

প্রতীকী ছবি - AI
২০শে আগস্ট, ২০২৬
রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার আর বাদাবন- সুন্দরবন বললেই চোখের সামনে এই ছবিটা ভেসে ওঠে। অথচ সুন্দরবনের এটাই চূড়ান্ত সত্যি নয়। বরং এক সময় একটি উল্টো ছবি ছিল পৃথিবীর এই বৃহত্তম ব-দ্বীপ অঞ্চলের। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও সত্যিটা হল, এই ম্যানগ্রোভের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে এককালের কোলাহলমুখর, সমৃদ্ধ হব জনপদ!
পৃথিবীর ইতিহাস বলছে, মানুষ জঙ্গল কেটে নগর-জনপদ তৈরি করে। অথচ সুন্দরবনে ঘটেছিল ঠিক এর উল্টোটা। এক বর্ধিষ্ণু সভ্যতা এখানে কালের গহ্বরে তলিয়ে গিয়ে গহীন অরণ্যের রূপ নিয়েছে।
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পর্যন্ত এই ব-দ্বীপে মানুষের অবাধ যাতায়াত ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, বর্তমান বাঘমারা ফরেস্ট ব্লক, বাংলাদেশের পাইকগাছার কপিলমুনি এবং সাগরদ্বীপের বিস্তীর্ণ অংশে প্রাচীনকালে উন্নত নগর ও বন্দর গড়ে উঠেছিল।
মূলত লবণ তৈরি, মৃৎশিল্প, নৌ-নির্মাণ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত এক বিশাল কর্মঠ জনগোষ্ঠীর বাস ছিল সুন্দরবনে। নদীপথকে কাজে লাগিয়ে দেশ-বিদেশের বাণিজ্য চলত। পরবর্তীতে পঞ্চদশ শতকে খান জাহান আলি এবং ষোড়শ শতকে মহারাজা প্রতাপাদিত্য এই অঞ্চলেই দুর্গ ও সুরম্য অট্টালিকা গড়ে তোলেন। মহারাজা প্রতাপাদিত্য সুন্দরবনেই তাঁর রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। ধূমঘাট বা ঈশ্বরীপুরের মতো জায়গাগুলো হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার মূল কেন্দ্র।
সাধারণত মানবসভ্যতার ইতিহাস বলছে, বনভূমিকে ধ্বংস করে জনপদ বিস্তার লাভ করে এসেছে। কিন্তু সুন্দরবনের ক্ষেত্রে ঘটেছিল প্রকৃতির আগ্রাসী পুনর্দখল। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, নবম শতক এবং পরবর্তীতে ১৭৬২ সালের ভয়াবহ আরাকান ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়ে যায় সুন্দরবন। এই ব-দ্বীপের একটি বিশাল অংশ হঠাৎ করেই এক থেকে দুই মিটার ধসে যায়। ফলে রাতারাতি সমুদ্রের নোনা জল ঢুকে পড়ে সমগ্র সুন্দরবনের স্থলভাগের মধ্যে। ফলে মাটি হয়ে ওঠে লবণাক্ত। এর ফলে কৃষি কাজের যেমন ক্ষতি হয়, তেমনই পানীয় জলের প্রবল সঙ্কট দেখা দেয়। আস্ত একটা নগরসভ্যতা জ্যান্ত অবস্থায় মাটির নিচে তলিয়ে গিয়ে ফের অরণ্যের গর্ভে ফিরে যেতে শুরু করে।
সুন্দরবনের সমৃদ্ধ জনপদ ধ্বংসের ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের পাশাপাশি আরও বেশ কিছু রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছিল:
ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে পর্তুগিজ জলদস্যু (হার্মাদ) ও আরাকানি জলদস্যুরা নদীপথে এসে সুন্দরবনের গ্রামগুলোর ভেতরে ঢুকে অবাধ লুটপাট চালাত। বাধা দিলে চোখের নিমেষে হত্যা করত গ্রামবাসীদের। এছাড়াও শিশু-পুরুষ-মহিলাদের ধরে নিয়ে যেত দাস হিসেবে বিক্রি করবে বলে। এই পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের জনপদেগুলোর বাসিন্দারা ভয়ে ওই এলাকা ছেড়ে চলে আসতে শুরু করে।
গঙ্গার স্রোতের দিকবদল বিরাট প্রভাব ফেলে সুন্দরবনের উপর। গঙ্গার মূল স্রোত ধীরে ধীরে পূর্বদিকে সরে যাওয়ায় পশ্চিমাংশে মিষ্টি জলের তীব্র হাহাকার শুরু হয়। কৃষিকাজ পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় স্থান ত্যাগ করা ছাড়া সুন্দরবনবাসীদের কাছে আর কোনও উপায় ছিল না।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: মহারাজা প্রতাপাদিত্যের পতনের পর মুঘলরা এই অঞ্চলের দিকে আর নজর দেয়নি। এর পিছনে ছিল মুঘলদের শাসনতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য। তারা সাধারণত সমতলভূমি এলাকা শাসন করতে এবং সেখান থেকে খাজনা আদায় করতে বেশি সচ্ছন্দ ছিল। এর ফলস্বরূপ প্রশাসনিক নিরাপত্তার অভাবে জনপদগুলি দ্রুত পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
সভ্যতার সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে ছুটে আসে প্রকৃতি। পরিত্যক্ত জনপদ আর ফসলের খেত দ্রুত ঢেকে যায় সুন্দরী-গরানের সবুজ চাদরে। এভাবেই একটি স্পন্দিত জনপদ চিরতরে হারিয়ে যায় গহীন অরণ্যের অতল গভীরে।
এখন অবশ্য সুন্দরবনের সেই চাকা অনেকটা আবার উল্টোদিকে ঘুরে গিয়েছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
