই পরে উঠে এসেছেন সমাজসংস্কারক, সাহিত্যিক, শিল্পী ও শিক্ষাবিদদের এক দীর্ঘ প্রজন্ম, যাঁরা বদলে দিয়েছিলেন বাংলা ও ভারতের ইতিহাস।

আসলে কলকাতার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হয়তো এখানেই। যে অঞ্চলকে ব্রিটিশ শাসকরা ‘হোয়াইট টাউন’-এর তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করত, শেষ পর্যন্ত সেই ব্ল্যাক টাউনই গড়ে তুলেছিল শহরের প্রকৃত পরিচয়। ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল দক্ষিণে, কিন্তু আত্মার ঠিকানা ছিল উত্তরে।

আজও সেই অতীতের ছাপ স্পষ্ট। রাজভবন, রাইটার্স বিল্ডিং, সেন্ট জনস চার্চ কিংবা ময়দান ঘিরে থাকা স্থাপত্যে দেখা যায় পুরনো হোয়াইট টাউনের উত্তরাধিকার। অন্যদিকে উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ি, পাড়ার রক, পুরনো বাজার, বারোয়ারি পুজো এবং গলির সংস্কৃতি বহন করে চলেছে ব্ল্যাক টাউনের স্মৃতি।

স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরেও শহরের নগরচরিত্রে সেই বিভাজনের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। আজকের সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট এবং হেরিটেজ উত্তর কলকাতার পার্থক্যের শিকড় লুকিয়ে রয়েছে সেই ঔপনিবেশিক যুগেই।

গ্রে টাউন

কোনও কোনও ইতিহাসবিদ এই সাদা-কালো বিভাজনের মধ্যে একটি গ্রে টাউন বা ধূসর অঞ্চল চিহ্নিত করেন। মূলত বড়বাজার-বউবাজার এলাকা এর আওতায় আসে যেখানে মিশেল ঘটেছে আর্মেনীয়, পার্সি, চৈনিক, ইহুদি নান্রকম সংস্কৃতির -মুছে গেছে সাদা-কালোর বিভেদরেখা।

কলকাতার ইতিহাস তাই শুধু ইট-পাথরের শহরের ইতিহাস নয়। এটি এমন এক নগরীর কাহিনি, যেখানে পাশাপাশি বাস করত দুই কলকাতা—একটি শাসনের, অন্যটি সংস্কৃতির। আর সময়ের বিচারে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে সেই সংস্কৃতির কলকাতাই। কারণ আজও কলকাতাকে সত্যিকারের চিনতে হলে ফিরতে হয় উত্তর কলকাতার পুরনো গলি, বনেদি উঠোন আর শতবর্ষের স্মৃতির কাছে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য