

প্রতীকী ছবি - AI
১৯শে আগস্ট, ২০২৬
রাজ্যাভিষেক। এই শব্দটা শুনলেই ভারতীয় সমাজের যে কারোর চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল এক জাঁকজমকপূর্ণ দরবার, মন্ত্রোচ্চারণ আর নতুন রাজার মাথায় মুকুট পরিয়ে দেওয়ার দৃশ্য। এই দেশের রাজতান্ত্রিক ইতিহাসে সাধারণত রাজপুরোহিত বা পূর্বতন রাজাই এই অভিষেকের মূল দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু উত্তরবঙ্গের ইতিহাসে কান পাতলে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও প্রবল ব্যতিক্রমী প্রথার কথা শোনা যায়।
প্রথাটি ছিল হল- কোচবিহারের মহারাজার রাজ্যাভিষেক সম্পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত বৈকুণ্ঠপুরের রাইকত নিজে হাতে মহারাজার মাথার উপর রাজছত্র ধারণ করছেন।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্যের রাজাকে অন্য একটি সমান্তরাল রাজপরিবারের প্রধানের হাত থেকে মুকুট ও রাজছত্র নিতে হচ্ছে এমন অদ্ভুত এবং শর্তসাপেক্ষ রাজ্যাভিষেকের প্রথা রীতিমতো বিরল।
এই প্রবল ব্যতিক্রমী রাজ্যাভিষেক প্রথার শিকড় লুকিয়ে আছে কোচ সাম্রাজ্যের একেবারে গোড়ার দিকের ইতিহাসে। ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে কোচ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা বিশ্ব সিংহের রাজ্যাভিষেকের সময় তাঁর সৎ ভাই শিষ্য সিংহ (বা শিব সিংহ) পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে দাদার মাথায় রাজছত্র ধরেছিলেন। ভাইয়ের এই আনুগত্যে মুগ্ধ হয়ে বিশ্ব সিংহ তাঁকে রাজ্যের প্রধান সেনাপতি এবং রক্ষক নিযুক্ত করেন। তাঁকে উপাধি দেওয়া হয় 'রাইকত', যার অর্থ দুর্গের রক্ষক বা পরিবারের প্রধান। সেই সঙ্গে তাঁকে বৈকুণ্ঠপুর (বর্তমান জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ি সংলগ্ন অঞ্চল) এস্টেটের শাসনভার দেওয়া হয়।
সেদিন থেকেই নিয়ম হয়ে যায়, কোচবিহারের রাজবংশে যখনই কোনও নতুন রাজা সিংহাসনে বসবেন, বৈকুণ্ঠপুরের রাইকত এসে তাঁর মাথার উপর রাজছত্র ধরবেন। তবেই সেই কোচ রাজার রাজ্যাভিষেক আইনি ও প্রথাগত বৈধতা পাবে। শুরুর দিকে এটি ছিল দুই ভাইয়ের বংশধরদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও ঐক্যের প্রতীক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথাই হয়ে দাঁড়ায় দুই পরিবারের মধ্যে টানাপোড়ের ও বিভেদের কারণ হিসেবে।
ক্ষমতা বড় অদ্ভুত জিনিস। কয়েক দশকের মধ্যেই কোচবিহার রাজবংশের মূল শাখা যখন ক্রমশ দুর্বল হতে শুরু করে, তখন বৈকুণ্ঠপুরের রাইকতেরা কার্যত স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁরা ক্রমশ একটি স্বাধীন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে থাকেন।
এই সম্পর্কে প্রথম বড়সড় ফাটল ধরে ১৬২১ সাল নাগাদ। মহারাজা লক্ষ্মীনারায়ণের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র বীরনারায়ণের কোচবিহারের সিংহাসনে রাজ্যাভিষেকের সময় বৈকুণ্ঠপুরের তৎকালীন শাসক মাহিদেব রাইকত সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি বীরনারায়ণের মাথায় রাজছত্র ধরবেন না এবং কোচবিহারকে আর কোনও বার্ষিক করও দেবেন না।
এটা নিছক কোনও পারিবারিক অভিমান ছিল না। রাজছত্র ধরতে অস্বীকার করাটা ছিল রাইকতদের তরফ থেকে কোচবিহারের আধিপত্যকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা এবং বৈকুণ্ঠপুরের পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করার এক নিখুঁত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাল। রাজ্যাভিষেকের মতো পবিত্র মঞ্চকে ব্যবহার করে এমন রাজনৈতিক বিদ্রোহের নজির ইতিহাসে সত্যিই খুব বেশি নেই।
মজার ব্যাপার হল, ছত্র-প্রথাকে কেন্দ্র করে রাইকতেরা শুধু যে বয়কট করেছিলেন তা নয়, পরবর্তীকালে এই প্রথাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা কোচবিহারের 'কিংমেকার' বা ভাগ্যবিধাতাও হয়ে উঠেছিলেন।
১৬৮০ সালের কথা। কোচবিহার তখন চরম অরাজকতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। রাজা মদন নারায়ণের মৃত্যুর পর সরাসরি কোচবিহার আক্রমণ করে দুর্ধর্ষ ভুটিয়া বাহিনী। এই চরম বিপদের দিনে কোচবিহারের অস্তিত্ব যখন প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে, তখন বৈকুণ্ঠপুরের রাইকত যজ্ঞদেব এবং ভুজদেব নিজেদের বিশাল বাহিনী নিয়ে কোচবিহারে প্রবেশ করেন এবং প্রবল যুদ্ধ করে ভুটিয়াদের বিতাড়িত করেন।
ভুটিয়াদের তাড়ানোর পর রাইকতেরা রাজপরিবারের সন্তান বাসুদেব নারায়ণকে সিংহাসনে বসান এবং সেই পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনে নিজেদের হাতে বাসুদেবের মাথায় রাজছত্র ধারণ করেন। এর দুই বছর পর ভুটিয়ারা ফের আক্রমণ করে কোচ রাজা বাসুদেব নারায়ণকে হত্যা করলে, রাইকতেরা ফের আসরে নামে। তারা মহেন্দ্র নারায়ণকে সিংহাসনে বসিয়ে পুনরায় রাজছত্র ধরে।
অর্থাৎ, একসময় যে রাজছত্র রাইকতরা ছুড়ে ফেলেছিলেন স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য, সেই রাজছত্রকেই তাঁরা আবার তুলে নিলেন নিজেদের পছন্দের রাজাকে সিংহাসনে বসিয়ে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করার উদ্দেশ্যে।
কোচবিহারের রাজছত্র এবং বৈকুণ্ঠপুরের রাইকতদের এই টানাপোড়েন নিছক কোনও পারিবারিক বিবাদ ছিল না। এটি ছিল উত্তরবঙ্গের বুকে দুই প্রবল পরাক্রমশালী ক্ষমতার নীরব পেশী প্রদর্শন। একটা সাধারণ ছাতা যে কীভাবে কয়েক শতাব্দী ধরে একটা আস্ত ভূখণ্ডের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তা উত্তরবঙ্গের এই ইতিহাস আমাদের শিখিয়ে যায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
