

ছবি - AI
১৭ই আগস্ট, ২০২৬
রবিবারের দুপুর। গরম ভাতের পাশে বাটিতে ধোঁয়া ওঠা পাতলা মাছের ঝোল, আর তার ঠিক উপরেই ভাসছে একটা কাঁচা লঙ্কা! দৃশ্যটা ভাবলেই মৎসপ্রেমী বাঙালির জিভে জল আসতে বাধ্য। তাছাড়া ইলিশ ভাপা থেকে শুরু করে আলুভাতে কিংবা সন্ধেবেলার মুড়ি মাখানো, লঙ্কা ছাড়া বাঙালির রসনাতৃপ্তি অসম্পূর্ণ। কিন্তু এই লঙ্কা বাঙালির নিজস্ব নয়! এক বিশেষ দেশের মানুষের অবদান এই লঙ্কা।
আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছর আগের কথা। বাংলার রান্নাঘরে তখন কাঁচা লঙ্কার কোনও অস্তিত্বই ছিল না। কারণ আজকের কাঁচা লঙ্কা তখনকার বাংলায় ফলতই না।
কাঁচালঙ্কা আসার আগে এই বঙ্গে ঝাল বলতে মানুষ মূলত চিনত গোলমরিচ আর পিপুলকে। পূর্ববঙ্গের দিকে আবার চুইঝালের বেশ চল ছিল। কিন্তু সমস্যা হল, গোলমরিচ গরিবের রান্নাঘরে আসা অসম্ভব ছিল, কারণ এর ব্যাপক দাম। মূলত জমিদার বা তাদের ঘনিষ্ঠ বিত্তবানদের রান্নাঘরেই মূলত গোলমরিচের একাধিপত্য দেখা যেত। রান্নায় স্বাদ আনতে সাধারণ মানুষের ভরসা ছিল আদা, জিরে বা সর্ষের। এ যেন খানিকটা দইয়ের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো।
বিখ্যাত নাবিক কলম্বাসের একটা ভুল বাঙালির কাঁচা লঙ্কার সৌভাগ্যের দরজা খুলে দিয়েছে। কলম্বাস বেরিয়েছিলেন ভারতের মশলা, বিশেষ করে দামি গোলমরিচের খোঁজে। কিন্তু আটলান্টিকের বুকে পথ ভুল করে তিনি পৌঁছে যান আমেরিকায়। সেখানে গিয়ে তিনি এমন এক ঝাল ফলের সন্ধান পেলেন, যাকে ভুল করে গোলমরিচ বা 'পিপার' (Pepper) বলে বসলেন। সেই থেকেই এর নাম হয়ে গেল চিলি পিপার।
এরপর আরেক বিখ্যাত নাবিক ও অভিযাত্রী ভাস্কো দ্য গামার হাত ধরে পর্তুগিজ নাবিকরা যখন ভারতের পশ্চিম উপকূলে, অর্থাৎ গোয়ায় এসে পৌঁছল, তখন তাদের জাহাজের খোলে অন্যান্য জিনিসের পাশাপাশি মজুত ছিল দক্ষিণ আমেরিকার সেই ঝাল ফল। গোয়ার মাটিতে খুব দ্রুত এর চাষ শুরু হয়। স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছিল 'গোয়াই মির্চি'।
ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। গোয়া থেকে পর্তুগিজদের বাণিজ্যতরী এসে নোঙর ফেলল হুগলি নদীর মোহনা দিয়ে সপ্তগ্রাম আর ব্যান্ডেল বন্দরে। এই কাহিনী অনেকেরই জানা। পর্তুগিজরা ব্যবসার সামগ্রীর পাশাপাশি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল তাদের খাদ্যাভ্যাস আর বেশ কিছু নতুন কৃষিজ উপাদান। এভাবেই তাদের হাত ধরে দক্ষিণ আমেরিকার কাঁচালঙ্কা গোয়া হয়ে বঙ্গ দেশে এসে পৌঁছয়। বাংলার মাটিতে প্রথম লঙ্কার বীজ সম্ভবত এই হুগলি অববাহিকাতেই পোঁতা হয়েছিল।
প্রথমদিকে বাঙালি একটু সন্দেহের চোখেই দেখেছিল এই অদ্ভুত দেখতে ফলটিকে। তখনকার ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার অনুযায়ী নতুন কোনও বিদেশি সব্জিকে নিজেদের পবিত্র হেঁশেলে জায়গা দিতে মানুষ বেশ দ্বিধাবোধ করত।
একটা মজার ব্যাপার লুকিয়ে আছে লঙ্কার নামকরণে। ঐতিহাসিকদের মতে পর্তুগিজরা কাঁচালঙ্কার চারাগুলো দক্ষিণ আমেরিকা থেকে এনে প্রথম শ্রীলঙ্কায় (তৎকালীন সিলন) ব্যাপকভাবে চাষ করতে শুরু করে। সেখান থেকেই বাণিজ্যিকভাবে বাংলার বন্দরগুলোতে এর আমদানি শুরু হয়। যেহেতু সিলন বা 'রাবনের' লঙ্কা থেকে আসত, তাই সাধারণ মানুষ এর নাম দিয়ে দিয়েছিল 'লঙ্কা'।
আবার অন্য একদল ভাষাবিদ মনে করেন, রাবণের লঙ্কার মতো মুখ জ্বালিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে বলেই নাকি স্থানীয়রা এর নাম রেখেছিল 'লঙ্কা-মরিচ'।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
