১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বিতর্ক, নীতি আর সততা: বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রয়াণদিবসে বিশেষ শ্রদ্ধা

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ছবি - Google

বিতর্ক, নীতি আর সততা: বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রয়াণদিবসে বিশেষ শ্রদ্ধা

ক্ষমতার শীর্ষ ছুঁয়েও এক নিঃসঙ্গ চিলেকোঠায় ফিরে আসা, আর আদ্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপনে নিজের আদর্শকে আগলে রাখা রাষ্ট্রনায়কের সংখ্যা আধুনিক ইতিহাসে বিরল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিলেন সেই বিরল ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বদের একজন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইপো হিসেবে সাহিত্য ও রাজনৈতিক চেতনার উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন তিনি। সংবেদনশীল মনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কালজয়ী সাহিত্যের অনুরাগী পাঠক, মায়াকোভস্কির অনুবাদক—সব মিলিয়ে বিতর্ক ও সম্মান যাঁর জীবনে হেঁটেছে হাত ধরাধরি করে।

রাজনৈতিক সূচনার বর্ণময় সময়

১৯৪৪ সালের ১ মার্চ উত্তর কলকাতায় জন্ম বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের। শৈলেন্দ্র সরকার স্কুল থেকে পাঠ শেষ করে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে, পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৬ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-তে যোগ দেন এবং খাদ্য আন্দোলন ও ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা নেন। এই সময় থেকেই ছয়ের দশকের এই যুবনেতার পথচলা শুরু। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি ডেমোক্রেটিক যুব ফেডারেশনের (ডিওয়াইএফআই) রাজ্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রমোদ দাশগুপ্ত যাঁদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য গড়ে তুলেছিলেন, সেই পাঁচ নবীন নেতার অন্যতম ছিলেন বুদ্ধদেব। পরবর্তীতে জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে তাঁকে গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন প্রমোদ দাশগুপ্ত।

১৯৭৭ সালে কাশীপুর কেন্দ্র থেকে জিতে প্রথমবার বিধানসভার সদস্য হন এবং মাত্র ৩৬ বছর বয়সে প্রথম বামফ্রন্ট সরকারে তথ্য ও জনসংযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৮২ সালে পরাজিত হলেও, ১৯৮৭ সালে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে জিতে পুনরায় মন্ত্রিসভায় ফেরেন। তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি বীরভূম, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর থেকে উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত সংগঠনের কাজে রাজ্য চষে ফেলেন তিনি।

ইস্তফা, নন্দনের আড্ডা ও প্রত্যাবর্তন

রাজনীতির পথ সর্বদা মসৃণ ছিল না। ১৯৯৩ সালের মাঝামাঝি জ্যোতি বসুর সঙ্গে নীতিগত মতভেদের কারণে মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দেন বুদ্ধদেব। সরকারি গাড়ি ছেড়ে দিয়ে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন মহাকরণ ও আলিমুদ্দিন থেকে। তৎকালীন সময়ে তাঁর সন্ধ্যা কাটত নন্দনের তিনতলায় সত্যজিৎ রায় আর্কাইভের ছোট একটি ঘরে। দুধ-চিনি ছাড়া চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে সিনেমার প্রুফ দেখা, নতুন বই পড়া কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আড্ডায় মেতে থাকাই ছিল তাঁর তখনকার কাজ।

তবে এই দূরত্ব বেশিদিন টেকেনি। ১৯৯৬ সালে বামফ্রন্ট সরকার পুনরায় ক্ষমতায় এলে জ্যোতি বসুর শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ দপ্তরের মতো গুরুদায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় বুদ্ধদেবের কাঁধে। ১৯৯৯ সালে তিনি উপ-মুখ্যমন্ত্রী হন এবং ২০০০ সালের নভেম্বরে জ্যোতি বসু পদত্যাগ করলে পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

‘ব্র্যান্ড বুদ্ধ’ ও নতুন দিগন্তের সূচনা

আরও পড়ুন
সাবঅলটার্ন সংস্কৃতির নামে বাংলায় মগের মুলুক?
নেতাজির অমর্যাদার নেপথ্যের চক্রান্ত
বাংলার এই গ্রামে লুকিয়ে ছিলেন ভগৎ সিং

দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ার ভয়াবহ বন্যার সময় কনভয় থামিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে নিজের ভিন্ন প্রশাসনিক শৈলীর পরিচয় দেন। ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী হাওয়াকে তুচ্ছ করে বামফ্রন্টকে জয়ে নেতৃত্ব দেন। ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা এই 'ভদ্রলোক' রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতিশ্রুতি ছিল রাজ্যের শিল্প ও অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ। তাঁর জমানাতেই শুরু হয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতির সংস্কার, যার ফলে এই খাতে অভাবনীয় ৭০% বৃদ্ধি ঘটে। তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পপতি আজিম প্রেমজি তাঁকে দেশের অন্যতম সেরা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। সংবাদমাধ্যমে প্রবর্তিত হয় নতুন শব্দ বন্ধনী—‘ব্র্যান্ড বুদ্ধ’।

২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবার ক্ষমতায় আসে বামফ্রন্ট। শপথগ্রহণের দিনই তিনি সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের ১ লাখ টাকার ন্যানো গাড়ি প্রকল্পের ঘোষণা দেন। তাঁর স্লোগান ছিল- "কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ"।

শিল্পায়ন, সংকট ও নন্দীগ্রামের ক্ষত

কিন্তু দ্রুত শিল্পায়নের এই উদ্যোগ ও ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াতেই লুকিয়ে ছিল রাজনীতির বাঁক বদল। ছোট ও প্রান্তিক চাষিদের মধ্যে জমি হারানোর আশঙ্কা তীব্র হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখা যায়, ১৯৬০ থেকে ১৯৯০ সময়কালে ভারতের জিডিপিতে পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু আয়ের অনুপাত ১২৭.৫% থেকে কমে ৮২.৪%-এ নেমে এসেছিল। ১৯৯০-এর দশকে তা কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও বুদ্ধদেবের জমানায় শিল্পায়ন পূর্ণতা পাওয়ার আগেই বাধা পায়। সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। ২০ বছর পর আজ পিছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, তীব্র মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও সিঙ্গুরের জমির বাজারদর সেভাবে বাড়েনি এবং কর্মসংস্থানের সংকট তীব্রতর হয়েছে।

২০০৭ সালের ১৪ই মার্চ নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণ কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে ১৪ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়। সেদিন বিধানসভায় দাঁড়িয়ে ও পরবর্তীতে প্রকাশ্য সভায় এই ঘটনার সম্পূর্ণ দায় নিজের কাঁধে নেন বুদ্ধদেব। এরপর সেপ্টেম্বর ২০০৭-এ রিজওয়ানুর রহমানের রহস্যমৃত্যু এবং তসলিমা নাসরিনের রাজ্য ত্যাগ- সব মিলিয়ে মধ্যবিত্ত ও সংখ্যালঘু সমাজ সরকারের থেকে দূরে সরতে থাকে। ২০০৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচনে একের পর এক ধাক্কা খায় বামফ্রন্ট।

পরাজয়, নির্জন বাস ও জীবনাবসান

২০১১ সালের ঐতিহাসিক বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের পতন ঘটে এবং যাদবপুর কেন্দ্রে তৎকালীন প্রাক্তন আমলা মণীশ গুপ্তের কাছে পরাজিত হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এই পরাজয়ের পর ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। চোখের দৃষ্টি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বাড়তে থাকে। দলীয় কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি। ২০১৯ সালে ব্রিগেডের সমাবেশে তাঁর শেষ সংক্ষিপ্ত জনসমক্ষে উপস্থিতি ছিল।

পদ্মভূষণ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে তিনি পুনরায় নিজের আদর্শিক অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। শেষ আট বছরেরও বেশি সময় তিনি কাটান সম্পূর্ণ জনসমক্ষে না এসে, প্রচ্ছন্ন গৃহবন্দী অবস্থায়। ২ কামরার পাম অ্যাভিনিউয়ের সরকারি ফ্ল্যাটটিই ছিল তাঁর চিরকালের ঠিকানা। ৮ আগস্ট, ২০২৪ সালে তিনি এই সাধারণ ঘরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

রাজনৈতিক জয়-পরাজয়, সিদ্ধান্ত ও ভুলভ্রান্তির উর্ধ্বে উঠে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রেখে গেছেন এক অমলিন ব্যক্তিগত সততার নজির। তাঁর সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে ক্ষমতার কালির দাগ কোনদিন লাগেনি। সময় প্রমাণ করেছে, একটি পোস্ট-অ্যাগ্রারিয়ান অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরির জন্য তাঁর নেওয়া উদ্যোগ কতটা সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিল, যদিও তা বাস্তবায়নে রাজনীতির মারপ্যাঁচে হেরে যেতে হয়েছিল এই তাঁকে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য