

মানব মস্তিষস্ক দুটি আলাদা এবং স্বাধীন স্নায়ুতন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত। ছবি - Google
প্রথাগত বিজ্ঞানের ধারণা বদলে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা দেখিয়েছেন মানব মস্তিষ্ক একটিমাত্র প্রোজেনিটর কোষ থেকে তৈরি নয়, বরং ফোরব্রেন-মিডব্রেন এবং হাইন্ডব্রেন দুটি আলাদা কোষের গোষ্ঠী থেকে বিকশিত হয়েছে। প্রায় ৫৫-৬০ কোটি বছরের পুরোনো এই বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে গবেষণাগারে সফলভাবে হাইন্ডব্রেনের মোটর নিউরন তৈরি সম্ভব হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ALS এবং SMA-এর মতো মারণ স্নায়ুরোগের উন্নত চিকিৎসা ও নতুন ঔষধ আবিষ্কারের পথ সহজ করবে।
মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে শত শত বছর ধরে চলে আসা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ধারণা পুরোপুরি বদলে দিয়েছেন গবেষকেরা। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক যুগান্তকারী গবেষণায় উঠে এসেছে এক অবাক করা তথ্য—মানব মস্তিষ্ক আদতে কোনও একক বা একটিমাত্র অঙ্গ নয়, বরং এটি দুটি আলাদা এবং স্বাধীন স্নায়ুতন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত। প্রাচীন বিবর্তনের ধারায় এই দুটি আলাদা অংশ একসঙ্গে মিলে বর্তমানের এই জটিল অঙ্গটি তৈরি করেছে।
এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে ভ্রূণ গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে একটিমাত্র মূল বা কমন প্রোজেনিটর কোষ (Progenitor Cell) থেকেই পুরো মস্তিষ্ক বিকশিত হয়। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের প্রতিটি অংশই একটি সাধারণ উৎস থেকে শাখা-প্রশাখার মতো ছড়িয়ে পড়েছে বলেই এতদিন মনে করা হতো। কিন্তু স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশ বা গ্যাস্ট্রুলেশন (Gastrulation) দশা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখিয়েছেন যে ধারণাটি ভুল। তারা আবিষ্কার করেছেন যে মস্তিষ্কের সামনের অংশ এবং পেছনের অংশ সম্পূর্ণ আলাদা ও পৃথক দুটি কোষের গোষ্ঠী থেকে তৈরি হয়, যা একে অপরের সঙ্গে কখনো মিশে যায় না।
আমাদের পূর্ণাঙ্গ মস্তিষ্ক মূলত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত—ফোরব্রেন (Forebrain), মিডব্রেন (Midbrain) এবং হাইন্ডব্রেন (Hindbrain)। এর মধ্যে সামনের অংশ অর্থাৎ ফোরব্রেন এবং মিডব্রেন আমাদের উচ্চতর চিন্তা-ভাবনা, ভাষা জ্ঞান, চেতনা ও বিমূর্ত যুক্তির মতো বিষয়গুলো পরিচালনা করে। অন্যদিকে, পেছনের দিকে অবস্থিত হাইন্ডব্রেন বা ব্রেনস্টেম আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি অবচেতন কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের হার্টবিট ঠিক রাখা, নিয়মিত শ্বাসপ্রশ্বাস চালানো, ঘুম ও জাগরণের চক্র নিয়ন্ত্রণ এবং বিপাকীয় ক্রিয়া বজায় রাখতে এই হাইন্ডব্রেন মূখ্য ভূমিকা পালন করে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই দুই অংশের কোষের ডিএনএ প্যাকেজিং বা ক্রোমাটিন কনফিগারেশনও সম্পূর্ণ আলাদা, যা তাদের জন্ম থেকেই ভিন্ন ট্র্যাজেকটরিতে আবদ্ধ রাখে।
বিজ্ঞানীরা এই দুই অংশের উৎস খুঁজতে গিয়ে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন বছর বা তারও বেশি পেছনের বিবর্তনের ইতিহাসে চোখ রেখেছিলেন। তারা দেখেন যে মুরগি, জেব্রাফিশ এমনকি সমুদ্রের তলদেশের জেলিফিশ বা একর্ন ওয়ার্মের মতো আদিম প্রাণীদের মধ্যেও এই দুই ভাগে বিভক্ত স্নায়ুতন্ত্রের অস্তিত্ব রয়েছে। জেলিফিশের যেমন শরীরের দুই প্রান্তে আলাদা স্নায়ুতন্ত্র থাকে, ঠিক তেমনই কোটি কোটি বছর আগে বিবর্তনের ধাক্কায় দুটি আলাদা স্নায়ুতন্ত্র পাশাপাশি এসে আজকের এই আধুনিক মানব মস্তিষ্ক গড়ে তুলেছে।
মস্তিষ্কের এই দুই অংশ আলাদা হওয়ার আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছে। এতদিন ল্যাবরেটরিতে মানুষের হাইন্ডব্রেনের বা ব্রেনস্টেমের নিউরন তৈরি করা বিজ্ঞানীদের কাছে অসম্ভব ঠেকেছিল, কারণ তারা ফোরব্রেনের কোষগুলোকে হাইন্ডব্রেনে রূপান্তর করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু এখন এই পৃথক উৎসের বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ায় গবেষকরা সফলভাবে পরীক্ষাগারে মানুষের হাইন্ডব্রেনের মোটর নিউরন তৈরি করতে পেরেছেন। এর ফলে অ্যামিওট্রেফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস (ALS) এবং স্পিনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফি (SMA)-এর মতো মারাত্মক ও অবক্ষয়ী রোগগুলোর চিকিৎসা ও ওষুধ আবিষ্কারের পথ অনেক সুগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
