

মহাকাশ থেকে আসা বিশাল ধাতব বর্জ্য! ছবি - Google
কখনও ১১ ফুট চওড়া ধাতব খোল, কখনও গাড়ির সমান আকারের ধ্বংসাবশেষ! পৃথিবীর বুকে এসে পড়ছে মহাকাশযানের পরিত্যক্ত অংশ। আমেরিকা ও ইন্দোনেশিয়ায় সম্প্রতি বড় ধাতব বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। মহাকাশে বাড়ছে অকেজো উপগ্রহ ও রকেটের বর্জ্য। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করা কিছু যন্ত্রাংশ ভবিষ্যতে বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
মহাকাশ জয় করতে গিয়ে কি পৃথিবীর জন্যই নতুন বিপদ ডেকে আনছে মানুষ? পৃথিবীর কক্ষপথে উপগ্রহের সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে অকেজো মহাকাশযান, পরিত্যক্ত রকেটের অংশ এবং সংঘর্ষে তৈরি হওয়া ধাতব টুকরোর পরিমাণ। এই বর্জ্যের কিছু অংশ বছরের পর বছর মহাকাশে ঘুরে বেড়ায়। আবার কিছু অংশ ধীরে ধীরে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। অধিকাংশই বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেলেও বড় বা তাপ-সহনশীল যন্ত্রাংশের কিছু অংশ পৃথিবীর মাটিতে এসে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
আমেরিকার মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের একটি ভুট্টাখেতে উদ্ধার হওয়া বিশাল ধাতব বস্তুটি নিয়ে সম্প্রতি চর্চা শুরু হয়েছে। বস্তুটি প্রায় ১১ ফুট চওড়া এবং বাটির মতো আকৃতির। প্রাথমিক ভাবে সেটিকে মহাকাশযানের ধ্বংসাবশেষ বলে সন্দেহ করা হয়। স্থানীয় প্রশাসন বস্তুটি উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রাখে। তার উৎস ও প্রকৃতি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে।
একই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের কালিমান্তান অঞ্চলেও একটি বাগানে বড় আকারের পোড়া ধাতব টুকরো উদ্ধারের খবর সামনে আসে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমান, সেগুলিও মহাকাশ থেকে ফিরে আসা কোনও যন্ত্রাংশ হতে পারে। তবে এই বস্তুগুলির উৎস সম্পর্কেও নিশ্চিত তথ্য প্রয়োজন। পর পর এমন ঘটনা সামনে আসায় প্রশ্ন উঠছে, মহাকাশের বর্জ্য কি ক্রমশ পৃথিবীর মানুষের নিরাপত্তার জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠছে?
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ) দীর্ঘদিন ধরেই পৃথিবীর কক্ষপথে জমে থাকা বর্জ্য নিয়ে সতর্ক করে আসছে। সংস্থার ২০২৬ সালের ‘স্পেস এনভায়রনমেন্ট রিপোর্ট’-এ মহাকাশের পরিবেশের উপর ক্রমবর্ধমান চাপের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। পৃথিবীর কক্ষপথে এখন রয়েছে অসংখ্য সক্রিয় উপগ্রহ। পাশাপাশি রয়েছে অকেজো উপগ্রহ, পরিত্যক্ত রকেটের অংশ এবং সংঘর্ষে তৈরি হওয়া নানা আকারের ধ্বংসাবশেষ। নতুন নতুন উপগ্রহ উৎক্ষেপণের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যাও জটিল হচ্ছে।
ইএসএ-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রতিদিন গড়ে তিনটিরও বেশি অক্ষত উপগ্রহ বা রকেটের মূল কাঠামো পুনঃপ্রবেশ করছে। তবে তার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি বস্তুই জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আছড়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে বস্তুগুলি পুড়ে যায়। আবার কিছু মহাকাশযানের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত ভাবে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকে। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন কোনও বড় বস্তু নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে এবং তার অবশিষ্টাংশ কোথায় পড়বে, তা নির্ভুল ভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে ওঠে।
মহাকাশে ঘুরতে থাকা কোনও উপগ্রহ বা রকেটের অংশ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে তার চারপাশে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয়। বায়ুর সঙ্গে উচ্চগতির সংঘর্ষের ফলে অনেক ক্ষেত্রে বস্তুটি ভেঙে যায় এবং অধিকাংশ অংশ পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু সব যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটে না। বড় ধাতব কাঠামো, শক্তিশালী সংযোগকারী অংশ কিংবা উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে এমন উপাদানে তৈরি যন্ত্রাংশ সম্পূর্ণ পুড়ে না-ও যেতে পারে। ফলে কিছু অংশ পৃথিবীর পৃষ্ঠে এসে পড়তে পারে।
কোনও বস্তু কতটা পুড়বে এবং তার কতটা অংশ মাটিতে পৌঁছবে, তা নির্ভর করে তার আকার, গঠন, উপাদান, গতিপথ ও বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের কোণের উপর। তাই প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে আলাদা করে পরীক্ষা করা জরুরি।
পৃথিবীর অধিকাংশ অংশ সমুদ্র দিয়ে ঘেরা। ফলে মহাকাশের বহু ধ্বংসাবশেষ সমুদ্রে পড়ে। তবু স্থলভাগে ধ্বংসাবশেষ পড়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বড় ধাতব খণ্ড পড়লে বাড়িঘর, যানবাহন ও মানুষের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
মহাকাশের বর্জ্যের বিপদ শুধু পৃথিবীতে ধাতব টুকরো আছড়ে পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর কক্ষপথে দ্রুতগতিতে ঘুরতে থাকা ছোট্ট একটি ধাতব খণ্ডও সচল উপগ্রহের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। মহাকাশে বস্তুগুলি অত্যন্ত বেশি গতিতে চলাচল করে। ফলে আকারে ছোট কোনও বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষ হলেও তার অভিঘাত হতে পারে ভয়াবহ। যোগাযোগ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ এবং নৌ ও বিমান চলাচলের বিভিন্ন পরিষেবার জন্য ব্যবহৃত উপগ্রহগুলি এই ধরনের সংঘর্ষের ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
আরও বড় সমস্যা তৈরি হয় যখন কোনও উপগ্রহ বা রকেটের অংশ সংঘর্ষে ভেঙে যায়। একটি বড় বস্তু ভেঙে অসংখ্য ছোট টুকরো তৈরি করতে পারে। সেই টুকরোগুলি আবার অন্য উপগ্রহের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নতুন বর্জ্য তৈরি করে। এ ভাবে সংঘর্ষের শৃঙ্খল চলতে থাকলে কক্ষপথে বর্জ্যের পরিমাণ আরও দ্রুত বাড়তে পারে। এই সম্ভাব্য পরিস্থিতিকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘কেসলার সিনড্রোম’। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে পৃথিবীর কক্ষপথে নতুন উপগ্রহ পরিচালনা করা আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
বিভিন্ন দেশের মহাকাশ সংস্থা রাডার ও দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা বড় বস্তুগুলির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। কোনও উপগ্রহ বা রকেটের অংশ পৃথিবীর দিকে ফিরে আসতে থাকলে তার সম্ভাব্য গতিপথ হিসাব করার চেষ্টা করা হয়। তবে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। বায়ুর ঘনত্ব, বস্তুর গতিবেগ এবং ভেঙে যাওয়ার ধরন তার সম্ভাব্য পতনস্থল নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। ফলে কোনও ধ্বংসাবশেষ ঠিক কোথায় পড়বে, তা সব সময় নির্ভুল ভাবে বলা সম্ভব হয় না।
এই কারণে মহাকাশের বর্জ্য শনাক্ত করা এবং তার গতিপথ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও বস্তু জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পড়ার আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ করার প্রয়োজন হতে পারে।
মহাকাশের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমেই নতুন করে বর্জ্য তৈরি হওয়া কমাতে হবে। উপগ্রহের কার্যকাল শেষ হলে তাকে নিরাপদে কক্ষপথ থেকে সরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। রকেটের পরিত্যক্ত অংশের ক্ষেত্রেও পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত পুনঃপ্রবেশের উপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি, ইতিমধ্যে মহাকাশে জমে থাকা বড় ও বিপজ্জনক বর্জ্য সরানোর প্রযুক্তি উন্নত করাও জরুরি। আন্তর্জাতিক স্তরে মহাকাশযানের গতিপথ সংক্রান্ত তথ্য আদানপ্রদান বাড়ানো এবং সংঘর্ষ এড়ানোর ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।
মহাকাশ অভিযান যত বাড়বে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শুধু নতুন উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তার কার্যকাল শেষ হওয়ার পর কী ভাবে সেটিকে নিরাপদে সরানো হবে, সেই পরিকল্পনাও সমান জরুরি। এখনই পৃথিবীর উপর বড় কোনও মহাবিপর্যয় আসন্ন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কিন্তু মহাকাশের বর্জ্য যে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা-সমস্যা হয়ে উঠছে, তা স্পষ্ট। মহাকাশ থেকে ফিরে আসা ধাতব খণ্ডের প্রতিটি ঘটনা তাই শুধু বিচ্ছিন্ন খবর নয়, ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানকে আরও নিরাপদ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
