

একটি কাল্পনিক দৃশ্যপট। ছবি - AI
৬ই আগস্ট, ২০২৬
প্রান্তিক মানুষ, যারা সমাজিক ক্ষমতার কাঠামোর পরিসরে নেই এবং শোষিত হন, তাঁদের এক নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে তথাকথিত বাবু সমাজ অর্থাৎ যারা ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে বিচরণ করেন, তাঁদের প্রতি প্রতিরোধেরও একটা দিক বা বৈশিষ্ট্যও গড়ে ওঠে সাব-অলটার্নদের মধ্যে (অর্থাৎ প্রান্তিকদের মধ্যে)। যেমন-
- খুচরো দু'টাকা-টা আমি ঘর থেকে নিয়ে আসব?
- দাদা বলছি তো, থাকলে দিয়ে দিতাম…
- আমার বাবা কি খুচরো ছাপায়! অটোয় ওঠার সময় খেয়াল থাকে না কাছে টাকা আছে কিনা?
মুরোদ নেই আবার বাবুগিরি দেখাচ্ছে…
- দাদা দু'টাকা খুচরোর জন্য আপনি এমন দুর্ব্যবহার করছেন!
- তোর বাবা আমায় খুচরো দিয়ে যায়?
উপরের এই যে ছোট্ট ঘটনাক্রমটা তুলে ধরা হল এমনই বা এর আশেপাশের ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই এই বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে অটোচালক ও যাত্রীদের মধ্যে ঘটে চলেছে। এখানে কে কোনও ভূমিকায় তা সহজেই আপনারা বুঝতে পারছেন।
ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে থাকা এই তথাকথিত শিক্ষিত, পরিশীলিত বাবু সমাজের কারণেই কিন্তু অটো চালক বলুন বা ওই ধরনের পেশার মানুষগুলো আজ প্রান্তিক, বঞ্চিত। এমন ধরনের উগ্র আচরণের নেপথ্য কারণ সেটাই- দীর্ঘ বঞ্চনা, শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার চিৎকার।
কিন্তু সাবঅলটার্নরা যখন ক্ষমতার কাঠামোর অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন, তখন কী হয়?
সাবঅলটার্নরা ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠলে এই লাগাতার দুর্ব্যবহার, কু-কথা, গালিগালাজের এক বিপুল বাক্যস্রোত রোজের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এখন প্রশ্ন হল, সাবঅলটার্ন-এর ক্ষমতায়নের নামে প্রতিনিয়ত এই দুর্ব্যবহার হজম করে যাওয়া আদৌ কি সম্ভব? মানুষের মন কি আদৌ এতটা যান্ত্রিক হতে পারে?
বোধহয় নয়। কারণ সহ্য তো আমরা করতে পারি না। বড়জোর আপাত শান্ত থাকতে না বোঝার ভান করি। এটাই বাস্তব সত্যি। মাত্র দুটো খুচরো টাকার জন্য অটোচালকের ওই ভয়াবহ বাক্য স্রোত, মা-বাবা টেনে গালিগালাজ… নিজে অন্যায় করেও বাইক চালকের শারীরিক হেনস্তা, এলাকার দম্ভ এগুলো স্রেফ 'ওরা তো প্রান্তিক, তাই এটুকু সহ্য করতে হবে' ভাবনা থেকে মেনে নিতে দেয় না। ফলে আপনার অজান্তেই ভেতরে ভেতরে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এর ফলে ব্যক্তিগত স্তরে মানসিক বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। এবং ক্রমশই সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই ভারতবর্ষে, এই পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক অস্থিরতা মূলত ধর্মীয় বিভাজনের আঙ্গিকে আলোচিত হয়। কিন্তু কিছু না করেও প্রতি মুহূর্তে হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের শিকার হওয়াটাও যে সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম অনুঘটক হতে পারে তা বামপন্থী তাত্ত্বিক থেকে শুরু করে পশ্চিম ঘেঁষা চিন্তাবিদ, সকলেই এড়িয়ে যান। এটা ভাবের ঘরে চুরি নয় তো?
বাংলা অর্থাৎ আজকের পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালে একটা বিষয় পরিস্কার বোঝা যাবে, যাদের সাবঅলটার্ন হিসাবে চিহ্নিত করা হয় সেই সমস্ত মানুষ, জাতিগোষ্ঠীর অবস্থান অনেকটাই বদলেছে। আর্থিকভাবে হয়ত এখনও প্রান্তিক অবস্থানেই আছেন, কিন্তু বর্তমান ক্ষমতা কাঠামোর অন্যতম নিয়ন্ত্রকই শুধু নয়, পরিচালকও হয়ে উঠেছেন তাঁরা। ফলে আদৌ এঁদেরকে সাবঅলটার্ন আর বলা যায় কিনা সেটা নিয়েই তর্ক চলতে পারে।
তবে এতে আক্ষেপের কিছু নেই। বরং বিষয়টিকে প্রকৃত অর্থে প্রগতিশীলতার একটি ফলাফল হিসাবে চিহ্নিত করা যেত। যেত, কিন্তু যাচ্ছে না। কারণ পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিকদের এই ক্ষমতায়ন ব্যতিক্রমক্ষেত্র বাদে গত দেড় দশক ধরে পুরোপুরি অনৈতিক ও অন্যায় পথে ঘটেছে।
বাংলার রাজনীতির অঙ্গনে সাবঅলটার্নদের দাপট অতীতের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। কিন্তু তা হয়েছে পুরোপুরি 'মাসল পাওয়ার' এবং দুর্নীতির উপর ভিত্তি করে। যদি সহজ এবং সৎ পথ ধরে এই উত্থান ঘটত তাহলে পরিস্থিতিটা বোধহয় এমন হত না। একটা বিষয় আমরা সকলেই জানি, যে যেমনই সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকেই আসুক না কেন, একজন দুষ্কৃতীর আচরণ দুষ্কৃতীসুলভই হয়ে থাকে। ফলে বাংলার সাবঅলটার্নদের উত্থান যদি দুষ্কর্মের পথ ধরে হয়ে থাকে তবে তাঁদের কর্মকাণ্ডে তার ছাপ থাকাটাই স্বাভাবিক। এবং সেটাই ঘটছে প্রতিনিয়ত।
সাবঅলটার্ন সংস্কৃতির নামে এক কমন অত্যাচারের ভুক্তভোগী কম বেশি সকলেই। ডিজে সাউন্ড সিস্টেম নামক ভয়ঙ্কর শব্দ দানবের তাণ্ডব। বিষয়টি প্রান্তিক শ্রেণির মধ্যেই প্রথম প্রচলিত হয়। যদিও পরবর্তীতে ধাপে ধাপে সব স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে, গ্রাস করেছে যারা সাবঅলটার্ন নয় তাদেরও। এও বিপদের আরেক প্যাটার্ন।
তা বলে কি সকল সাবঅলটার্ন বা গোটা সাবঅলটার্ন গোষ্ঠীকে দুষ্কৃতী ও অন্যায়কারী হিসাবে দাগিয়ে দিতে চাইছি? একদমই নয়। বরং অন্যান্য বহু ক্ষেত্রের মতো এই প্রান্তিক শ্রেণিরও বেশিরভাগ মানুষই অন্যায় পথ থেকে বিরত আছেন। কিন্তু তাঁদের হয়ে যে মানুষগুলি প্রতিনিধিত্ব করছেন, প্রকাশ্যে দৃশ্যমান হচ্ছেন তাঁরা একেবারে 'পচা আলু'!
প্রান্তিক মানুষের সংস্কৃতি সোচ্চার বা লাউড হবে এটাই স্বাভাবিক। তার সঙ্গে তথাকথিত ক্ষমতার বৃত্তে থাকা মানুষজনদের কোথাও কোনও বিরোধ নেই। প্রান্তিক মানুষের উত্থানে সঠিক শিক্ষার আলোকে দীক্ষিত ও ক্ষমতার বৃত্তে থাকা মানুষদের কাছে আপত্তিরকর ঠেকার কথা নয়। বড়জোর সে তার ক্ষমতা, দাপট হারানোর আশঙ্কায় শঙ্কিত হতে পারে। এর দরুন সংঘর্ষও বাঁধতে পারে উভয়ের মধ্যে। কিন্তু প্রতিরোধের সংস্কৃতির নামে ক্রমাগত নোংরা আক্রমণাত্মক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ, অত্যাচার এবং ভয়াবহ কুৎসিত ব্যবহার কিন্তু অন্যদিক ইঙ্গিত করে।
তথাকথিত প্রান্তিক শ্রেণির একাংশের বছরের পর বছর এই দুর্বিনীত আচরণ ও আক্রমণ সম্ভবপর হচ্ছে, কারণ সর্বোচ্চ ক্ষমতার পরিচালকরা আসলে তাঁদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন। এমনি এমনি প্রশ্রয় দিচ্ছেন তাও কিন্তু নয়। এই অভব্য ও দূর্বিনীত মানুষগুলিকে দিয়ে ক্ষমতার বৃত্তের শীর্ষে অবস্থানকারীরা নিজেদের অন্যায় ও অনৈতিক কাজগুলি করিয়ে নিচ্ছেন। তার বিনিময়ে এই নোংরামো করার ছাড়টুকু মিলছে। যা এক ধরনের বিকৃতিকেই ইঙ্গিত করে।
মানুষের ব্যবহার ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে। ফলে যত দিন যায় এঁরা ততই অমানুষ বা আরও সঠিকভাবে বললে নোংরা পুঁতি গন্ধময় জীব হয়ে ওঠেন।
কিন্তু বিষয়টা শুধু দুর্ব্যবহার ও তার ফলে অন্যের দুঃখ পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং প্রান্তিকদের বিপদ বাড়িয়ে প্রতিক্রিয়া হিসাবে তথাকথিত মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে এক অনভিপ্রেত জোট গড়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। আকার বিহীন এই জোট কিন্তু অটোচালোক, রিক্সা চালক, উদ্ধত বাইক চালক বা সবজি বিক্রেতা, বাসের কন্ডাক্টর, মোটবাহক ইত্যাদি প্রান্তিক মানুষদের টাইট দেওয়ার পথ ও পন্থা খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে।
দেখুন এই সমাজ যে মিথোস্ক্রিয়ায় চলে তাতে পুরোপুরি কেউ কাউকে 'টাইট' দিয়ে উঠতে পারবে না। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে পরস্পরের প্রতি বৈরী মনোভাব আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। আবারও প্রান্তিক মানুষদের প্রতি সার্বিক দুরছাই মনোভাব গড়ে উঠতে পারে ক্ষমতার বৃত্তের মধ্যগগনে থাকা মধ্যবিত্তদের মনে। আর তা যদি হয় তবে প্রমাণ হয়ে যাবে, আমরা একটুও সামনের দিকে এগোচ্ছি না, বরং দ্রুতগতিতে পিছনের পায়ে হাঁটছি।
এর অনিবার্য পরিণতি সংঘাত, হাঙ্গামার এক অস্থির ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
একটা বিষয় তো ঠিক, শ্রেণিহীন হওয়া যায়, কিন্তু সংস্কৃত বিচ্যুত হওয়া খুব কঠিন। ৬ বছরের সন্তানের সামনে অটো চালক যদি কটা খুচরো পয়সার জন্য বাবাকে অস্রাব্য গালিগালাজ করেন, তবে তা মধ্যবিত্ত কোনও বাবার পক্ষেই হজম করা সম্ভব নয়। আর এখান থেকেই শুরু হয় সাংস্কৃতিক বিপন্নতা বোধ। যা সেই বাবার মনে সমগ্র অটোচালক সমাজের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ তৈরি করবে। করবেই। এবং সেই বিদ্বেষের বীজ স্বাভাবিক প্রবণতায় তিনি চেষ্টা করবেন সন্তানের মনে রোপন করে দিয়ে যেতে।
এখনও সচেতন না হলে, অন্যায়কে অন্যায় বলে চিহ্নিত না করে সাবঅলটার্নের নামে ভুল প্রশ্রয় দিতে থাকলে পরিণতি এই পথ ধরেই এগোবে। সেখানে ভবিষ্যৎ ভয়াবহ হতে বাধ্য।।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
