

AI-এর সঙ্গে কপিরাইট নিয়ে সংঘাত। ছবি - AI
এআই কীভাবে ছবি আঁকা শেখে তা নিয়ে বড়সড় আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে। এক্ষেত্রে যে কোনও এআই ইন্টারনেট থেকে কোটি কোটি ছবি সৃষ্টিকর্তার অনুমতি ছাড়াই সংগ্রহ করে। এভাবেই এআই-কে ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি ডেটা স্ক্র্যাপিং নামে পরিচিত। যার ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্পীদের স্বার্থ।
প্রযুক্তির দুনিয়ার সঙ্গে সৃষ্টিশীলতার এক অভূতপূর্ব সংঘাত। এখন অন্যতম জল্পনার বিষয় হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি করা শিল্পকর্ম। স্ক্রিনের সামনে বসে কী-বোর্ডে কয়েকটা শব্দ লিখে দিলেই চোখের সামনে ফুটে উঠছে দুর্দান্ত সব ছবি। দেখে মনে হবে যেন কোনও দক্ষ শিল্পীর বহু সাধনার ক্যানভাস। কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে বিতর্ক। এআই যে ছবিটা তৈরি করে দিল, তার আসল মালিক কে? যে মানুষটি শব্দগুলো বা প্রম্পট লিখলেন তিনি, নাকি যে কোম্পানি এআই-টা বানিয়েছে তারা? নাকি খোদ এআই?
এআই কীভাবে ছবি আঁকা শেখে তা নিয়ে বড়সড় আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে। এক্ষেত্রে যে কোনও ছাই ইন্টারনেট থেকে কোটি কোটি ছবি সৃষ্টিকর্তার অনুমতি ছাড়াই সংগ্রহ করে। এভাবেই এআই-কে ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি ডেটা স্ক্র্যাপিং নামে পরিচিত।
OpenAI বা Stability AI-এর মতো বড় কোম্পানিগুলোর দাবি, এটি ফেয়ার ইউজ বা ন্যায্য ব্যবহার আইনের আওতায় পড়ে। তাদের যুক্তি হল, তারা কোনও ছবি হুবহু কপি করে বিক্রি করছে না। তারা কেবল হাজার হাজার ছবি বিশ্লেষণ করে রং, আলো বা জ্যামিতিক আকারের গাণিতিক প্যাটার্ন শিখছে। ঠিক যেমন একজন শিল্পী অন্যের কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হন।
কিন্তু শিল্পীরা এই দাবি মানতে একেবারেই নারাজ। তাঁদের মতে, এআই কোম্পানিগুলো শিল্পীদের সারাজীবনের মেধা ও সাধনা বিনা অনুমতিতে এবং বিনা পারিশ্রমিকে ব্যবহার করে বিপুল মুনাফা লুটছে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হল, যে এআই কোনও নির্দিষ্ট শিল্পীর কাজ থেকে শিখছে, সেই'ই নিজে এক সময় হুবহু ওই শিল্পীর স্টাইলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ছবি তৈরি করা ফেলছে। ফলে মূল শিল্পীদের রুজি রোজগার এবং বাজার সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছে।
এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বের আইন প্রণেতারা এক চরম বিভ্রান্তির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। ভারতে কপিরাইট পরিচালিত হয় ১৯৫৭ সালের আইন দিয়ে। এই আইনে স্পষ্ট বলা আছে, যে কোনও সাহিত্য বা শিল্পকর্মের প্রণেতা হতে গেলে তাকে মানুষ হতে হবে। যন্ত্র বা অ্যালগরিদম নিজের নামে কোনও মেধার অধিকার দাবি করতে পারে না। কম্পিউটার দিয়ে তৈরি কাজের ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তিই কপিরাইট পাবেন, যিনি কাজটি সৃষ্টির মূল কারণ। কিন্তু একটি প্রম্পট লিখে ছবি বানালে সেই প্রম্পট দাতা কতটা সৃজনশীল কাজ করেছেন, তা নিয়ে ভারতীয় আইনে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে।
আমেরিকাতে নিয়ম বেশ কড়া। মার্কিন কপিরাইট অফিস পরিষ্কার জানিয়েছে, মানুষের তৈরি না হলে এআই জেনারেটেড ছবির কোনও স্বত্ব দেওয়া হবে না। জারিয়া অফ দ্য ডন নামের একটি কমিক বইয়ের ক্ষেত্রে তারা নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেয়। তারা জানায় বইটির গল্প এবং বিন্যাসের কপিরাইট দেওয়া যাবে, কিন্তু ভেতরের এআই দিয়ে বানানো ছবিগুলোর ওপর কারও কোনও অধিকার থাকবে না।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নতুন এআই আইনে স্বচ্ছতার উপর মারাত্মক জোর দিচ্ছে। কোম্পানিগুলোকে পরিষ্কার করে জানাতে হবে, তারা কোথা থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে। যুক্তরাজ্যে আবার কম্পিউটার দিয়ে তৈরি কাজের জন্য পুরোনো একটি আইন আছে। কিন্তু আধুনিক এআইয়ের ক্ষেত্রে তা কতটা কার্যকর তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। চিনে আবার অন্য ছবি দেখা গেছে। সেখানকার একটি আদালত সম্প্রতি নির্দেশ দিয়েছে যে, ব্যবহারকারী যদি প্রচুর সময় ও বুদ্ধি খরচ করে এআইকে বিস্তারিত নির্দেশ দেন, তবে তিনি স্বত্ব পেলেও পেতে পারেন।
হাত গুটিয়ে বসে নেই শিল্পীরাও। নিজেদের মেধা বাঁচাতে তারা প্রযুক্তিকেই হাতিয়ার করেছেন। গ্লেজ বা নাইটশেড নামের কিছু বিশেষ টুল এখন শিল্পীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল ছবির ভেতর এমন কিছু সংকেত বা নয়েজ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু এআই যখন সেই ছবি স্ক্যান করতে যায়, তখন তার পুরো সিস্টেম বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। একে বলা হচ্ছে ডেটা পয়জনিং। ফলে এআই ভুল শিখতে শুরু করে এবং তার কার্যকারিতা নষ্ট হয়।
পাশাপাশি চলছে জোরালো আইনি লড়াই। গেটি ইমেজেসের মতো বিখ্যাত স্টক ফটো কোম্পানি এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বিশাল ক্ষতিপূরণের মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, নিজস্ব ওয়াটারমার্ক থাকা সত্ত্বেও লক্ষ লক্ষ ছবি অনুমতি ছাড়া মডেল ট্রেনিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, যা সরাসরি চুরি ছাড়া আর কিছু নয়।
কপিরাইট আইনের এই টানাপোড়েন আগামী দিনে সাধারণ ব্যবহারকারী এবং এআই নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের উপর বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে। আইনি কড়াকড়ি শুরু হলে এআই কোম্পানিগুলো তাদের সিস্টেমে জোরদার ফিল্টার বসাতে বাধ্য হবে। নির্দিষ্ট কোনও জীবিত শিল্পীর নাম লিখে হুবহু তার মতো ছবি বানানোর রাস্তা হয়ত পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। বাণিজ্যিক কাজের ক্ষেত্রে কপিরাইট যাচাই করার জন্য নতুন অনেক নিয়ম চালু হতে পারে।
বিনা পয়সায় বা কম খরচে প্রিমিয়াম এআই ব্যবহারের দিনও শেষ হতে পারে খুব তাড়াতাড়ি। আদালত যদি নির্দেশ দেয়, শিল্পীদের ডেটা ব্যবহারের জন্য রয়্যালটি বা লাইসেন্স ফি দিতে হবে, তবে এআই কোম্পানিগুলোর খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। সেই খরচের বোঝা স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের ঘাড়েই চাপবে। প্রতিটি এআই কন্টেন্টে তখন হয়ত বাধ্যতামূলকভাবে বিশেষ ওয়াটার মার্ক বা ডিজিটাল মেটাডেটা থাকবে। এর ফলে মানুষের তৈরি কাজ আর যন্ত্রের কাজের পার্থক্য সহজেই ধরা পড়বে। বাধ্য হয়েই বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তখন অ্যাডোবি ফায়ারফ্লাইয়ের মতো এথিক্যাল মডেল ব্যবহার করতে শুরু করবে, যেগুলোকে শুধু লাইসেন্স করা বা পাবলিক ডোমেইনে থাকা ছবি দিয়েই শেখানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানুষের অধিকারের এই লড়াই এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যা আগামী কয়েক দশকের ডিজিটাল সৃজনশীলতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
