১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বঙ্গের সন্দেহবাতিক রাজা! ভাইদের বন্দি করে সর্বনাশ ডেকে আনেন

বঙ্গের সন্দেহবাতিক রাজা! ভাইদের বন্দি করে সর্বনাশ ডেকে আনেন

calender icon 2 ২৬শে আগস্ট, ২০২৬

মূল বিষয়

সিংহাসনের লোভ বড় অদ্ভুত জিনিস। এর মোহে আপনজনের বুকে ছুরি বসাতেও মানুষকে অহরহ দেখা গিয়েছে। ক্ষমতার অলিন্দে ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের কথা উঠলে প্রথমেই আমাদের মুঘল সাম্রাজ্যের কথা মনে পড়ে। কিন্তু তারও বহু শতক আগে, খোদ এই বাংলার বুকেই ঘটেছিল এমন এক ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত, যার ধাক্কায় প্রায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল ৪০০ বছরের পরাক্রমশালী পাল সাম্রাজ্য।

সময়টা একাদশ শতাব্দী। পাল রাজবংশের তখন কিছুটা পড়ন্ত বেলা। ঠিক সেই সময় রাজা তৃতীয় বিগ্রহপালের মৃত্যু এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সুনামি ডেকে আনে। সমসাময়িক কবি সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত ‘রামচরিতম্’ কাব্যে এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আছে।

অমূলক সন্দেহের বিষ

রাজা তৃতীয় বিগ্রহপালের তিন ছেলে ছিল। জ্যেষ্ঠ দ্বিতীয় মহীপাল, মেজো দ্বিতীয় শূরপাল এবং কনিষ্ঠ রামপাল। পাল বংশের নিয়ম অনুযায়ী বাবার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন বড় ছেলে মহীপাল। কিন্তু ক্ষমতা পেলেও তাঁর মনে শান্তি ছিল না। কারণ তিনি ছিলেন অদ্ভুত এক হীনম্মন্যতা আর সন্দেহবাতিকের শিকার। প্রজাদের কাছেও জনপ্রিয় ছিলেন না।

অন্যদিকে, ছোট ভাই রামপাল ছিলেন একেবারে অন্য ধাতুতে গড়া। যেমন তাঁর রূপ, তেমনই তাঁর শৌর্য। প্রজাদের কাছে তিনি ছিলেন চোখের মণি। দরবারের আনাচে-কানাচে কান পাতলেই শোনা যেত, রামপালের মধ্যে নাকি পাল বংশের এক মহান সম্রাট লুকিয়ে আছেন। এমনকি জ্যোতিষীরাও ভবিষ্যদ্বাণী করে বসেছিলেন, রামপালের হাতেই পাল সাম্রাজ্যের বিস্তার লেখা আছে! এদিকে মেজ ভাই শূরপাল বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী না হলেও দাদার মতো সন্দেহবাদিক ছিলেন না। তাঁকেও প্রজারা ভালোবাসত।

ব্যাস, আর যায় কোথায়! এই কথাগুলো তিরের মতো বিঁধতে থাকল সন্দেহবাতিক রাজা মহীপালের বুকে। পাশাপাশি তিনি ছিলেন অত্যন্ত দাম্ভিক ও চাটুকার পরিবেষ্টিত এক শাসক। পাল সাম্রাজ্যের সফল ও অভিজ্ঞ মন্ত্রীদের পরামর্শ শোনার অভ্যেস তাঁর ছিল না। সিংহাসন হারানোর কাল্পনিক ভয়ে তিনি এক হঠকারী সিদ্ধান্ত নেন। কোন‌ও প্রমাণ ছাড়াই, স্রেফ সন্দেহের বশে আপন দুই ভাই শূরপাল ও রামপালকে পায়ে-হাতে লোহার বেড়ি পরিয়ে অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করেন মহীপাল।

ধেয়ে এল প্রলয়

মহীপাল ভেবেছিলেন, ভাইদের বন্দি করে তিনি নিশ্চিন্ত। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, আপন ভাইদের শেকল পরিয়ে তিনি আসলে পুরো সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত করেছেন।

তাঁর এই স্বৈরাচারী আচরণে রাজদরবারের অভিজ্ঞ মন্ত্রীরা হতাশ হন। যার প্রভাব পড়ে সাম্রাজ্যের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে। আর যে সমস্ত সামন্ত রাজাদের উপর পাল সাম্রাজ্য দাঁড়িয়ে ছিল, তাঁরা ব্যাপক ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কারণ, রামপালকে তাঁরা সকলেই ভালোবাসতেন। পাল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের এই টালমাটাল অবস্থা আর শীর্ষস্থরে এই অবিশ্বাসের সুযোগ নিল উত্তরবঙ্গ বা বরেন্দ্রভূমির কৈবর্তরা। এই বরেন্দ্র অঞ্চল‌ই ছিল পালদের আদি বাসস্থান বা বাসভূমি।

আরও পড়ুন
এক বিয়েতেই ছারখার ব্রাহ্ম সমাজ!
ভারতে প্রথম জীবাণু অস্ত্রে ভাইকে মেরেছিল বঙ্গেরই এক জমিদার!
বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার জগৎ শেঠের করুণ পতন

পালদেরই এক উচ্চপদস্থ সামন্ত বা রাজকর্মচারী দিব্যর (দিব্বোক) নেতৃত্বে শুরু হল এক বিশাল গণ-বিদ্রোহ। ইতিহাসে যা ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। কৈবর্ত অর্থাৎ জেলে বা নৌকার মাঝি। তারাই এই বিদ্রোহের মূল কাণ্ডারী ছিলেন।

দ্বিতীয় মহীপালের পতন

বিদ্রোহের আগুন যখন পালদের রাজধানী পর্যন্ত পৌঁছানোর উপক্রম, মহীপাল তখন‌ও তাঁর অহঙ্কারের স্বর্গে বসে। প্রবীণ মন্ত্রীরা তাঁকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তাঁরা বললেন, "মহারাজ, বিদ্রোহীরা এখন উন্মত্ত এবং সংখ্যায় অনেক। আমাদের সৈন্যবল এখন দুর্বল। আপাতত কিছুদিন অপেক্ষা করুন। মিত্রদের সাহায্য নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করে তারপর আঘাত হানা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।"

কিন্তু কে শোনে কার কথা! ভাইদের বিনা অপরাধে বন্দি করে মহীপালের দম্ভ তখন আকাশ ছুঁয়েছে। অভিজ্ঞ মন্ত্রীদের পরামর্শকে কাপুরুষতা বলে তাচ্ছিল্য করেন। কোন‌ও পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই, অত্যন্ত ছোট একটি বাহিনী নিয়ে তিনি উন্মত্ত কৈবর্ত বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।

ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছিল। দিব্যর সুসংগঠিত বাহিনীর সামনে মহীপালের ওই ছোট সৈন্যদল খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। যুদ্ধক্ষেত্রেই নির্মমভাবে নিহত হন দাম্ভিক দ্বিতীয় মহীপাল। তাঁর এই হঠকারিতার ফলে পালরা তাঁদের আদি বাসভূমি, প্রাণপ্রিয় বরেন্দ্র অঞ্চলের অধিকার চিরতরে হারান।

ফিনিক্সের মতো রামপালের উত্থান

মহীপালের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য জুড়ে চরম অরাজকতা দেখা দেয়। সেই সুযোগে কারারক্ষীদের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যান শূরপাল ও রামপাল। কিছুদিন পর শূরপালের মৃত্যু হয় (অনেকের মতে তিনি খুব অল্প সময়ের জন্য রাজা হয়েছিলেন)। তখন পুরো পাল বংশের দায়ভার এসে পড়ে রামপালের কাঁধে।

এদিকে রামপাল এক বিচিত্র অবস্থায় রাজা হন। তাঁর না ছিল রাজধানী, না ছিল সেনাবাহিনী! পিতৃভূমি তখন কৈবর্তদের দখলে। এই চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে রামপাল যা করেছিলেন, তা আজকের দিনের যে কোনও ঝানু রাজনীতিককে চমকে দেবে। তিনি তরবারির চেয়ে কূটনীতিকে বেশি গুরুত্ব দেন।

বাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হাজির হতে থাকেন তিনি। বিভিন্ন স্বাধীন ও আধা-স্বাধীন সামন্ত রাজাদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সাহায্য ভিক্ষা করেন। কাউকে বিপুল সম্পদের প্রতিশ্রুতি, কাউকে জমি প্রদানের আশ্বাস দেন। তাঁর এই অসামান্য ব্যক্তিত্ব এবং কূটনীতির জোরে মোট ১৪ জন প্রধান সামন্ত রাজা নিজেদের সৈন্যবাহিনী নিয়ে রামপালের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

রাষ্ট্রকূট বংশীয় আত্মীয় শিবরাজের সাহায্যে রামপাল গঙ্গা পার হয়ে কৈবর্ত রাজা ভীমকে (দিব্যর উত্তরসূরি) আক্রমণ করেন। এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধে ভীম পরাজিত ও নিহত হন। নিজের হারানো পিতৃভূমি বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করে রামপাল গড়ে তোলেন নতুন রাজধানী 'রামাবতী'।

এই ভাবেই দ্বিতীয় মহিপালের ও প্রশাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে রামপালের হাত ধরে আর‌ও কিছুদিনের জন্য অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল পাল সাম্রাজ্য।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য