

ছানার ব্যবহার এই বাংলায় একসময় ছিল ব্রাত্য। ছবি - Google.
১লা অক্টোবর, ২০২৬
বৈদিক যুগে দুধ ছিল অমৃত ও দেবতার নৈবেদ্য। প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, অম্ল বা টক দিয়ে দুধ কাটালে তা ‘নষ্ট’ বা ‘বিকৃত’ হয়ে যায়—যার নাম ছিল ‘ছেঁড়া দুধ’।
• দেবকর্মের অযোগ্য: শাস্ত্রমতে নষ্ট দুধ বা ছানা দেবতাদের নিবেদন করা ছিল চরম পাপ।
• সন্দেশের আদি রূপ: তখন সন্দেশ তৈরি হতো বেসন, চালের গুঁড়ো, নারকেল, খোয়া ক্ষীর বা গুড় দিয়ে; তাতে ছানার কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
গরম ভাত আর কষা মাংসের পর শেষপাতে যদি ধবধবে স্পঞ্জ রসগোল্লা কিংবা সন্দেশে মোলায়েম কামড় না পড়ে, বাঙালির খাওয়াটাই যে জমে না! মিষ্টির বেলায় বাঙালি আবার ভীষণ শুচিবায়ুগ্রস্ত—টেক্সচার হতে হবে মাখনের মতো নরম, মিষ্টি হবে ব্যালান্সড, আর উপাদান? অবশ্যই খাঁটি ছানা। অথচ ভাবুন তো, এই যে ছানার মিষ্টিকে আমরা কালচারাল আইডেন্টিটি বানিয়ে বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে ঘুরি, খাদ্য-ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে কিন্তু এরই আগেকার অস্বস্তিকর সত্যি সামনে আসবে। যে ছানা নিয়ে আমাদের এত আদিখ্যেতা, এই বাংলাতেই কয়েকশো বছর আগে সেটা তৈরি করা ছিল ‘পাপ’!
সময় যে কীভাবে ঘুরে আসে, ধরতেই পারবেন না! কাল যে খারাপ ছিল, আজ সে হয়তো ভাল। আবার পরশু যে মন্দ হবে, এখন দেখবেন হয়তো তারই সেরা সময় চলছে। বাঙালির মিষ্টির নেপথ্যেও রয়েছে এমনই এক অস্বস্তিকর অধ্যায়, জানেন কী? এই ধরুন ছানার জিলিপি কিংবা, মাখা সন্দেশ... কী? জিভে জল চলে এল তো? উঁহু... কয়েক যুগ আগেও বিষয়টা সহজ ছিল না। যে ছানার মিষ্টিকে আমরা এখন কালচারাল আইডেন্টিটি বানিয়ে বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে ঘুরি, খাদ্য-ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে কিন্তু এরই আগেকার এক ভয়াবহ সত্যি সামনে আসবে। কারণ, এই বাংলার বুকে এক সময়ে ছানা কাটানোই যে ছিল ‘পাপ’! কেমন করে সেখান থেকে এত পথ হাঁটল বাংলার মিষ্টি? ব্রাত্য ‘ছেঁড়া দুধ’ কীভাবে বাঙালির অন্দরমহল থেকে ঠাকুরের সিংহাসনেও জায়গা করে নিল? চলুন, একটু টাইম ট্রাভেল করে আসা যাক।
ব্যাপারটা বুঝতে হলে প্রাচীন ভারতের দর্শন এবং মনঃস্তত্ত্ব বুঝতে হবে। দুধ ছিল দেবতার সাক্ষাৎ আশীর্বাদ, পবিত্রতার প্রতীক। গোমাতা পূজনীয়, আর তাঁর দুধ স্বয়ং অমৃত। বৈদিক নিয়ম অনুযায়ী, দুধ যদি নিজে থেকে গেঁজে দই বা ঘোল হতো, তবে আপত্তি ছিল না—তা ছিল শুদ্ধ। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে টক বা অ্যাসিড ফেলে সেই নিখুঁত জিনিসটাকে নষ্ট করা? নৈব নৈব চ! সেটা ছিল চরম পাপ।
মজার বিষয় হল, সংস্কৃত ‘ছিন্ন’ শব্দ থেকেই এসেছে এ যুগের ‘ছানা’। মানে যা কাটা, ছিন্নভিন্ন বা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে মন্দিরের ভোগ কিংবা কুলীনদের ভোজে ছানার প্রবেশাধিকার ছিল পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তাহলে ভাবছেন তো...সেই যুগে বাঙালি মিষ্টিমুখ করত কী দিয়ে? কেন! ছিল যে ক্ষীর, চাঁচি, নারকেল কোড়া, তিল আর চালের গুঁড়োর পিঠেপুলি। প্রাচীন কাব্যে যে ‘সন্দেশ’-এর কথা শুনি, ওটা কিন্তু আজকের নরম তুলতুলে সন্দেশ নয়; সে সব ছিল শুকনো নিরেট ক্ষীর আর চিনির কড়া পাকের এক ম্যাড়ম্যাড়ে মণ্ড।
ছকভাঙা নাটকের ক্লাইম্যাক্স শুরু হল ষোড়শ শতকে। হুগলি আর সপ্তগ্রামের জলপথে এসে ভিড়ল পর্তুগিজ বণিক আর জলদস্যুরা। এ দেশে তো আস্তানা গাড়লই, কিন্তু সাহেবদের রসনা তৃপ্ত হবে কীসে? তারা ইউরোপের কটেজ চিজ ছাড়া বাঁচতে পারে না। দুধ কাটিয়ে চিজ বানানোর টেকনিক তাদের নখদর্পণে ছিল। তারা স্থানীয় গোয়ালাদের ওপর হুকুম জারি করল লেবুর রস আর টক জল দিয়ে দুধ ফাটাতে। তৈরি হল আজকের বিখ্যাত ‘ব্যান্ডেল চিজ’।
এদিকে চারপাশের গোঁড়া সমাজ তখন রে-রে করে উঠেছে—ছিঃ ছিঃ, অশুচি ফিরিঙ্গিরা এসে পবিত্র দুধ নষ্ট করে দিল! কিন্তু সমাজের ফতোয়া একদিকে, আর খাঁটি কারিগরের জহুরি চোখ অন্যদিকে। হুগলি আর সপ্তগ্রামের স্থানীয় ময়রাদের চোখ চকচক করে উঠল। তারা লক্ষ্য করল, ক্ষীরের মতো ভারী জিনিসের চেয়ে এই ফাটা দুধ বা ছানার চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। অসম্ভব ফ্লেক্সিবল, সফট, আর চিনির রস নিজের ভেতর শুষে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রাখে। ব্যস, গোপনে শুরু হলো রসায়ন। রক্ষণশীল চোখরাঙানি এড়িয়ে ময়রাদের হাত ধরে ছানা পৌঁছে গেল আমজনতার প্লেটে।

ইতিমধ্যে নদিয়া ও কলকাতার ময়রাদের হাতে গোপনে ছানার সঙ্গে গুড় ও চিনি মিশিয়ে কড়াপাক-নরমপাকের পরীক্ষা শুরু হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে গুপ্তিপাড়া ও শান্তিপুরের ময়রাদের হাত ধরে ছানার সন্দেশ ঘরে ঘরে ঢুকতে শুরু করে। আর উনিশ শতকে যখন বাগবাজারের নবীনচন্দ্র দাস ফুটন্ত রসে তুলতুলে ছানার গোলা ভাসিয়ে স্পঞ্জ রসগোল্লা বানালেন, তখন সব ধর্মীয় ছুৎমার্গ ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল।
অচ্ছুত ‘ছেঁড়া দুধ’ এভাবে পর্তুগিজদের হাত ধরে ও বাঙালি ময়রাদের কারসাজিতে বদলে হয়ে উঠল বাঙালির সবচেয়ে বড় জিআই-ট্যাগ পাওয়া গর্ব।
উনিশ শতকে ব্রিটিশদের হাত ধরে যখন কলকাতা জমজমাট, তখন বাবুদের বৈঠকখানায় নিত্যনতুন চমক দেওয়ার কম্পিটিশন শুরু হলো। হুগলি থেকে বাক্সপ্যাঁটরা বেঁধে কলকাতায় এলেন ভীমচন্দ্র নাগ। ছানার পাক আর চিনির সুষম অনুপাত মিলিয়ে তৈরি হলো কাঁচাগোল্লা, তালশাঁস, মনোহরা।

তবে সবচেয়ে বড় মাস্টারস্ট্রোকটা মারলেন ১৮৬৮ সালে, বাগবাজারের এক জেদি তরুণ ময়রা—নবীনচন্দ্র দাস। এর আগের মিষ্টি ছিল ভাজা কিংবা শুকনো। নবীনবাবু ছানার সুষম গোলক বানিয়ে ফুটন্ত চিনির রসে সেদ্ধ করে ফেললেন। জন্ম নিল স্পঞ্জ ‘রসগোল্লা’। পুরো গেমটাই বদলে গেল! পরে তাঁর সুযোগ্য পুত্র কে. সি. দাস আবিষ্কার করলেন রসমালাই, আর মিষ্টি টিনজাত করে বিদেশে রপ্তানি করে জাত মারার ভয়কে চিরতরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বদলে দিলেন।
যে ছানাকে একদিন ‘অশুচি’ বলে মন্দিরের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল, আজ সেই ছানার মিষ্টি ছাড়া বাঙালির দুর্গাপূজা বা জগন্নাথের ৫৬ ভোগ ভাবাই যায় না। কৃষ্ণনগরের সরভাজা থেকে শুরু করে নাটোরের কাঁচাগোল্লা—এই পুরো জার্নিটা আসলে শুধুই ডেজার্টের ইতিহাস নয়; এটা হল বাঙালির নিষিদ্ধ ফলের স্বাদ নিয়ে তাকে শিল্পের পর্যায়ে তোলার এক দুর্দান্ত সাংস্কৃতিক অ্যাডাপ্টেশনের গল্প! যদিও, গল্প হলেও, বুঝতেই পারছেন, খাঁটি ছানার মতোই সত্যি!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।
