১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
ভারতে প্রথম জীবাণু অস্ত্রে ভাইকে মেরেছিল বঙ্গেরই এক জমিদার!

পাকুড় রাজবাড়ির কেলেঙ্কারি। ছবি - AI

ভারতে প্রথম জীবাণু অস্ত্রে ভাইকে মেরেছিল বঙ্গেরই এক জমিদার!

calender icon 2 ২৫শে আগস্ট, ২০২৬

মূল বিষয়

আগাথা ক্রিস্টি বা আর্থার কোনান ডয়েলের গোয়েন্দা গল্পে বিষপ্রয়োগে হত্যার অভিনব সব ছকের কথা অনেকেই পড়েছেন। কিন্তু জানলে অবাক হয়ে যাবেন, 'জীবাণু অস্ত্র' (Biological Weapon) প্রয়োগ করে প্রথম খুনের ঘটনা এই অবিভক্ত বাংলাতেই ঘটেছিল!

সময়টা ছিল ১৯৩৩ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখনও শুরু হয়নি। ফলে জীবাণু অস্ত্র শব্দবন্ধটির সঙ্গে সাধারণ মানুষ তো বটেই, তাবড় বিজ্ঞানীদেরও সেভাবে পরিচয় তখন‌ও ঘটেনি। পরবর্তীতে অ্যাডলফ হিটলারের হাত ধরে গোটা পৃথিবী এই ভয়ঙ্কর বিষয় সম্বন্ধে জেনে যায়। সে অন্য প্রসঙ্গ। তো সেই সময়ে সম্পত্তির লোভে ভাইকে খুন করতে অবিভক্ত বঙ্গের এক অতি বিখ্যাত জমিদার পরিবারের জমিদার প্রথম জীবাণু অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন, যা ভারতবর্ষের মধ্যে প্রথম তো বটেই। অনেকে বলে থাকেন ব্যক্তিগত খুনের প্রশ্নে জীবাণু অস্ত্রের সেটাই প্রথম ব্যবহার ছিল। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল তৎকালীন সময়ের ভয়ঙ্কর ও চিকিৎসাহীন বিউবনিক প্লেগের জীবাণু!

সম্পত্তির লোভ

সেই সময় অবিভক্ত বঙ্গের অংশ হলেও বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল পরগনায় অবস্থিত তৎকালীন বাংলা-বিহার প্রেসিডেন্সির অত্যন্ত বিত্তশালী ও প্রভাবশালী এস্টেট ছিল পাকুড় রাজবাড়ি। রাজা অর্থাৎ জমিদার প্রতাপেন্দ্র চন্দ্র পাণ্ডের মৃত্যুর পর তাঁর বিশাল জমিদারির উত্তরাধিকার বর্তায় দুই বৈমাত্রেয় ভাই বিনয়েন্দ্র ও অমরেন্দ্রর ওপর। বিনয়েন্দ্র ছিলেন বড়।

কিন্তু দুই ভাইয়ের স্বভাব ছিল ঠিক বিপরীত মেরুর। বড় হলেও বিনয়েন্দ্র ছিলেন উচ্ছৃঙ্খল, মদ্যপ, নারী আসক্ত এবং বেহিসাবি। অন্যদিকে ছোট ভাই অমরেন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, শিক্ষিত, শরীরচর্চায় অনুরাগী ও প্রজাদরদী। চারিত্রিক এই ভিন্নতার কারণে বাবার মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই রাজবাড়ির সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে সংঘাত শুরু হয়। কারণ বিনয়েন্দ্রের উচ্ছৃঙ্খল ও বেহিসেবি জীবনের কারণে অন্যায্য ভাবে স্টেটের খরচ বেড়ে গিয়েছিল। বহু সম্পত্তি জলের দলে খরচ হয়ে যাচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে অমরেন্দ্র নিজের ন্যায্য অধিকার বুঝে নিতে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।

মামলার রায়দান দিতে গিয়ে হাইকোর্ট ছোট ভাইয়ের পক্ষেই মত দেয়। এবং 'জয়েন্ট রিসিভারশিপ'-এর নির্দেশ দিয়ে যৌথভাবে জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব ঠিক করে দেয়। তবে এই রায়‌'ই কাল হয়েছিল অমরেন্দ্রর জন্য। বিনয়েন্দ্র কোন‌ওভাবেই সম্পত্তির ভাগ মানতে রাজি ছিলেন না। ফলে গুন্ডা দিয়ে, চিরাচরিত বিষ প্রয়োগ করে ছোট ভাইকে মারার বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেন। কিন্তু অমরেন্দ্র সতর্ক থাকায় সেইসব পরিকল্পনা সফল হয়নি।

বিনয়েন্দ্রের গোপন ষড়যন্ত্র

এরপরই ভাইকে খুন করার জন্য এক গভীর ও চাঞ্চল্যকর ষড়যন্ত্রে মাতেন বিনয়েন্দ্র। তবে প্রথমেই যে প্লেগের জীবাণুর কথা মাথায় এসেছিল, তা নয়। ভাড়াটে গুণ্ডা, চশমার ফ্রেমের মাধ্যমে টিটেনাসের বিষ প্রয়োগ করে অমরেন্দ্রকে মারার চেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি বরং কিছুটা দিশেহারাই হয়ে পড়েছিলেন।

এই পরিস্থিতিতে তিনি ছোটবেলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং পেশায় চিকিৎসক তারানাথ ভট্টাচার্যের দ্বারস্থ হন‌। তাঁকে সব কথা, সমস্ত ব্যর্থ পরিকল্পনা খুলে বলেন। চিকিৎসক তারনাথ ভট্টাচার্য'ই পাকুড় রাজবাড়ির বড় ভাই বিনয়েন্দ্রকে বিউবনিক প্লেগের জীবাণু প্রয়োগ করে ভাইকে খুন করার পরামর্শটি দিয়েছিলেন। যা দেখে পুলিশ বা চিকিৎসকরাও প্রাকৃতিক মৃত্যু বলে মেনে নিতে বাধ্য হবেন।

আরও পড়ুন
বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার জগৎ শেঠের করুণ পতন
ইনি মাথায় ছাতা না ধরলে রাজ্যাভিষেক হত না কোচ রাজাদের!
হিন্দু ‘গর্গ’ বংশের হাতযশেই টিকে ছিল পাল সাম্রাজ্য

এই লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে অর্থাৎ প্লেগের জীবাণু সংগ্রহের জন্য বিনয়েন্দ্র এবং চিকিৎসক তারানাথ তৎকালীন বোম্বে পাড়ি দেন। সেখানকার বিখ্যাত হাফকিন ইন্সটিটিউটে গিয়ে হাজির হন তাঁরা। সেখানে গিয়ে বিনয়েন্দ্র নিজেকে গবেষক হিসেবে পরিচয় দেন। দাবি করেন, বাংলায় ইঁদুরের উপদ্রব ঠেকাতে তাঁর প্লেগের জীবাণু নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। টাকা আর মিথ্যার জোরে বম্বের কয়েকজন চিকিৎসককে হাত করে তাঁরা সংগ্রহ করেছিলেন প্রাণঘাতী বিউবনিক প্লেগের কালচার (Yersinia pestis)।

হাওড়া স্টেশনের জনারণ্যে সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্ত

সেই ভয়ঙ্কর দিনটা ছিল ২৬ নভেম্বর, ১৯৩৩। হাওড়া স্টেশনে তখন চিরপরিচিত থিকথিকে ভিড়। অমরেন্দ্র তাঁর কয়েকজন আত্মীয়ের সঙ্গে ট্রেনের জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন, কলকাতা থেকে পাকুড় ফিরবেন বলে। চারপাশের কোলাহলের মধ্যেই হঠাৎ খাদি-কুর্তা পরা এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি ভিড় ঠেলে অত্যন্ত দ্রুত অমরেন্দ্রর পাশ কাটিয়ে চলে যায়। ঠিক যাওয়ার মুহূর্তে সে অমরেন্দ্রর ডান হাতে একটি সিরিঞ্জ দিয়ে কিছু একটা ফুটিয়ে দিয়েছিল।

চমকে উঠে অমরেন্দ্র বলে উঠেছিলেন, "কেউ আমাকে কিছু একটা ফুটিয়ে দিল!" কিন্তু স্টেশনের ওই ভিড়ে ভাড়াটে গুন্ডাটি মুহূর্তের মধ্যে কর্পূরের মতো উবে যায়। অমরেন্দ্র হাত ঘষে দেখেন, সামান্য একটু রক্ত বেরিয়েছে। ব্যাপারটাকে নেহাতই ভিড়ের মধ্যে কারো পিন বা সুঁচ ফুটে যাওয়ার দুর্ঘটনা ভেবে তিনি পাকুড়ের ট্রেনে চেপে বসলেন। বিশেষ একটা গুরুত্ব দেননি।

ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের বিস্ময় এবং সিআইডি তদন্ত

কয়েকদিনের মধ্যেই অমরেন্দ্রর শরীরে ভয়াবহ উপসর্গ দেখা দিল। প্রবল জ্বর, আর ডান হাতের বগলের গ্রন্থি ফুলে অসহ্য যন্ত্রণা। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে তড়িঘড়ি কলকাতায় নিয়ে আসা হয়েছিল। চিকিৎসা করেছিলেন স্বয়ং ডা. বিধানচন্দ্র রায় সহ শহরের নামীদামী চিকিৎসকরা।

রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে আসতেই তাঁদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায়! অমরেন্দ্রর শরীরে বাসা বেঁধেছে বিউবনিক প্লেগ। কিন্তু ১৯৩৩ সালে কলকাতায় প্লেগের কোনও প্রাদুর্ভাবই ছিল না। তাহলে এই জীবাণু এল কোথা থেকে? চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও ৪ ডিসেম্বর, আধুনিক অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে মাত্র ২০ বছর বয়সে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল অমরেন্দ্রর।

পরিবারের লোকেদের সন্দেহ আগে থেকেই ছিল বিনয়েন্দ্রের উপর। হাওড়া স্টেশনে সুঁচ ফোটানোর ঘটনা তাঁরা পুলিশকে জানান। তদন্তের ভার নেয় সিআইডি (CID)। তদন্তে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে আসে আস্ত এক অজগর। বম্বের হোটেল রসিদ, ট্রেনের টিকিট এবং হাফকিন ইন্সটিটিউটের রেকর্ড তন্নতন্ন করে ঘেঁটে পুলিশ প্রমাণ করল যে, বিনয়েন্দ্রই টাকার লোভ দেখিয়ে ওই আততায়ীকে ভাড়া করেছিল।

পরিণতি

১৯৩৫ সাল। কলকাতা হাইকোর্টে শুরু হয় এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিচার। যদিও হাওড়া স্টেশনের সেই ভাড়াটে আততায়ীকে পুলিশ কোনোদিন ধরতে পারেনি, কিন্তু পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ এবং চিকিৎসকদের অকাট্য রিপোর্টের ভিত্তিতে বিনয়েন্দ্র এবং তারানাথ ডাক্তার দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। সরাসরি নিজেদের হাতে খুন না করায় এবং বিজ্ঞানের এমন অভিনব অপব্যবহারের সাজা হিসেবে তাদের ফাঁসি না হলেও, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে সোজা আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলে পাঠানো হয়।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য