

প্রতীকী ছবি - AI
১৩ই আগস্ট, ২০২৬
বৌদ্ধ ধর্মানুসারী পাল রাজবংশের পতন এবং সেন রাজবংশের উত্থানের সাথে সাথে বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছিল। 'কৌলীন্য প্রথা'-র হাত ধরে এক ধরনের তীব্র ভেদাভেদ এই সময়ে মহামারীর আকার ধারণ করেছিল।
সেন বংশের প্রথম রাজা বল্লাল সেন সমাজের গুণীজনদের মর্যাদা দেওয়ার নামে এই কৌলীন্য প্রথা শুরু করেছিলেন। পরবর্তী কয়েক শতকে এটি বাংলার সমাজ জীবনে এক ভয়াবহ অভিশাপে পরিণত হয়। এর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিণতি ছিল বহুবিবাহের মহামারী এবং চরম সামাজিক ভেদাভেদ।
বল্লাল সেনের আমলে কৌলীন্য প্রথা গুণের উপর ভিত্তি করে প্রচলন হলেও, তাঁর পুত্র রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বকালে (দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগ) এবং বিশেষত চতুর্দশ শতাব্দীতে ঘটকদের (যেমন দেবীবর ঘটক) নিয়মানুসারে এটি সম্পূর্ণ একটি বংশানুক্রমিক প্রথায় পরিণত হয় এবং অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে। দেবীবর ঘটক কুলীনদের মধ্যে 'মেল প্রথা' চালু করেন, যার ফলে বহুবিবাহ প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
এই বহুবিবাহের মহামারী মূলত সমাজের উচ্চবর্ণ, বিশেষ করে রাঢ়ীয় ও বারেন্দ্র কুলীন ব্রাহ্মণ এবং কিছুটা হলেও কুলীন কায়স্থদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ওই সময়কালে বাংলায় বহুবিবাহের প্রথা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ ছিল-
'স্ববংশে বিবাহ' বা মর্যাদা রক্ষার তাগিদ: কৌলীন্যের নিয়ম অনুযায়ী, একজন কুলীন ব্রাহ্মণের কন্যাকে অবশ্যই একজন কুলীন পাত্রের সাথেই বিবাহ দিতে হত। যদি কোনও কুলীন তার কন্যাকে 'ভঙ্গ কুলীন' (যাঁরা কৌলীন্য হারিয়েছেন) বা নিচু বংশে বিয়ে দিতেন, তবে ওই পরিবারের কৌলীন্য চিরতরে নষ্ট হয়ে যেত। এর ফলস্বরূপ কুলীন পরিবারের বিবাহিত ছেলেদের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে কুলীন বাবারা একপ্রকার সামাজিকভাবে বাধ্য হয়ে পড়েছিলেন।
পাত্রের আকাল ও পাত্রীর প্রাচুর্য: কুলীন পাত্রের সংখ্যা সমাজে ছিল সীমিত, কিন্তু কুলীন পরিবারের কন্যার সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। মর্যাদা বাঁচানোর তাগিদে কন্যারা পাত্রের অপেক্ষায় বসে থাকতেন। ফলে বিবাহিত পাত্রদেরও যথেষ্ট কদর ছিল।
অর্থোপার্জনের হাতিয়ার (পণপ্রথা): কুলীন পুরুষরা এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে বিবাহকে একটি লাভজনক পেশায় পরিণত করেছিল। বিবাহ করলেই পাত্রপক্ষ মোটা অঙ্কের 'পণ' পেত। ফলে এক একজন কুলীন পুরুষ অর্থলোভে কয়েক ডজন, এমনকি শতাধিক বিবাহ করতে শুরু করেন!
ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়, অনেক কুলীন পুরুষ একটি 'খাতা' বা ডায়েরি রাখতেন, যেখানে তার স্ত্রীদের নাম ও শ্বশুরালয়ের ঠিকানা লেখা থাকত! বছরের বিভিন্ন সময়ে তারা সেই খাতায় চোখ বুলিয়ে বিভিন্ন শ্বশুরবাড়িতে ঘুরে বেড়াতেন কেবল আতিথেয়তা ও অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
