

জগৎ শেঠের মুর্শিদাবাদের বাড়ি। ছবি - Google
২৪শে আগস্ট, ২০২৬
১৭৪২ সাল। বাংলার ঝলমলে আকাশে সহসা দুর্যোগের ঘনঘটা। সাইক্লোনের মতো আছড়ে পড়ে মারাঠা বর্গিদের আক্রমণ। ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে বর্গি সেনাদের দস্যু বাহিনী তৎকালীন বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করে শহরের সবচেয়ে ধনী প্রাসাদটিতে চড়াও হল। লুট হল তৎকালীন হিসেবে প্রায় আড়াই কোটি টাকার নগদ সম্পদ ও সোনাদানা! যা আজকের দিনের হিসেবে কয়েক হাজার কোটি টাকার সমান।
যে কোনও সাধারণ রাজকোষ বা সাম্রাজ্য এত বড় ধাক্কার মুখে পড়লে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু জগৎ শেঠদের তাতেও যেন খুব একটা কিছু এল গেল না। বরং আশ্চর্যের বিষয়, এই বিপুল লুটের ঠিক পরপরই বাংলার তৎকালীন নবাব আলিবর্দি খাঁ মারাঠা বাহিনীকে বাংলা থেকে খেদিয়ে দেওয়ার জন্য যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাঁর কোষাগারে তখন অর্থের তীব্র সঙ্কট। এই সময় বরাবরের মতো উদ্ধারকর্তা হয়ে এগিয়ে আসেন জগত শেঠ। তার কদিন আগেই মারাঠারা তাদের বিপুল লুট করলেও নবাব আলিবর্দি খাঁ'কে যুদ্ধের খরচ বাবদ কয়েক লক্ষ টাকা অনুদান দিতে তাদের অসুবিধা হয়নি।
এক্ষেত্রে সবার প্রথম মাথায় রাখতে হবে জগৎ শেঠ কোনও রাজা বা সম্রাট ছিলেন না। এমনকি তিনি নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তিও ছিলেন না! আসলে একটি নির্দিষ্ট মাড়োয়ারি পরিবারের যখন যে প্রধান থাকতেন, তিনিই জগৎ শেঠ নামে পরিচিত হতেন। এই পরিবারই হয়ে উঠেছিলেন তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বা একেবারে প্রথম সারির ধনী। কিন্তু কীভাবে?
জগৎ শেঠ আসলে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম নয়, এটি ছিল একটি রাজকীয় উপাধি। এই পরিবারটির শিকড় ছিল রাজস্থানের মরুশহর নাগৌরে। তাঁরা ছিলেন মূলত জৈন মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের মানুষ। ব্যবসায়িক সততা, মিতব্যয়িতা এবং জৈন ধর্মের কঠোর রীতিনীতি ছিল তাঁদের পারিবারিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।
১৬৫২ সালে ভাগ্যান্বেষণে রাজস্থান ছেড়ে বিহারের পাটনায় এসে প্রথম 'গদি' বা মহাজনি কারবার শুরু করেন হীরানন্দ সাহু। তবে এই পরিবারের ভাগ্যের চাকা ব্যাপকভাবে ছুটতে শুরু করে হীরানন্দের ছেলে মাণিকচাঁদের হাত ধরে। তিনি প্রথমে পাটনা থেকে ঢাকা যান। এরপর বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র সাথে তিনি চলে আসেন নতুন রাজধানী মুর্শিদাবাদে। ওই সময়ই বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে আজকের মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
মুর্শিদকুলি খাঁ'র সাথে মাণিকচাঁদের ছিল গভীর বন্ধুত্ব। একসময় এই বন্ধুত্ব এমন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণে পরিণত হয়, যা গোটা ভারতবর্ষের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল।
কীভাবে রাতারাতি এত বিপুল সম্পত্তির মালিক হল এই মাড়োয়ারি পরিবার? এর পেছনে আসলে কোনও জাদু ছিল না, ছিল নিখুঁত এবং তৎকালীন সময়ের নিরিখে নতুন এক অর্থনৈতিক মডেল- 'হুন্ডি'।
সেই সময় গরুর গাড়ি বা নৌকায় করে এক শহর থেকে অন্য শহরে নগদ সোনা বা রুপো নিয়ে যাওয়া ছিল রীতিমতো প্রাণঘাতী প্রচেষ্টা। যে কোনও সাম্রাজ্যের রাজধানী ছাড়িয়ে কিছুটা দূরে গেলেই চোর, ডাকাত, বর্গি ইত্যাদির আক্রমণে সর্বস্বান্ত হওয়া তো বটেই এমনকি প্রাণ হারানোর ভয় থাকত। এই অবস্থায় বিপুল অর্থ বা সোনাদানা অন্যত্র পাঠানোটা মুর্খামি ছাড়া আর কিছু ছিল না। সম্রাট-নবাব থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের এই ঝুঁকিটাই নতুন এবং অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায়িক সম্ভাবনা হিসেবে লুফে নেন মাণিকচাঁদ।
এই নতুন ব্যবসায়িক ব্যবস্থায় নবাব বা জমিদাররা মুর্শিদাবাদে জগৎ শেঠদের গদি বা কুঠিতে গিয়ে নগদ টাকা জমা করতেন। বিনিময়ে শেঠরা একটি গোপন সংকেতযুক্ত কাগজ বা 'হুন্ডি' দিতেন। সেই কাগজ নিয়ে দিল্লিতে অবস্থিত জগৎ শেঠদের শাখায় দেখালেই হুন্ডি মূল্যের অর্থ পেয়ে যেতেন। এর বিনিময়ে যে অর্থ পাঠানো হতো তার ২.৫-৫% কমিশন বাবদ জগৎ শেঠরা কেটে নিত।
আজকের দিনে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় যে 'পে-অর্ডার' বা 'বিল অফ এক্সচেঞ্জ' বহুল রূপে প্রচলিত, তাল আদিম রূপটি ছিল এই হুন্ডি ব্যবস্থা। তবে এখনকার মত তো তখন কোনও নির্দিষ্ট আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না। ফলে গোটা বিষয়টাই টিকে ছিল বিশ্বাসের উপর। আর মুর্শিদাবাদের জগৎ শেঠরা আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি বজায় রাখার প্রশ্নে চূড়ান্ত ভরসা জায়গা হয়ে উঠেছিল সকলের কাছে।
রাজস্থান থেকে সুরাট, পাটনা থেকে দিল্লি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল জগৎ শেঠদের এই হুন্ডি ব্যবস্থার কুঠির জাল। আর এই টাকা স্থানান্তরের জন্য তাঁরা যে বিপুল 'বাট্টা' বা কমিশন পেতেন, তাতেই ফুলেফেঁপে উঠতে থাকে তাঁদের কোষাগার। এমনকি মস্কোতেও তাদের এই নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছিল।
তৎকালীন বিশ্বে জগৎ শেঠদের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যটি ছিল রাষ্ট্রের সমান্তরাল এক অর্থনীতি তৈরি করা। বাংলায় নবাবের কোষাগার বলে আদতে কিছু ছিল না; নবাবের যাবতীয় রাজস্ব জমা পড়ত জগৎ শেঠের গদিতে।
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে 'পুণ্যাহ' উৎসবে। বছরে একদিন বাংলার সমস্ত জমিদার নবাবের দরবারে রাজস্ব জমা দিতে আসতেন। সেটাই ছিল এই পুণ্যাহ উৎসব। কিন্তু খরা বা মহামারিতে অনেক জমিদারের পক্ষেই নবাবের রাজস্ব মেটানো সম্ভব হত না। তখন ত্রাতা হয়ে দেখা দিতেন জগৎ শেঠ। তাঁরা জমিদারদের চড়া সুদে ঋণ দিতেন এবং সেই টাকাই নবাবের কোষাগারে জমা পড়ত। অর্থাৎ, নবাবের রাজকোষ ভরানোর মূল জোগানদার ছিলেন তাঁরাই, আবার জমিদারদের আজীবন ঋণের ফাঁদে আটকে ফেলার চাবিকাঠিও ছিল তাঁদেরই হাতে।
আরও চমকপ্রদ ব্যাপার হল, মুর্শিদাবাদের নবাবের টাঁকশাল ছিল জগৎ শেঠদের নিজস্ব সম্পত্তি! ব্রিটিশ বা ফরাসি বণিকরা বাণিজ্য করতে এলে তাঁদের আনা বিদেশি রুপো গলাতে হত জগৎ শেঠদের এই টাঁকশালেই। একচেটিয়া ক্ষমতার জোরে জগৎ শেঠরা ইচ্ছেমত মুদ্রার বিনিময় হার বা 'বাট্টা' নির্ধারণ করতেন।
১৭১৭ সালে মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়ার ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে এক বিশেষ ফরমান জারি করে নিজস্ব মুদ্রা তৈরির অধিকার দিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলার মাটিতে সেই ফরমান স্রেফ এক টুকরো মূল্যহীন কাগজে পরিণত হয়েছিল।
মুদ্রা তৈরির উপর একচেটিয়া অধিকার বজায় রাখতে জগৎ শেঠ বাংলার নবাবকে বুঝিয়েছিলেন, ব্রিটিশরা মুদ্রা তৈরির অধিকার পেলে বাংলার অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। এর ফলস্বরূপ, স্বয়ং মুঘল সম্রাটের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশরা সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। বাংলার নবাব জগৎ শেঠের পরামর্শে সেই অধিকার ইংরেজদের দেননি। বিশ্বের ইতিহাসে কোনও ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাবে খোদ সম্রাটের নির্দেশ বাতিল হয়ে যাওয়ার এমন নজির সত্যিই বিরল।
ইতিহাসবিদ ও আধুনিক অর্থনীতিবিদদের মতে, ১৭২০-এর দশকে জগৎ শেঠদের মোট সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি (প্রায় ৮৩ লক্ষ কোটি টাকা)।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদদের নথিতে উল্লেখ আছে, সেই সময় ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড (Bank of England) সহ ইংল্যান্ডের সকল ব্যাঙ্কের মোট মূলধনের চেয়েও জগৎ শেঠদের ব্যক্তিগত মূলধন অনেক বেশি ছিল। ইউরোপের বিখ্যাত ব্যাঙ্কার রথসচাইল্ড বা মেডিসি পরিবারও রাজা-মহারাজাদের ঋণ দিত। কিন্তু কোনও দেশের সরকারি টাঁকশাল ও রাজস্ব ব্যবস্থার একচেটিয়া মালিকানা তারা কখনওই পায়নি, যা জগৎ শেঠরা পেয়েছিলেন।
আলিবর্দি খাঁ মারা যাওয়ার পর সিরাজ-উদ-দৌলা নবাব হলে তাঁর সঙ্গে জগৎ শেঠদের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। তাই সিরাজকে সরাতে ব্রিটিশ ও বাংলার অন্যান্য জমিদারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পলাশির ষড়যন্ত্র রচনার মূল নেপথ্য কাণ্ডারী ছিল এই জগৎ শেঠরা। সিরাজ পতনের মূল ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেছিলেন এই পরিবারের তৎকালীন প্রধান মহতাব চাঁদ। কিন্তু যে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁদের শিখরে তুলেছিল, সেটাই পতন ডেকে আনে। একাধিক কারণ পরবর্তী কিছু সময়ের মধ্যে এই অতি প্রভাবশালী পরিবারের নাম ইতিহাস থেকে কার্যত মুছে দেয়।
১৭৬৩ সালে বাংলার স্বাধীনচেতা নবাব মির কাশিম এই পরিবারের কফিনে প্রথম সবচেয়ে জোরদার পেরেকটা পোঁতেন। বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি হিসেবে তৎকালীন জগৎ শেঠ মহতাব চাঁদ এবং স্বরূপ চাঁদকে বন্দি করেন মির কাশিম। এরপর বিহারের মুঙ্গের দুর্গ থেকে গঙ্গার জলে ছুঁড়ে ফেলে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল!
সিরাজকে পলাশির যুদ্ধে পরাজিত করে ব্রিটিশরা বাংলার ক্ষমতা পুরোপুরি দখল করার পর টাঁকশাল ও কোষাগারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। ফলে জগৎ শেঠদের প্রয়োজন অনেকটাই ফুরিয়ে যায়। সেই সঙ্গে ব্রিটিশরা তাদের থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ পুরনো ঋণ কখনওই শোধ করেনি। সেটাও এই পরিবারের উপর বিপুল পরিমাণ আর্থিক ধাক্কা নিয়ে এসেছিল।
মহতাব চাঁদের পর ১৮ বছর বয়সী উত্তরাধিকারী কুশল চাঁদ জগৎ শেঠের ব্যবসা সামলাতে চরমভাবে ব্যর্থ হন। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ও ১৯০০ সালের মধ্যে একসময়ের বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এই পরিবারটি সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এভাবেই জগৎ শেঠরা ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
