কলকাতার বিরিয়ানি। ফাইল চিত্র - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
১৯শে জুন, ২০২৬
বাঙালির খাদ্যতালিকায় এমন কিছু পদ রয়েছে, যেগুলি খাবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে আবেগে পরিণত হয়েছে। বিরিয়ানি তার মধ্যে অন্যতম। জন্মদিন, প্রেমের ডেট, অফিসের পার্টি, ফুটবল ম্যাচের জয় কিংবা মাসের প্রথম বেতন— কলকাতার মানুষ যে কোনও বিশেষ মুহূর্ত উদযাপন করতে চায় এক প্লেট বিরিয়ানির সঙ্গে। কিন্তু এই বিরিয়ানি কেবল সুগন্ধি চাল, মাংস আর আলুর সংমিশ্রণ নয়। এর প্রতিটি দানায় মিশে রয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস, এক নির্বাসিত নবাবের বেদনা, লখনউয়ের সংস্কৃতি এবং কলকাতার নিজস্ব রুচির বিবর্তনের গল্প।
বিরিয়ানির উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে এর শিকড় প্রাচীন পারস্যে। ফারসি শব্দ ‘বিরিয়ান’ বা ‘বেরিয়ান’ থেকে এসেছে ‘বিরিয়ানি’ শব্দটি। যার অর্থ ভেজে বা আগুনে সেঁকে রান্না করা।
পারস্যের রাজদরবারে মাংস ও চাল একসঙ্গে রান্নার যে পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, মুঘলদের হাত ধরে তা ভারতবর্ষে আসে। ষোড়শ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দিল্লি, আগ্রা, লাহোর, আওধ ও ডেকান অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বিরিয়ানি। স্থানীয় মশলা, রান্নার কৌশল এবং খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিশে বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি হয় ভিন্ন ভিন্ন রূপ।
হায়দরাবাদের বিরিয়ানি ঝাল ও মশলাদার। মালাবারের থালাসেরি বিরিয়ানি সুগন্ধি খাইমা চালের জন্য বিখ্যাত। আবার আওধ বা লখনউয়ের বিরিয়ানি পরিচিত তার সূক্ষ্ম স্বাদ ও পরিশীলিত রান্না পদ্ধতির জন্য। কলকাতার বিরিয়ানির জন্ম সেই আওধি ধারারই উত্তরসূরি।
১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ‘অপশাসন’-এর অভিযোগে আওধ রাজ্য দখল করে। সিংহাসনচ্যুত হন আওধের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ। তিনি ছিলেন শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ও রন্ধনপ্রিয় শাসক। রাজনীতিতে হয়তো সফল ছিলেন না, কিন্তু সংস্কৃতিপ্রেমী হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল অসামান্য।
ব্রিটিশরা তাঁকে কলকাতায় নির্বাসনে পাঠায়। গন্তব্য ছিল গার্ডেনরিচ ও মেটিয়াবুরুজ এলাকা। নবাব যখন কলকাতায় আসেন, তাঁর সঙ্গে আসে কয়েক হাজার অনুচর, সৈন্য, শিল্পী, নর্তকী, কবি, বাদ্যকর এবং বাবুর্চি।
ধীরে ধীরে মেটিয়াবুরুজে গড়ে ওঠে এক নতুন লখনউ। তৈরি হয় ইমামবাড়া, প্রাসাদ, বাগান, নাট্যমঞ্চ। সন্ধ্যায় বসত মুশায়রা, চলত ঠুমরি ও কথকের আসর। আর নবাবি রান্নাঘরে তৈরি হত কাবাব, কোরমা, শিরমাল এবং বিরিয়ানি।

আওধি বিরিয়ানির বিশেষত্ব ছিল তার সূক্ষ্মতা। মাংস ও চাল আলাদা রান্না করে পরে ‘দম’ পদ্ধতিতে একসঙ্গে সিল করে রান্না করা হত। কেওড়া জল, গোলাপ জল, জাফরান এবং সুগন্ধি মশলার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত।
কলকাতায় এসে সেই একই রীতি বজায় রাখেন নবাবের বাবুর্চিরা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহরের খাদ্যরুচি, উপকরণের প্রাপ্যতা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে বিরিয়ানিতে কিছু পরিবর্তন আসে। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় এক নতুন পরিচয়— কলকাতা বিরিয়ানি।
কলকাতার বিরিয়ানি মানেই আলু। কিন্তু সেই আলু এল কোথা থেকে?
সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনি বলছে, নির্বাসনে এসে নবাবের আর্থিক অবস্থা আগের মতো ছিল না। বিশাল সংখ্যক অনুচর ও অতিথিদের জন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিরিয়ানি রান্না করতে হত। তাই মাংসের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে তার পরিবর্তে বড় আকারের আলু ব্যবহার শুরু করেন বাবুর্চিরা।
তবে ইতিহাসবিদদের একাংশ এই ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আলু ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং তুলনামূলকভাবে অভিজাত খাদ্যপণ্য। ইউরোপীয় প্রভাবিত রান্নায় আলুর ব্যবহার তখন দ্রুত বাড়ছিল। ফলে নতুন স্বাদের সন্ধানে বিরিয়ানিতে আলু যোগ করা হয়ে থাকতে পারে।
যে কারণেই হোক, আজ সেই আলুই কলকাতার বিরিয়ানির পরিচয়পত্র। এমনকি অনেকের মতে, আলু ছাড়া বিরিয়ানি অসম্পূর্ণ।
প্রথমত, এর স্বাদ অত্যন্ত মৃদু ও পরিশীলিত। ঝাল বা অতিরিক্ত মশলার ব্যবহার কম।
দ্বিতীয়ত, বড় আকারের সেদ্ধ আলু এর অন্যতম আকর্ষণ।
তৃতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রে ডিমও পরিবেশন করা হয়, যা অন্য অনেক বিরিয়ানিতে দেখা যায় না।
চতুর্থত, সুগন্ধি চাল ও নরম মাংসের নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখা হয়।
এই কারণেই কলকাতার বিরিয়ানি শুধু খাবার নয়, এক ধরনের রন্ধনশিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রথমে নবাবের দরবার এবং অভিজাত মুসলিম পরিবারগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে বিরিয়ানি ছড়িয়ে পড়ে কলকাতার সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিংশ শতকের শুরুতে শহরের বিভিন্ন রেস্তরাঁয় বিরিয়ানি বিক্রি শুরু হয়।
স্বাধীনতার পর কলকাতার খাদ্যসংস্কৃতিতে বিরিয়ানি স্থায়ী জায়গা করে নেয়। আজ পার্ক সার্কাস, চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, কলেজ স্ট্রিট, শ্যামবাজার কিংবা গড়িয়া— শহরের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে বিরিয়ানির নিজস্ব অনুরাগী গোষ্ঠী রয়েছে।
খাদ্য ইতিহাসবিদদের মতে, কলকাতার বিরিয়ানি আসলে একটি জীবন্ত ঐতিহাসিক দলিল। এখানে রয়েছে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের ছাপ, আওধের পতনের স্মৃতি, নির্বাসিত এক নবাবের সাংস্কৃতিক সংগ্রাম এবং কলকাতার বহুত্ববাদী চরিত্র।
মেটিয়াবুরুজের অলিগলিতে আজও ওয়াজিদ আলি শাহের স্মৃতি ছড়িয়ে রয়েছে। আর সেই স্মৃতির সবচেয়ে সুস্বাদু উত্তরাধিকার নিঃসন্দেহে কলকাতার বিরিয়ানি।
এক প্লেট কলকাতা বিরিয়ানি হাতে নিলে আমরা আসলে শুধু খাবার খাই না। অজান্তেই ছুঁয়ে ফেলি দেড়শো বছরের ইতিহাস। আলুর ভেতরে লুকিয়ে থাকে নির্বাসনের কাহিনি, সুগন্ধি চালে মিশে থাকে লখনউয়ের স্মৃতি, আর প্রতিটি মাংসের টুকরো মনে করিয়ে দেয়— ইতিহাস কখনও শুধু বইয়ের পাতায় নয়, কখনও কখনও তা পরিবেশন করা হয় ডিনার প্লেটেও।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।