

কলকাতার রাস্তার নামগুলো পুরো বদলে যাবে? ছবি - Google
১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
"লাশকাটা ঘরে
সেই ক্লান্তি নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের পরে।"
জীবনানন্দ দাশ তাঁর "আট বছর আগের একদিন" কবিতায় এই লাইনগুলো লিখে গিয়েছেন। আজকের ভারতীয় রাজনীতির অবস্থা কতটা এমনই। ওই লাশকাটা ঘরের মতো। রাজনীতিবিদরা বোধহীন লাশ হয়ে সেখানে শুধু হাজিরই আছেন। কী করছেন, কেন করছেন আজকাল আর কেউ ভাবে বলে মনে হয় না।
বহু অভিযোগ, প্রমাণিত ও অপমানিত দুর্নীতির পর্বত সমান ঘটনা, এক অন্ধকার সময়, আবার সামাজিক আর্থিক সুরক্ষার প্রশ্নে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য- সবমিলিয়ে ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার বাংলার বুকে এক ধরনের স্থবিরতা এনে দিয়েছিল। সেই চাকা গত মে মাসেই ঘুরেছে। অনেক পরিচিত সমীকরণ, বাঙালি অস্মিতার ভাবনা- অনেক কিছুকেই নস্যাৎ করে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে, একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কিছু বিতর্কিত ভূমিকার পিঠে সওয়ার হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। তারপর চার মাস কেটে গিয়েছে।
সদ্য শাসন ক্ষমতায় আসা একটি সরকারের বা শাসক পক্ষের পারফরম্যান্স বিচার করা বা তাদের নাম্বার দেওয়ার জন্য চার মাস সত্যিই বড্ড কম সময়। এত অল্প সময়ে শত সদিচ্ছা থাকলেও বিশাল কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলা যেমন সম্ভব নয়, তেমনই গোড়া থেকেই ভুল পথে হাঁটা শুরু করলেও এত অল্প সময়ে বিপুল বিপর্যয়ও ডেকে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু শাসকপক্ষের অভিমুখ কোন দিকে, তার একটা আন্দাজ পাওয়ার জন্য চার মাস আবার খুব একটাও কম সময়ও নয়।
প্রথমবারের জন্য পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকার গত চার মাসে রাস্তাঘাটের নাম পরিবর্তন নিয়ে হল্লা জুড়ে দেওয়া, নিরামিষ না আমিষ ভালো সেই নিয়ে বকধার্মিক বিতর্কের জন্ম দেওয়া এবং ডিম্বাস্ত্র প্রয়োগের পর্ব পেরিয়ে সত্যি ও মিথ্যে মামলায় বিরোধীদের উপর খড়্গস্থ হয়ে ওঠা- এই পথেই মোটামুটি সময়টা কাটিয়ে চলেছে।
বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর থেকেই তাদের কর্মী সমর্থকদের একটা বিরাট অংশ বিভিন্ন রাস্তার নাম বদল, তাদের মতাদর্শ বিরোধী বিভিন্ন মনীষীদের মূর্তি সরিয়ে ফেলা বা ভেঙে ফেলার দাবিতে বেশ সোচ্চার। সেই দাবিতে সরকারের পক্ষ থেকেও নীতিগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যে ভারত সেবাশ্রম সংঘের বিতর্কিত সন্ন্যাসী কার্তিক মহারাজের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি পরামর্শদাতা কমিটি গঠন করেছে রাজ্য সরকার। এই কমিটিতে অন্যতম সদস্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা মেঘালয়ের প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়'ও আছেন।
বিজেপি কর্মী-সমর্থক, চিন্তাবিদদের দাবি- বিদেশি কমিউনিস্ট নেতাদের নামে যেসব রাস্তার নাম আছে, সেগুলো পরিবর্তন করতে হবে। তথাগত রায়ের গলাতেও তারই প্রতিধ্বনি উঠে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, সম্ভবত দুর্গাপুজো মিটে গেলেই এই কমিটি প্রথম বৈঠকে বসবে। সেই সূত্র ধরেই কলকাতার কার্ল মার্ক্স সরণি, লেনিন সরণি ও হো চি মিন সরণি, এই তিন কমিউনিস্ট নেতার নামে নামাঙ্কিত রাস্তা নাম বদল যে ঘটবে তা এক প্রকার নিশ্চিত বলা যায়।
তথাগত রায়ের মতো প্রবীণ শিক্ষিত বিজেপি নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মী সমর্থক, তাঁদের সকলেরই মূল যুক্তি হল- এইসব ভিনদেশি কমিউনিস্ট নেতাদের ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন বা তার পরবর্তী ভারতবর্ষ গঠনের পিছনে কোনও অবদান নেই। তাই এদের নামে কোনও রাস্তা বা জায়গার নামকরণ থাকলে সেগুলো বদলে ফেলে ভারতের নিজস্ব কোনও কৃতি সন্তানের নামে তার নামকরণ করতে হবে।
কিন্তু বিজেপির পক্ষ থেকে এই যে যুক্তিটা দেওয়া হচ্ছে, তা গোটা বিশ্বের চিন্তাভাবনার মানদণ্ডের নিরিখে খুবই অসাড়। বড়ই বালখিল্য সুলভ। কারণ কাল মার্কস, ভ্লাদিমির লেনিন'রা বিদেশি হয়েও এই দেশে যথেষ্ট স্বীকৃতি পেয়েছেন। ঠিক তেমনভাবেই আমাদের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধি বা বাংলার ভক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ শ্রীচৈতন্যদেব- তাঁদের নামাঙ্কিত রাস্তা, মূর্তি পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
এই পৃথিবীতে যে ব্যক্তির নামে তাঁর নিজের দেশ ছাড়াও অন্যান্য দেশে সবচেয়ে বেশি রাস্তা ও মূর্তি আছে, তিনি হলেন মহাত্মা গান্ধি। রাশিয়ার মতো দেশে শ্রীচৈতন্যদেবের মূর্তি আছে। ফলে বিজেপি ও তাদের সমর্থকদের এই যুক্তি যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, রাশিয়া মতো দেশগুলোয় মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত রাস্তা ও মূর্তি থাকাটাও সঠিক কাজ নয়। কারণ আমেরিকা বা রাশিয়ার সমাজজীবনে মহাত্মা গান্ধির সরাসরি কোনও ভূমিকা নেই।
এখানেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে মহাত্মা গান্ধিকে অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো এত সম্মান-শ্রদ্ধা করছে কেন? এর উত্তর হল- মতাদর্শ। গান্ধির শান্তি ও হিংসা না করার মতাদর্শ আজ পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রনায়করা অত্যন্ত শিক্ষনীয় ও যুগোপযোগী বলে মনে করছেন। শ্রীচৈতন্যদেবের ক্ষেত্রেও বিষয়টা তাই। রাশিয়ায় অনেকে শ্রীচৈতন্যদেবের বাণীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে বৈষ্ণব হয়েছেন। অর্থাৎ শ্রীচৈতন্যদেবের মতবাদ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানুষকে শান্তি খুঁজে নিতে সাহায্য করছে। ঠিক এই যুক্তিতেই বিশ্ববন্দিত কমিউনিস্ট মৃতদের নামে রাস্তা বা বিভিন্ন জায়গার নামকরণ করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, কমিউনিস্ট মতাদর্শে এই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ উদ্বুদ্ধ ছিল।
শুধু মতাদর্শের মধ্য দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উদ্বুদ্ধ করাই নয়, বরং এই দেশের পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে যে বিদেশি রাষ্ট্রনায়করা প্রথম কথা বলেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ভ্লাদিমির ইলিয়ানভ লেনিন, যোশেফ স্তালিনরা আছেন। শুধু তাই নয় লেনিন, স্তালিনদের হাত ধরে গড়ে ওঠা সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের পায়ের তলার জমি শক্ত করে তাকে সাবালক হয়ে উঠতে প্রভূতভাবে সাহায্য করেছে।
এই দেশের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, আইআইটি থেকে শুরু করে প্রথম পর্যায়ের যাবতীয় ভারী শিল্প-কারখানা এবং আজও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রতিরক্ষার অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে এই লেনিনদের রাশিয়াই ভারতের সবচেয়ে বড় সহযোগী। সুতরাং অবদানের কথা বললে প্রত্যক্ষ হোক বা পরোক্ষ, এনাদের ভূমিকাও যথেষ্ট মাত্রায় আছে।
দেশ গঠনে অমুকের ভূমিকা, আছে তমুকের ভূমিকা নেই। এই বিতর্ক আসলে এক বিপজ্জনক প্রবণতার দিকে আমাদের নিয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ঠক বাছতে গাঁ উজার হওয়ার ষোলআনা সম্ভাবনা থেকে যায়। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পর এসে সেই বিতর্ক খুঁচিয়ে তোলার পরিবর্তে সহিষ্ণুতার সঙ্গে সব অবস্থান ও মতাদর্শগত তর্কের মধ্য দিয়ে দেশ ও জাতি গঠন আজকের ভারতের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে খুব জরুরি।
কিন্তু তা না করে শাসকপক্ষের ভূমিকা যদি রাস্তা বা জায়গার নাম পাল্টানোর দিকেই নিবদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে তার সঙ্গে আগের শাসকপক্ষের গণহারে সব কিছু নীল-সাদা রং করে দেওয়ার আর বিশেষ পার্থক্য থাকে না। ঠিক যেমন ৩৪ বছরের বাম জমানার মধ্যবর্তী পর্যায়ের পর থেকে সব কিছুর মধ্যেই দলীয় বাছ বিচার ও মাতব্বরি ছিল করাল ব্যাধি।
এই ভারতীয় উপমহাদেশে যে কয়টি দেশ আছে, কম বেশি তার সবগুলোতেই রাজনীতিবিদদের একটি অংশ কাজের থেকে অকাজ করাকে বেশি প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। তাই মানুষের জনসমর্থনে প্রাপ্ত গুরুদায়িত্বের মর্যাদা না করে তাঁরা নামধাম বদলকেই পরম কর্তব্য হিসেবে ঠাওরে নেন। এই বাংলার হাজার হাজার কিলোমিটার বেহাল রাস্তার চিরস্থায়ী মানোন্নয়ন ঘটনোর দিকে কারোর নজর থাকে না।
এই যেমন বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমানের নামে থাকা ঢাকা বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে শাহ জালাল করে দিয়েছিলেন। তাছাড়া বহু রাস্তাঘাট থেকে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার নাম মুছেছেন তিনি। আর সবকিছুতে তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের নাম ঢুকিয়ে গিয়েছেন। হাসিনার শেষ পর্যায়ে বছরগুলোতে পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে ছিল, যে দেখলে মনে হবে গোটা দেশটাই মুজিব পরিবার। ওরা ছাড়া আর কেউ নেই, কিচ্ছু নেই, আর কারোর কোনও অবদান নেই!
অভ্যুত্থানে হাসিনার ক্ষমতা হারানোর পর মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে তারেক রহমানের বিএনপি সরকারের আমলেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। এবার সবকিছু থেকে মুজিবর রহমানের নাম বাদ দেওয়া, তার মূর্তি ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই উপমহাদেশে বিভেদের বিষাক্ত বীজ কেন চিরস্থায়ী, তার উত্তর এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে। সেই সঙ্গে যতটা সম্ভব বিভিন্ন জায়গায় জিয়া পরিবারের সদস্যদের নাম ঢুকিয়ে দিচ্ছে!
তথাগত রায়ের কথা থেকে একটা বিষয় পরিস্কার, বিজেপির নিচুতলার কর্মী সমর্থকদের আবেগকে মর্যাদা দিয়ে ভিনদেশি কমিউনিস্ট নেতাদের নামে থাকা রাস্তার নাম বদলের বিষয়টি আর কিছু মাসের মধ্যেই মোটামুটি ঘটতে দেখা যাবে। এক্ষেত্রে মার্ক্স বা লেনিনের নামে রাস্তা সরকারি নথিতে আর না থাকলেও বামেদের ক্ষতির থেকে লাভই হবে বেশি। কারণ এইটা শুধু কলকাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে তা ভাবাটা ভুল হবে। জেলাতেও একই ঘটনা ঘটবে বলেই মনে হয়।
প্রথম কথা, রাস্তার নাম মুছে দিয়ে মানুষের মন থেকে কাউকে মুছে ফেলা যায় না। এমনিতেই এই জায়গাগুলোর এতদিনের চলে আসা নাম হঠাৎ করে সরকার বদলে দিলেও মানুষের মুখে মুখে পুরানো নাম'ই সাধারণত ঘুরতে থাকবে। তাছাড়া বিষয়টিকে হাতিয়ার করে এই রাজ্যে বামেরা তাদের সমর্থককুলকে অনেক বেশি একজোট করে তুলতে সক্ষম হবে বলেই মনে হয়। বিষয়টিকে অনেক ভালোভাবে তারা মতাদর্শগত লড়াইয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারবে।
অবশ্য বিজেপি পরিচালিত সরকারের নাম পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া বা যে উদ্যোগ, সেটাও এক ধরনের মতাদর্শগত অবস্থান। তারা সবকিছু থেকেই কমিউনিস্টদের মুছে ফেলতে চায়। এখন সময়ই বলবে শেষ বিচারে কাদের মতাদর্শ জয়দ্ধজা উপরের তুলে ধরবে। আর কারা লাশকাটা ঘরের লাশের মতো বোধহীন বলে পরিচিত হবেন!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
