১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
গোবরেই ‘গ্যাসের কারখানা’

গোবর গ্যাসে রান্না

গোবরেই ‘গ্যাসের কারখানা’

মূল বিষয়

চুলায় আগুন জ্বলছে। হাঁড়িতে ফুটছে ভাত। রান্নাঘরে ধোঁয়া নেই। সিলিন্ডারও নেই! চোখে পড়ে শুধু একটা সরু পাইপ। সেটাই ঢুকে গিয়েছে চুলার কাছে। পাইপের ভিতর দিয়ে আসছে গ্যাস। কিন্তু সেই গ্যাস কোনও সিলিন্ডার থেকে আসছে না! আসছে বাড়ির পিছনের ছোট্ট একটি ‘কারখানা’ থেকে। আর সেই কারখানার প্রধান কাঁচামাল হল গরুর গোবর।

ভুটান সীমান্তের পাহাড়ঘেঁষা মেটেলির প্রত্যন্ত আইবিল চা-বাগানের মথুরা লাইনে কৃপা হাঁসদার বাড়িতে গেলে এখন এমনই দৃশ্য দেখা যাবে। যে গ্যাসের একটি সিলিন্ডার আনতে তাঁকে ১২ কিলোমিটার দূরের বাজারে ছুটতে হত, সেই গ্যাসই এখন তৈরি হচ্ছে তাঁর বাড়ির পিছনে। গরুর গোবর আর জল মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে বায়োগ্যাস। পাইপ দিয়ে সেই গ্যাস পৌঁছে যাচ্ছে রান্নাঘরে। কৃপার হিসাব বলছে, শুধু রান্নার জ্বালানিতেই মাসে প্রায় ১২০০ টাকা সাশ্রয়। কিন্তু টাকার অঙ্কটাই এই গল্পের পুরোটা নয়।

সঙ্কটেই নতুন পথের সন্ধান

কৃপার তৈরি ছোট্ট বায়োগ্যাস প্ল্যান্টটি এখন মথুরা লাইনের আরও কয়েকটি পরিবারের সামনে একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে,  একটি বাড়িতে যদি গোবর থেকে গ্যাস তৈরি হতে পারে, তা হলে গোটা চা-বাগানের শ্রমিক লাইনে এমন ব্যবস্থা হবে না কেন? আইবিল চা-বাগানের মথুরা লাইন। এক দিকে চা-বাগানের সবুজ ঢেউ, অন্য দিকে জঙ্গল আর পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতি। শহরের সঙ্গে যোগাযোগের পথও সহজ নয়।

নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাসিন্দাদের যেতে হয় প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের চালসা বাজারে। সরকারি বাস পরিষেবা প্রায় নেই বললেই চলে। ভরসা জিপ, ট্রেকার কিংবা ভাড়ার গাড়ি। রান্নার গ্যাস আনতে গেলে সেই দুর্ভোগ আরও বাড়ে।

সিলিন্ডার নিতে যেতে হবে ডিলারের কাছে। তার পর গাড়ি ভাড়া করে ফিরতে হবে। স্থানীয়দের বক্তব্য, ভর্তি সিলিন্ডার নিয়ে ফিরতে অতিরিক্ত ২০০-২৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে যায়। গাড়ি যে জায়গায় নামিয়ে দেয়, সেখান থেকেও প্রায় এক কিলোমিটার পথ। তারপর কখনও কাঁধে। কখনও সাইকেলে। কখনও হাঁটতে হাঁটতেই। অর্থাৎ শহরের কোনও পরিবারের কাছে যে কাজটি ফোন করে কয়েক ঘণ্টায় সেরে ফেলা যায়, মথুরা লাইনে তার জন্য সময়, শ্রম এবং টাকা- তিনটিই লাগে। চা-শ্রমিকের সংসারে সেই বাড়তি খরচ বড় বোঝা।

এক সময় জ্বালানি কাঠই ছিল ভরসা। জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহ করে এনে উনুন জ্বলত। কিন্তু সেই দিনও বদলেছে। জঙ্গলে নজরদারি বেড়েছে। কাঠ সংগ্রহের উপর নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে আগের মতো সহজে জ্বালানি কাঠ পাওয়া যায় না। এক দিকে এলপিজি, দূরের এবং খরচসাপেক্ষ। অন্য দিকে কাঠ, সহজে মেলে না। তাহলে রান্না হবে কীসে?

এই প্রশ্নটাই এক দিন কৃপার মাথায় ঘুরছিল। উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাঁর চোখ পড়ল এমন এক জিনিসের দিকে, যাকে সাধারণত কেউ জ্বালানি হিসেবে ভাবেন না। গোবর। গোবর থেকে রান্নার গ্যাস তৈরি করা যায়, কৃপা আগে শুনেছিলেন। কিন্তু কী ভাবে? কত খরচ? আদৌ তাঁর মতো পরিবারের পক্ষে সম্ভব কি? উত্তর জানা ছিল না। 

আরও পড়ুন
১,১০০ বছরের শাসন, নিজস্ব ক্যালেন্ডার ছিল বাংলার এই রাজবংশের
৩০০  বছর লাহোরের পরিবারের দখলে বাংলা! শেষটা ভোটে হার দিয়ে
দেবতাকে ‘কিডন্যাপ’! বাংলায় অভাবনীয় রাজনীতি

নেপথ্যের গল্প

২০২৫ সালে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মশালায় গিয়ে সেই উত্তরই পেলেন তিনি। সেখানে দেশীয় প্রযুক্তিতে ছোট আকারের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরির পদ্ধতি দেখানো হয়। দু’জন প্রশিক্ষকের কাছ থেকে হাতে-কলমে ধারণা নেন কৃপা। তার পর নিজের বাড়ির পিছনেই শুরু করেন পরীক্ষা। একটা ডাইজেস্টার। গোবর। জল। আর একটি পাইপ। এই দিয়েই তৈরি হল তাঁর ছোট্ট ‘গ্যাসের কারখানা’।

গোবরের সঙ্গে জল মিশিয়ে বন্ধ ডাইজেস্টারে দেওয়া হয়। সেখানে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে অণুজীব জৈব পদার্থ ভাঙতে থাকে। সেই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় বায়োগ্যাস, যার প্রধান দাহ্য উপাদান মিথেন। সেই গ্যাস পাইপের মাধ্যমে পৌঁছয় রান্নার চুলায়। কৃপার ক্ষেত্রে কাঁচামালও খুব দূরের নয়। বাড়ির গরুই তা দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন গোবর ও জল মিশিয়ে প্ল্যান্টে দিতে হয়। তার পর সেই গ্যাস দিয়েই রান্না। যে গোবর এত দিন ছিল গৃহস্থালির বর্জ্য, সেটিই এখন কৃপার কাছে জ্বালানির উৎস। কৃপা হাঁসদার কথায়, ‘‘মাসে একটি রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে প্রায় ১২০০ টাকা লাগে। এই গ্যাসে রান্না করায় সেই টাকাটা বেঁচে যাচ্ছে। এখন আর এলপিজি প্রয়োজন হয় না।’’

শুধু টাকা নয়, সময়ও বাঁচছে। তাঁর কথায়, "সকাল আর সন্ধ্যায় প্ল্যান্টে গোবর ও জলের মিশ্রণ দিই। খুব তাড়াতাড়ি রান্না হয়ে যায়। দু'ঘণ্টার মধ্যে দিনের রান্না করে ফেলতে পারি।" অর্থাৎ যে রান্নার গ্যাস আনতে আগে একটা গোটা দিন প্রায় নষ্ট হয়ে যেত, এখন সেই গ্যাসই তৈরি হচ্ছে বাড়ির পিছনে।

আছে আরও উপযোগীতা

গল্প এখানেই শেষ নয়। বায়োগ্যাস তৈরি হওয়ার পরে ডাইজেস্টারে যে স্লারি থেকে যায়, সেটিও ফেলনা নয়। সেটি জৈবসার হিসাবে ব্যবহার করা যায়। ফলে একই গোবর থেকে এক দিকে রান্নার জ্বালানি, অন্য দিকে কৃষিকাজের উপযোগী সার দুই-ই পাওয়া সম্ভব, অর্থাৎ বায়োগ্যাস শুধু সিলিন্ডারের বিকল্প নয়। এটি একই সঙ্গে জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জৈবসারের একটি সম্ভাব্য সমাধান। 

এক বাড়ির রান্নাঘরের পরিবর্তন ধীরে ধীরে নজর কেড়েছে গোটা শ্রমিক লাইনে। মথুরা লাইনের বাসিন্দা সাগর খেরিয়ার কথায়, "বিষয়টি সত্যিই উপকারী। গোটা শ্রমিক মহল্লায় যদি সরকারিভাবে এই প্রকল্প চালু করা হয়, তা হলে আমরাও উপকৃত হব। বেশি দাম দিয়ে এলপিজি কিনতে হবে না। টাকা বাঁচবে।" স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য সুজাতা ডুংডুংও এই উদ্যোগের গুরুত্বের কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের ব্যবস্থা চা-শ্রমিক পরিবারের খরচ কমানোর পাশাপাশি তাঁদের আর্থিক ভাবে কিছুটা স্বনির্ভর করতে পারে। অন্য পরিবারগুলির ক্ষেত্রেও এমন প্রকল্প চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে।

গ্রামীণ এলাকায় বায়োগ্যাস ব্যবহারের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারেরও কর্মসূচি রয়েছে। তবে কোনও এলাকায় এই ব্যবস্থা বড় আকারে চালু করতে হলে শুধু প্ল্যান্ট বসালেই হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত গোবরের জোগান, নিরাপদ পাইপলাইন, সঠিক মাপের ডাইজেস্টার এবং ব্যবহারকারীদের প্রশিক্ষণ।

গরিব পরিবারের রান্নাঘরে এলপিজি পৌঁছে দিতে উজ্জ্বলা যোজনা বড় পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু সিলিন্ডার সংযোগ পাওয়া আর প্রতি মাসে নিয়মিত সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য থাকা দুই এক কথা নয়। মথুরা লাইনের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় তার সঙ্গে যুক্ত হয় আরও একটি সমস্যা- সিলিন্ডার পৌঁছবে কীভাবে? সেই জায়গাতেই গোবরের বায়োগ্যাস নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। ফলে ভুটান সীমান্তের পাহাড়ের পাদদেশে মথুরা লাইনের সেই বাড়ির পিছনে এখন আর শুধু গোবর জমে থাকে না। বরং বাড়ির পিছনের গোবরই  যেন বলছে,  ‘গ্যাস চাই? এখানেই তো আছে!’

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য