

প্রতীকী ছবি - AI
১৪ই আগস্ট, ২০২৬
অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলা। পলাশীর যুদ্ধে ছলেবলে কৌশলে ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে পরাজিত হয়েছেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা। ক্ষমতার রাশ ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। মসনদে না বসেই বাংলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে কোম্পানি। মুর্শিদাবাদ থেকে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র তখন দ্রুত সরে আসছে নব্য ঔপনিবেশিক শহর কলকাতায়। এই টালমাটাল রাজনৈতিক ও সামাজিক পালাবদলের পটভূমিতে বাংলার দুই পরাক্রমশালী ব্যক্তিত্বের মধ্যে ঘটেছিল এমন এক মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক যুদ্ধ, যা হার মানাবে যে কোনও আধুনিক থ্রিলারকেও। ঘটনাচক্রে তাঁরা দু'জনেই ছিলেন ইংরেজের বন্ধু।
একদিকে ছিলেন নদিয়ার ঐতিহ্যমণ্ডিত রাজপরিবারের অধিপতি মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। আর অন্যদিকে কলকাতার শোভাবাজার রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা, রবার্ট ক্লাইভের অত্যন্ত আস্থাভাজন দেওয়ান রাজা নবকৃষ্ণ দেব। তাঁদের দু'জনের এই দ্বৈরথের কেন্দ্রবিন্দুতে কোনও ভূখণ্ড ছিল না। জানলে অবাক হবেন গোটাটাই ছিল এক জাগ্রত দেবতাকে নিয়ে- অগ্রদ্বীপের 'গোপীনাথ'।
মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন তৎকালীন বাংলার হিন্দু সমাজের অবিসংবাদিত নেতা ও সংস্কৃতির প্রধান পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু পলাশী অধ্যায়ে ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের অন্যতম অংশ হলেও, তিনি ততটাও লাভের গুড় ঘরে তুলতে পারেননি। ফলে জীবনের শেষভাগ মোটেও সুখকর হয়নি।
মীরজাফরের পর ইংরেজরা বাংলার নবাব করেছিল মিরকাশিমকে। সেই তাঁর রোষানলে পড়ে মুঙ্গেরে বন্দিদশা কাটাতে হয় মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে। সেইসঙ্গে বিপুল আর্থিক জরিমানাও দিতে হয়। যা তাঁর রাজকোষকে কার্যত শূন্য করে দিয়েছিল। ওই অবস্থায় নদিয়ার ঐতিহ্য এবং আভিজাত্য বজায় রাখতে গিয়ে বৃদ্ধ বয়সে তিনি চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েন।
এই নিদারুণ দুঃসময়ে বাধ্য হয়ে শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেবের কাছে হাত পাতেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। নবকৃষ্ণ তখন ব্রিটিশদের আনুকূল্যে বিপুল বিত্ত ও ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর কাছ থেকে কৃষ্ণচন্দ্র ধার নেন তৎকালীন সময়ের নিরিখে এক বিপুল অর্থ- তিন লক্ষ টাকা।
সময় গড়িয়ে যায়, কিন্তু নদিয়ার রাজকোষের অবস্থা আর ফেরে না। সুদে-আসলে সেই ঋণ পাহাড়প্রমাণ আকার ধারণ করে। রাজা নবকৃষ্ণ দেব বুঝতে পারেন, কৃষ্ণচন্দ্রের পক্ষে এই বিপুল অর্থ ফেরত দেওয়া আর সম্ভব নয়। আর ঠিক এখানেই এক দুর্ধর্ষ রাজনৈতিক এবং একই সঙ্গে 'ইতর মানসিকতার' চাল চালেন কলকাতার এই উড়ে এসে জুড়ে বসা নব্য জমিদার।
নবকৃষ্ণ দেবের লক্ষ্য কেবল ওই তিন লক্ষ টাকা উদ্ধার করা ছিল না। তাঁর সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যই ছিল বাংলার হিন্দু সমাজের শীর্ষস্থানটি দখল করা। নদিয়ার রাজপরিবারের যে সুপ্রাচীন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিপত্তি ছিল, সদ্য গড়ে ওঠা শোভাবাজারের তা ছিল না। কৃষ্ণচন্দ্রের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি নবকৃষ্ণ জানতেন। তা হল নদিয়ার অগ্রদ্বীপের জাগ্রত গোপীনাথ বিগ্রহ। মহারাজা এই বিগ্রহকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন এবং এটি ছিল তাঁর আধ্যাত্মিক অহঙ্কারের অন্যতম স্তম্ভ।
নবকৃষ্ণ দেব এক গভীর রাতে নদিয়ার অগ্রদ্বীপে তাঁর বিশ্বস্ত অনুচরদের পাঠান। রাতের নিস্তব্ধতার সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে মন্দির থেকে গোপীনাথের বিগ্রহ কার্যত 'চুরি' করে নৌকাযোগে সোজা কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। পরদিন শোভাবাজার থেকে নদিয়ায় খবর যায়, তিন লক্ষ টাকা ঋণ সম্পূর্ণ মকুব করা হল। কিন্তু শর্ত একটাই, গোপীনাথ এখন থেকে চিরতরে শোভাবাজার রাজবাড়িতেই বিরাজ করবেন।
এই ঘটনা ছিল বাংলার বুকে এক নজিরবিহীন সাংস্কৃতিক ও মানসিক আঘাত। এর আগে বাংলার রাজনীতি এতটা নিচু স্তরে নেমেছিল কিনা সন্দেহ আছে! এক জমিদার ঋণ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে অন্য জমিদারের ইষ্টদেবতাকে অপহরণ করছেন, এমন ঘটনা ইতিহাসে কেবল বিরল নয়, অভাবনীয়।
অপমান, ক্ষোভ এবং শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন কৃষ্ণচন্দ্র। তিনি কিছুতেই নবকৃষ্ণের এই অন্যায্য শর্ত মেনে নেননি। নিজের ইষ্টদেবতাকে ফিরে পেতে তিনি সোজা দ্বারস্থ হন আইনের।
এই বিগ্রহ উদ্ধারের আইনি লড়াই রবার্ট ক্লাইভের দরবার ছাড়িয়ে সোজা লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েনের পর আদালত রায় দেয় যে, ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা অন্যায় এবং গোপীনাথকে অবিলম্বে নদিয়ায় মহারাজার কাছে সসম্মানে ফিরিয়ে দিতে হবে।
কিন্তু এখানেই রাজা নবকৃষ্ণ দেব এমন এক ধুরন্ধর চাল চালেন, যা তাঁকে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কূটকৌশলী, একইসঙ্গে অপরাধ প্রবণ শাসক হিসেবে প্রমাণ করে। আদালতের নির্দেশ তিনি মাথা পেতে নেন ঠিকই, কিন্তু হস্তান্তরের আগে, বাংলার শ্রেষ্ঠ ভাস্করদের দিয়ে তিনি গোপনে গোপীনাথের একটি অবিকল প্রতিমূর্তি বা 'রেপ্লিকা' তৈরি করান।
যেদিন কৃষ্ণচন্দ্রের লোকেরা বিগ্রহ নিতে আসেন, নবকৃষ্ণ তাঁদের সামনে দুটি সম্পূর্ণ অভিন্ন গোপীনাথ মূর্তি পাশাপাশি রেখে বলেন, "আপনাদের দেবতার বিগ্রহ আপনারা চিনে নিয়ে যান।"
দুটি মূর্তি এতটাই নিখুঁত এবং হুবহু এক ছিল যে, নদিয়া থেকে আসা পুরোহিত ও রাজকর্মচারীরা রীতিমতো বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কোনটি আসল আর কোনটি নকল, তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। অগত্যা তাঁরা নিজেদের বিচারবুদ্ধি মতো একটি বিগ্রহ নিয়ে নদিয়ায় ফিরে যান।
নদিয়ায় যে বিগ্রহটি ফিরে গিয়েছিল, সেটিই কি আসল গোপীনাথ? নাকি রাজা নবকৃষ্ণ দেবের নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের কাছে সেদিন হেরে গিয়েছিল নদিয়ার রাজপরিবার? শোভাবাজার রাজপরিবারের অন্দরমহলে কান পাতলে আজও শোনা যায়, আসল গোপীনাথ সেদিন কলকাতাতেই থেকে গিয়েছিলেন, আর নদিয়ায় ফিরে গিয়েছিল নবকৃষ্ণের তৈরি করা সেই নিখুঁত রেপ্লিকা।
ইতিহাসের পাতায় তিন লক্ষ টাকার এই ঋণ শুধু একটি আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকেনি; এটি পরিণত হয়েছিল বাংলার দুটি শক্তিশালী রাজপরিবারের আভিজাত্য, অহঙ্কার এবং কৌশলগত আধিপত্য প্রমাণের এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ে। রাজনীতি আর কূটনীতির এমন নিখুঁত বুনন বাংলার ইতিহাসে আজও এক প্রবল আকর্ষণীয় ও অমীমাংসিত রহস্য হয়েই রয়ে গেছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
